বিশ্বকাপের হ্যাটট্রিকনামা: প্যাটেনাড থেকে বাতিস্তুতা-রোনালদো হয়ে এমবাপে

Date:

বিশ্বকাপ ফুটবলের শতবর্ষ ছুঁইছুঁই ইতিহাসে হ্যাটট্রিক সব সময়ই এক বিশেষ রোমাঞ্চের নাম। ১৯৩০ সালে টুর্নামেন্টের শুরু থেকে সবশেষ ২০২২ সালের লুসাইল স্টেডিয়াম— বিশ্বমঞ্চে হ্যাটট্রিকের এই খেরোখাতাটি যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি বৈচিত্র্যময়। একেকটি হ্যাটট্রিকের সাফল্যে কখনো ফুটে উঠেছে রাজকীয় তেজের গল্প, আবার কখনো তা মিশে গেছে চিরস্থায়ী আক্ষেপের কালজয়ী উপাখ্যানে।

জানা ও অজানা সব পরিসংখ্যান নিয়ে এবারের আয়োজন। সাধারণ কিছু জিজ্ঞাসার মাধ্যমে চলুন জেনে নেওয়া যাক বিশ্বকাপের হ্যাটট্রিকনামা। আপনি কি প্রস্তুত এই চ্যালেঞ্জে সামিল হতে?

* ফিফা বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত কতটি হ্যাটট্রিক হয়েছে?

বিশ্বকাপের ২২টি আসর মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ৫৪টি হ্যাটট্রিক দেখেছেন ফুটবলপ্রেমীরা।

হ্যাটট্রিকের জন্য আদর্শ দিন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে রোববার। বিশ্বকাপের ইতিহাসে রেকর্ড ২৩টি হ্যাটট্রিক হয়েছে রোববারে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা শনিবারে হ্যাটট্রিক হয়েছে ১১টি।

সপ্তাহের প্রতিটি দিনেই একাধিক হ্যাটট্রিক হওয়ার নজির থাকলেও ব্যতিক্রম কেবল সোমবার। ফুটবল মহাযজ্ঞে এখন পর্যন্ত স্রেফ একটি হ্যাটট্রিক হয়েছে সোমবারে। ২০০২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে পোল্যান্ডের বিপক্ষে সেই হ্যাটট্রিকটি করেন পর্তুগালের পাউলেতা।

* বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম হ্যাটট্রিকটি কার ছিল?

বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথম হ্যাটট্রিকের কীর্তিটির মালিকানা কার? বহু বছর ধরে আর্জেন্টিনার সেন্টার ফরোয়ার্ড গিলের্মো স্তাবিলের নামের পাশে ছিল এই কৃতিত্ব। তিনি ১৯৩০ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের অভিষেক আসরের গ্রুপ পর্বে মেক্সিকোর বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছিলেন ১৯ জুলাই। তবে চমকপ্রদ তথ্য হলো, স্তাবিলের আগে ১৭ জুলাই প্যারাগুয়ের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে হ্যাটট্রিকের স্বাদ পেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড বার্ট প্যাটেনাড। তাহলে গোলমালটা হলো কোথায়?

উরুগুয়ের এস্তাদিও গ্রান পার্কে সেন্ত্রালে খেলার দশম, পঞ্চদশ ও ৫০তম মিনিটে গোল তিনটি করেছিলেন প্যাটেনাড। কিন্তু ফিফার অফিসিয়াল নথিতে দীর্ঘকাল দ্বিতীয় গোলটি যুক্তরাষ্ট্রের অধিনায়ক টম ফ্লোরির নামে এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের পরিসংখ্যান বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আরএসএসএসএফের নথিতে সেটি প্যারাগুয়ের অরেলিয়ো গঞ্জালেজের আত্মঘাতী গোল হিসেবে লিপিবদ্ধ ছিল।

প্যাটেনাড অবশ্য জীবিত থাকাকালীন এই স্বীকৃতি পেয়েও যাননি। ১৯৭৪ সালে তার মৃত্যুর ৩২ বছর পর আসে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। বিভিন্ন নথিপত্র ও বিশেষজ্ঞদের যাচাইবাছাই শেষে ২০০৬ সালের ১০ নভেম্বর প্যাটেনাডকে প্রথম হ্যাটট্রিককারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ফিফা। ফলে ৭৬ বছর পর অবসান ঘটে ফুটবল ইতিহাসের এক দীর্ঘ অমীমাংসিত বিতর্কের।

* এক আসরে সবচেয়ে বেশি হ্যাটট্রিক হয়েছে কোন বিশ্বকাপে?

