ট্রাম্পকে চাপে ফেলতে দীর্ঘ যুদ্ধের কৌশল নিচ্ছে ইরান, বলছেন বিশ্লেষকরা

Date:

যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও ইরান একাধিক ফ্রন্টে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাইরে থেকে ইরানের প্রতিক্রিয়া সুশৃঙ্খল মনে না হলেও বাস্তবে এটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে বেকায়দায় ফেলার একটি পুরোনো কৌশল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর অনেকের কাছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের পাল্টা হামলা নেতৃত্বহীন ও অগোছালো বলে মনে হয়েছিল।

অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—ইরান কেন উপসাগরীয় দেশগুলো কিংবা তুরস্ক ও আজারবাইজানে হামলা চালাচ্ছে? তাদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা না করে বা অন্তত নিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা না করে কেন এমন করছে ইরান?

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের এই পাল্টা হামলার পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত যুদ্ধ কৌশল—প্রতিপক্ষের আক্রমণ সহ্য করা এবং তাকে এমন চাপে ফেলা যেন শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ যুদ্ধ থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়।

ব্রিটেনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বুরচু ওজচেলিক এএফপিকে বলেন, ‘ইরানের কৌশল হলো ওয়াশিংটনের ওপর চাপ তৈরি করা, উপসাগরীয় দেশগুলোকে ক্ষুব্ধ করে তোলা এবং তেল-গ্যাসসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ নেতারা নিহত হওয়ায় নেতৃত্বে বড় ধাক্কা লাগলেও বর্তমানে তার ছেলে মোজতবা খামেনি এখন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা। এতে প্রমাণ হয় যে ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো এখনো প্রায় অক্ষত আছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এমন এক বাঁচা–মরার লড়াইয়ে নেমেছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি। সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি পরাজিত করার সম্ভাবনা ইরানের খুবই কম।

তবে তারা আশা করছে, বর্তমানে যুদ্ধটি মূলত বিমান হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সেটিকে দীর্ঘায়িত করা গেলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়বে। স্থলবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এর মূল্য নিয়ে ভাবতে হবে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান বিশেষজ্ঞ আলি ওয়ায়েজ বলেন, ‘উত্তেজনা বাড়িয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে ইরান, যেন ওয়াশিংটন যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে শুরু করে।’

এটি মূলত অসম যুদ্ধের একটি পুরোনো কৌশল।

১৯৭৫ সালে প্রকাশিত ‘হোয়াই বিগ নেশনস লুজ স্মল ওয়ারস’ বইয়ে অধ্যাপক অ্যান্ড্রু ম্যাক দেখিয়েছিলেন, কীভাবে তুলনামূলক দুর্বল শক্তি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে দীর্ঘ যুদ্ধে ক্লান্ত করে তুলতে পারে—যেমন ঘটেছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধে।’

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইরেম্মোর প্রধান অ্যাগনেস লেভালোয়া বলেন, ‘ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সীমিত। তাই তারা হিসাব করে আক্রমণ করছে, যেন সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং একসময় ট্রাম্প বলতে বাধ্য হন—যথেষ্ট হয়েছে।’

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে তেহরান মনে করছে কৌশলগত ভারসাম্য—বিশেষ করে মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিকভাবে—তাদের দিকে ঝুঁকতে শুরু করবে।’

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সুফান সেন্টারের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রচলিত পদ্ধতিতে যুদ্ধ জেতা সম্ভব নয় বুঝেই তেহরান অনিয়মিত কৌশল ব্যবহার করছে। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা এবং কম খরচে বেশি ক্ষতির পরিস্থিতি তৈরি করা।

এর অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরি, প্রতিবেশী দেশে হামলা চালানো এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দেওয়া।

যদি উপসাগরীয় দেশগুলোর চাপ ও জ্বালানি দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে ট্রাম্প রাজনৈতিক চাপে পড়েন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ থেকে সরে আসতে হতে পারে।

মার্কিন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টেনিওর বিশ্লেষক এমিলি স্ট্রমকুইস্ট বলেন, ‘বাজারের চাপ, হরমুজ প্রণালিতে বাধা ও তেলের দাম—সবকিছুই ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।’

উপসাগরীয় দেশগুলোর চাপ ট্রাম্পের ওপর বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। ইসরায়েল ইরানে সরকার পরিবর্তন চাইলেও, উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।

তবে ইরান শেষ পর্যন্ত টিকে গেলেও তাকে বড় ধরনের মূল্য দিতে হতে পারে।

ওজচেলিক বলেন, ‘যুদ্ধ শেষে কোনো সমঝোতা হলে ইরানকে বড় ধরনের ছাড় দিতে হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি হলে উপসাগরীয় দেশগুলো চুক্তিতে প্রভাব রাখতে চাইবে এবং এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

তবে সিট্রিনোভিচের মতে, তেহরানের কাছে এসব বিষয় এখন খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়।

তিনি বলেন, ‘ইরানের দৃষ্টিতে এই যুদ্ধের লক্ষ্য হলো যতটা সম্ভব এগিয়ে থাকা এবং ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে—তা প্রতিপক্ষের মনে গেঁথে দেওয়া।’

Popular

More like this
Related

পাকিস্তানকে বিধ্বস্ত করল বাংলাদেশ

নাহিদ রানার পেসে বিধ্বস্ত হয়ে টেনেটুনে তিন অঙ্ক পেরিয়েই...

রাষ্ট্রপতি স্বৈরাচারের দোসর, সংসদে ভাষণ দেওয়ার অধিকার নেই: জামায়াতের নায়েবে আমির

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে স্বৈরাচারের দোসর আখ্যা দিয়ে জামায়াতের নায়েবে...

স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ: ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

প্রায় আড়াই বছর আগে জামালপুর সদর উপজেলায় স্বামীকে গাছে...

‘স্ট্রাটেজিক রিজার্ভ’ থেকে বাজারে তেল ছাড়ছে জার্মানি ও জাপান

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি...