বাংলাদেশ নারী শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় নারী গ্রাজুয়েট বেশি বের হচ্ছেন, বলতে গেলে মোট শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেকই নারী। কিন্তু শ্রমবাজারে তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে নারী গ্রাজুয়েটদের বেকারত্বের হার পুরুষ সহপাঠীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়া শিক্ষার্থীর ৪৭ শতাংশ নারী, যা ১৯৭৩ সালের চেয়ে অনেক বেশি এবং তখন এই হার ছিল মাত্র ১৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ (এলএফএস) অনুযায়ী, নারী গ্রাজুয়েটদের বেকারত্বের হার ২০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে ১১ দশমিক ৩১ শতাংশ।
তরুণদের মধ্যে এই পার্থক্য আরও বেশি। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী নারীদের বেকারত্বের হার ৩৪ শতাংশ, বিপরীতে পুরুষের ক্ষেত্রে ২৬ শতাংশ।
আজ বাংলাদেশে ‘অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ সব নারীর জন্য হোক’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হচ্ছে। কিন্তু তথ্য বলছে, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান থেকে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চশিক্ষিত নারীদের বেকারত্বের প্রধান কারণ হলো—উপযুক্ত চাকরির সুযোগের অভাব, অনুকূল কর্মপরিবেশের ঘাটতি এবং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়েমা হক বিদিশা বলেন, ‘শিক্ষায় লিঙ্গভিত্তিক ব্যবধান কমলেও শ্রমবাজারে নারীদের জন্য বাস্তবতা এখনো সম্পূর্ণ ভিন্ন।’
তিনি বলেন, সরকারি তথ্যে এই সমস্যা হয়তো পুরোটা উঠে আসে না। কারণ বেকারত্ব নির্ধারণে আগের সপ্তাহে কেউ যদি মাত্র এক ঘণ্টা কাজ করে, তাহলে তাকে কর্মরত হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবে শ্রমবাজারের অবস্থা দেখলে বোঝা যায়, নারীদের বেকারত্ব এখনো পুরুষের চেয়ে বেশি।
‘এর একটি বড় কারণ হলো শ্রমবাজারে যে ধরনের চাকরি আছে, তার সঙ্গে উচ্চশিক্ষিত চাকরিপ্রার্থীদের প্রত্যাশার সঙ্গতি না থাকা,’ যোগ করেন তিনি।
তার ভাষ্য, ‘উচ্চশিক্ষিতরা সাধারণত শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে মানানসই চাকরি খোঁজেন। কিন্তু এমন চাকরির সংখ্যা সীমিত, বিশেষ করে নারীদের জন্য। এছাড়া সমাজের নানা বাধা ও নিয়মের কারণেও নারীদের চাকরির সুযোগ অনেক সময় কমে যায়।’
তিনি আরও বলেন, চাকরি খোঁজার সময় অনেক নারীকে নিরাপত্তা, যাতায়াত, বাসস্থান এবং কর্মঘণ্টার বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হয়। এসব কারণে তারা সব ধরনের চাকরি করতে পারেন না বা করতে চান না।
তিনি জানান, নারীদের শিক্ষার অগ্রগতি হলেও চাকরিতে উচ্চপদে সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব তৈরি হয়নি।
তিনি উল্লেখ করেন, ‘ব্যবস্থাপনা পদগুলোর মাত্র প্রায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ নারীদের হাতে। এই তথ্য দেখে বোঝা যায়, শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যবধান কমলেও, উচ্চদক্ষতা ও নেতৃত্বের পদে নারীদের উপস্থিতি এখনো খুবই সীমিত।’
তিনি আরও বলেন, আমাদের এখানে বড় ধরনের কাঠামোগত সমস্যাও আছে। যেমন—ডে-কেয়ার সেন্টার ও মানানসই কর্মপরিবেশের অভাব। এ সমস্যার কারণে অনেক নারী চাকরিতে ঢুকে আবার ছেড়ে দেন।’