বিস্ময়কর শোনালেও ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে মোট আটটি হ্যাটট্রিক হয়েছিল।

সব মিলিয়ে ৫৪টি হ্যাটট্রিকের মধ্যে ২৬টিই এসেছে প্রথম আটটি আসরে। অথচ পরের ১৪টি আসরে ম্যাচের সংখ্যা অনেক বাড়লেও হ্যাটট্রিক হয়েছে মাত্র ২৮টি। অর্থাৎ গোলবন্যার সেই শুরুর দিনগুলো এখনকার রক্ষণে মনোযোগী কৌশলের চেয়ে অনেক বেশি হ্যাটট্রিকবান্ধব ছিল!

একমাত্র ব্যতিক্রম হলো ২০০৬ সালের জার্মানি আসর। ফুটবলের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতার সুদীর্ঘ পথচলায় সেটিই একমাত্র আসর, যেখানে কোনো খেলোয়াড়ই হ্যাটট্রিকের দেখা পাননি।

* বিশ্বকাপের মঞ্চে সবচেয়ে কমবয়সী ও সবচেয়ে বেশি বয়সী হ্যাটট্রিককারী কারা?

বিশ্বকাপে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে হ্যাটট্রিকের রেকর্ডটি এখনও ব্রাজিলের ফুটবল সম্রাট পেলের দখলে। সুইডেনে ১৯৫৮ সালের আসরের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে যখন তিনি এই কীর্তি গড়েছিলেন, তখন তার বয়স ছিল স্রেফ ১৭ বছর ২৪৪ দিন।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে কিশোর বয়সে হ্যাটট্রিক করেছেন কেবল আর একজন— জার্মানির স্ট্রাইকার এডমুন্ড কোনেন। ইতালিতে অনুষ্ঠিত ১৯৩৪ সালের আসরের শেষ ষোলোতে বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাত্র ১৯ বছর ১৯৮ দিন বয়সে গোল তিনটি করেছিলেন তিনি।

সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হিসেবে হ্যাটট্রিকের রেকর্ড পর্তুগালের কিংবদন্তি ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর। ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে স্পেনের বিপক্ষে যখন তিনি হ্যাটট্রিক পেয়েছিলেন, তখন তার বয়স ছিল ৩৩ বছর ১৩০ দিন। এটি ছিল ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে তার ক্যারিয়ারের ৫১তম হ্যাটট্রিক। কাকতালীয়ভাবে বিশ্বকাপের ইতিহাসেও সেটি ছিল ৫১তম হ্যাটট্রিক।

* বিশ্বকাপে একাধিক হ্যাটট্রিক আছে কয়জন ফুটবলারের?

বিশ্বকাপে দুটি করে হ্যাটট্রিক আছে শুধু চারজনের। তারা হলেন হাঙ্গেরির স্যান্দর ককসিস (১৯৫৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়া ও তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে), ফ্রান্সের জুস্ত ফঁতেন (১৯৫৮ সালে প্যারাগুয়ে ও তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে), তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির গার্ড মুলার (১৯৭০ সালে বুলগেরিয়া ও পেরুর বিপক্ষে) ও আর্জেন্টিনার গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা (১৯৯৪ সালে গ্রিস ও ১৯৯৮ সালে জ্যামাইকার বিপক্ষে)।

মজার ব্যাপার হলো, ককসিস ও ফঁতেন দুজনেই পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে চারবার করে জাল খুঁজে নিয়েছিলেন এবং ককসিস ও মুলার চারদিনের মধ্যে টানা দুই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছিলেন।

বিশ্বকাপের দুটি ভিন্ন আসরে হ্যাটট্রিক করা একমাত্র ফুটবলার বাতিস্তুতা। আর সেখানে খুঁজে পাওয়া যায় কিছু অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য মিল! প্রথমত, তার দুটি হ্যাটট্রিকই এসেছিল একই তারিখে— ২১ জুন; দ্বিতীয়ত, দুটি হ্যাটট্রিকই তিনি করেছিলেন বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া দলগুলোর বিপক্ষে এবং তৃতীয়ত, দুই ক্ষেত্রেই হ্যাটট্রিক পূর্ণ হয়েছিল পেনাল্টি থেকে।

* বিশ্বকাপের ইতিহাসের দ্রুততম হ্যাটট্রিকটি কার?

স্পেনে ১৯৮২ সালের আসরের গ্রুপ পর্বে হাঙ্গেরির স্ট্রাইকার লাসলো কিস এল সালভাদরের বিপক্ষে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে চমক দেখিয়েছিলেন। মাত্র ৭ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের মধ্যে (ম্যাচের ৬৯তম, ৭২তম ও ৭৬তম মিনিটে) বিশ্বকাপের ইতিহাসের দ্রুততম হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেছিলেন তিনি।

খেলা শুরুর সময় বিবেচনায় নিলে সবার উপরে অবস্থান অস্ট্রিয়ার এরিক প্রোবস্টের। তিনি ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড আসরের গ্রুপ পর্বে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ২৪ মিনিটের মধ্যে (ম্যাচের চতুর্থ, ২১তম ও ২৪তম মিনিটে) হ্যাটট্রিকের স্বাদ নিয়েছিলেন।

* বিশ্বকাপের ফাইনালে হ্যাটট্রিকের বিরল কীর্তি রয়েছে কাদের?

বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে ফাইনালের স্নায়ুক্ষয়ী মঞ্চে হ্যাটট্রিক দেখেছেন মাত্র দুজন। একজন ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্ট (১৯৬৬ সালে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে) এবং অন্যজন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে (২০২২ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে)।

তবে এই দুই হ্যাটট্রিকের চরিত্র ভিন্ন। হার্স্টের হ্যাটট্রিকটি সময়ের হিসাবে বিশ্বকাপের সবচেয়ে দীর্ঘতম। ম্যাচের ১৮তম মিনিটে জাল খুঁজে নেওয়ার পর বাকি গোল দুটি তিনি করেছিলেন অতিরিক্ত সময়ে (৯৮তম ও ১২০তম মিনিটে)।

বিশ্বকাপের সবশেষ আসরে এমবাপে করেছিলেন আধুনিক ফুটবলের অন্যতম নাটকীয় হ্যাটট্রিক। মাত্র ৯৭ সেকেন্ডের ব্যবধানে করেছিলেন প্রথম দুটি গোল (৮০তম ও ৮১তম মিনিটে)। তার শেষ গোলটি এসেছিল অতিরিক্ত সময়ে (১১৮তম মিনিটে)।

* হ্যাটট্রিকসহ বিশ্বকাপের এক ম্যাচে সর্বোচ্চ গোলের মালিক কে?

হ্যাটট্রিক ছাপিয়েও এক ম্যাচে ৫ গোল করার এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড রয়েছে রাশিয়ার স্ট্রাইকার ওলেগ সালেঙ্কোর নামের পাশে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ক্যামেরুনের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে তিনি একাই পাঁচবার লক্ষ্যভেদ করেছিলেন।

এক ম্যাচে ৪ গোল করার নজির আছে ছয়জনের। তারা হলেন পোল্যান্ডের আর্ন্সট ভিলোমফস্কি (১৯৩৮ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে), ব্রাজিলের আদেমির (১৯৫০ সালে সুইডেনের বিপক্ষে), স্যান্দর ককসিস (১৯৫৪ সালে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে), জুস্ত ফঁতেন (১৯৫৮ সালে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে), পর্তুগালের ইউসেবিও (১৯৬৬ সালে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে), এমিলিও বুত্রাগেনো (১৯৮৬ সালে ডেনমার্কের বিপক্ষে)।

আরও:

* দল হিসেবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সাতটি হ্যাটট্রিক করেছে জার্মানি (তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিসহ)। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে— হ্যাটট্রিক হজম করার অনাকাঙ্ক্ষিত কীর্তিতে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে আছে তারা (চারটি করে)।

* কেবল হেডের মাধ্যমেই বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করার বিরল অর্জন আছে মাত্র দুজন ফুটবলারের। তারা হলেন চেকস্লোভাকিয়ার তমাস স্কুরাভি (ইতালিতে ১৯৯০ সালে কোস্টারিকার বিপক্ষে ) ও  জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা (জাপান-দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০০২ সালে সৌদি আরবের বিপক্ষে)।

* বিশ্বকাপের ইতিহাসে হ্যাটট্রিকসহ ৪ গোল করেও হারের তেতো স্বাদ পেতে হয়েছে কেবল আর্ন্সট ভিলোমফস্কিকে। ফ্রান্সে ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই রোমাঞ্চকর ম্যাচে পোল্যান্ড ৬-৫ গোলে হেরে গিয়েছিল।

Popular

More like this
Related

সাবেক এমপি মহিউদ্দিন, তার স্ত্রী-ছেলের বিরুদ্ধে দুদকের ৩ মামলা

পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) মহিউদ্দিন মহারাজ ও...

বাবর ‘বাদ পড়েননি’, বাংলাদেশের বিপক্ষে তরুণদের বাজিয়ে দেখছে পাকিস্তান

সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজে রান করেছেন বাবর আজম, রানে ছিলেন...

যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে প্রাণহানি, ১১ দিনে নিহত প্রায় ১৮০০

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা...

বিশ্বকাপ পর্যন্ত মিরাজ অধিনায়ক থাকবেন তো?

পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের আগে অনেক আলোচনাই বিশ্বকাপকেন্দ্রিক। প্রথমত...