ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুগপৎ হামলা আজ ১২তম দিনে পা দিয়েছে। আর একদিন পার হলেই গত বছরের ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধকে ছাড়িয়ে যাবে এই সংঘাতের স্থায়িত্ব।
আক্রান্ত হওয়ার পর পাল্টা জবাব দিতে ইসরায়েলের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছে তেহরান।
যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র নাগালের বাইরে, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনাদের আশ্রয়দাতা আরব দেশগুলোর ওপর আছড়ে পড়ছে ইরানের স্বল্প খরচে নির্মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোনের ঝাঁক।
কাতার, ওমান, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব—কোনো দেশই হামলার বাইরে থাকেনি।
এসব হামলায় ইতোমধ্যে সাত সেনাসহ আট মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন।
আরব লীগ বলছে ‘বেপরোয়া’ হামলা চালাচ্ছে ইরান। জার্মানি বলেছে ‘নির্বিচার’ হামলা।
এই পরিস্থিতিতে কাতার দাবি করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলো আদতে ইরানের শত্রু নয়। তাদের লক্ষ্য করে তেহরানের হামলার কোনো যুক্তি নেই।
আজ বুধবার কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুলআজিজ আল-খুলাইফি কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার কাছে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সহিংসতা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসারও আহ্বান জানান।
আল-খুলাইফি বলেন, প্রতিবেশীদের ওপর ইরানের হামলা ‘কারো জন্যই মঙ্গলজনক নয়।’
ইরানের হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে অনেক মানুষ হতাহত হয়েছেন। ক্ষতির শিকার হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। সব মিলিয়ে, এ অঞ্চলের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
তিনি জানান, এ ধরনের বিস্তৃত আকারের হামলায় ‘অত্যন্ত উদ্বেগে’ আছে কাতার। বিশেষত, বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার বিষয়ে।
‘বর্তমান পরিস্থিতি খুবই দুর্ভাগ্যজনক’, যোগ করেন ওই মন্ত্রী।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘একইসঙ্গে আমরা এটাও বিশ্বাস করি যে টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান পেতে আলোচনার টেবিলে ফেরার কোনো বিকল্প নেই।’
তিনি বলেন, ‘কাতারের ওপর আসা অযৌক্তিক ও নিন্দনীয় হামলাগুলো দেশের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করছে।’
দোহা এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষায় সব ধরনের আইনসম্মত উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে বলেও জানান আল-খুলাইফি।
তিনি দাবি করেন, এই সংঘাতের ‘বৈশ্বিক সমাধান’ প্রয়োজন, যাতে উপসাগরের জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হতে থাকে।
উল্লেখ্য, চলমান সংঘাতে ইরান-সংলগ্ন হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল বন্ধ আছে। কৌশলগত দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি হয়।
আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি, দাবি করেন কাতারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি জানান, কাতার ও ওমান অতীতে ‘ইরান ও পশ্চিমের মধ্যে সেতুবন্ধন সৃষ্টির’ চেষ্টা চালিয়েছে। তার আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে।
কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকলে দেশগুলো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা চালিয়ে যেতে পারবে না বলে মত দেন কাতারের ওই মন্ত্রী।
‘ইরানিদের একটা জিনিস বুঝতে হবে। আমাদের ওপর হামলা চলতে থাকলে আমরা সেই ভূমিকা পালন করতে পারবো না’, যোগ করেন তিনি।
আল-খুলাইফি জানান, কয়েকদিন আগে তেহরানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরাহমান বিন জসিম আল থানি।
ওইসময় তিনি এ বিষয়গুলো তেহরানকে বোঝানোর চেষ্টা করেন এবং প্রতিবেশীদের ওপর হামলা বন্ধের আর্জি জানান।
আল খুলাইফি বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলো ইরানের শত্রু নয়। ইরানিরা এ ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না।’
পাশাপাশি, মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ চালিয়ে যাওয়ার দাবি করেন তিনি।
জানান, দোহার পক্ষ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সহিংসতা বন্ধের উদ্যোগ নিতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
‘আমরা সবসময়ই যুক্তরাষ্ট্রের সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা তাদেরকে সারাক্ষণই শান্তির পথে হাঁটতে ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাতের নিরসনে উৎসাহ ও সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছি’, বলেন তিনি।
আল-খুলাইফি বলেন, ‘আমরা আশা করছি সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষে শান্তির পথ খুঁজে নেবে। সামরিক অভিযানের অবসান ঘটবে এবং সবাই আলোচনার টেবিলে ফিরে আসবে।’