এ সমস্যাগুলোর সমাধান করা হলে নারীদের চাকরির সম্ভাবনা বাড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
‘নারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সুযোগসুবিধা না বাড়ানো হলে, অনেক যোগ্য নারীকে উপযুক্ত চাকরির জন্য সংগ্রাম করে যেতে হবে,’ বলেন তিনি।
ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই সমস্যাগুলো পূরণের কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে সরকার নারীদের কর্মসংস্থান বাড়াবে।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ালে পরিবারে আয় বৃদ্ধি পাবে, শিশুদের শিক্ষায় সহায়তা হবে এবং দারিদ্র্য কমানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সহজ হবে।
এছাড়া, কর্মস্থলে ডে-কেয়ার সেন্টার এবং গার্মেন্টস কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, অফিস ও আদালতে ব্রেস্ট ফিডিংয়ের জন্য নিরাপদ জায়গা রাখারও কথা বলা হয়েছে।
পাশাপাশি নারীদের স্বনির্ভরতা বাড়াতে ক্ষুদ্র, কুটির ও ছোট শিল্পে সুদমুক্ত ঋণ, কর ছাড় এবং বিপণন সহায়তার কথাও বলা হয়েছে।
ইকো-ফ্রেন্ডলি লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড কালিন্দির নির্বাহী পরিচালক ও উদ্যোক্তা মুনিয়া জামান বলেন, অনেক নারী পরিবার ও কাজের ভারসাম্য রাখতে না পারায় চাকরি ছেড়ে দেন বা কর্মজীবনে প্রবেশই করেন না।
তিনি বলেন, ‘কিছু নারী মাতৃত্বের সময়েই কর্মজীবন শেষ করে দেন, বিশেষ করে যখন সন্তানের দেখভাল করার কেউ না থাকলে বা সন্তানকে অফিসে নিয়ে যাওয়া যায় না।’
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি উদ্যোক্তা হয়েছি, কারণ এতে পরিবার, ব্যক্তিগত জীবন ও কাজের মধ্যে ভারসাম্য রাখা সহজ।’
‘তবে উদ্যোক্তা হওয়া সব সমস্যার সমাধান নয়’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক নারী চেষ্টা করেছেন, কেউ কেউ সফলও হয়েছেন, কিন্তু বেশিরভাগই কাগজপত্র বা ব্যবসায়িক নিয়মকানুনের জটিলতায় আটকে যান। এ ক্ষেত্রে সরকারের এখনো অনেক কাজ বাকি আছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কর্মসংস্থান খাতের সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা রিজওয়ানুল ইসলাম বলেন, বিস্তারিত বিশ্লেষণ ছাড়া নারীদের উচ্চ বেকারত্বের সঠিক কারণ জানা কঠিন, তবে কিছু সম্ভাব্য কারণ আছে আছে। এটা হতে পারে চাকরির সংখ্যা ও চাহিদার কারণে, বা গ্রামের তুলনায় শহরে অবস্থানের কারণে।
‘শ্রমবাজার অনেক সময় লিঙ্গভিত্তিকভাবে ভাগ হয়। যদি নারীরা শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতের মতো নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে চাকরি চান, কিন্তু সেখানে সুযোগ কম বা থমকে থাকে, তাহলে বেকারত্ব বাড়ে।’
তিনি আরও বলেন, শহরের শিক্ষিত নারী, বিশেষ করে তরুণরা, গ্রামাঞ্চলের নারীদের তুলনায় বেশি বেকার। শিক্ষার ক্ষেত্রে বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। যদি তারা এমন বিষয় পড়েন যেগুলোর চাকরির সুযোগ কম, তাহলে বেকারত্ব বাড়বেই।
‘নিয়োগে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যও সমস্যা হতে পারে। যেহেতু বেশিরভাগ উচ্চপদে পুরুষ আছেন, সুতরাং নারীদের জন্য ভালো চাকরিতে প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়ে,’ বলেন তিনি।