গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব রুবাবা দৌলা। এখন নারী ক্রিকেটের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে রুবাবা বিসিবিতে এখন পর্যন্ত তার অভিজ্ঞতা, নারী ক্রিকেট নিয়ে পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন।
বিসিবির সঙ্গে আপনার কাটানো সময়টাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
রুবাবা দৌলা: গত চার মাস ছিল ভিত্তি তৈরির সময়। আমরা শাসনকাঠামোকে অগ্রাধিকার দিয়েছি, সুশৃঙ্খল কমিটি গঠন করেছি, ডব্লিউবিপিএল (নারী বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ) শুরু করেছি, আরও স্পষ্ট পরিকল্পনা কাঠামো তৈরি করেছি এবং ক্রিকেট উন্নয়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করেছি। আমি বিসিবি টিমের কাছ থেকে চমৎকার সমর্থন পেয়েছি এবং এই পর্যায়ে অবদান রাখার সুযোগ পেয়ে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ।
আগামী জুন-জুলাইয়ের আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। নারী দলের ভালো প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে আপনারা কী কী পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন?
রুবাবা: আমরা আরও বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং সুশৃঙ্খল হাই-পারফরম্যান্স ক্যাম্প নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছি। আমি স্পোর্টস সায়েন্স এবং ফিটনেসকে এর সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করতে চাই। নারীদের বিপিএলের পর শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আমাদের একটি হোম সিরিজ এবং এরপর স্কটল্যান্ডে একটি ত্রিদেশীয় সিরিজ রয়েছে।
মূলত, প্রাথমিক লক্ষ্য হলো অভিজ্ঞতা অর্জন করা। আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের বিপক্ষে খেলা একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আত্মবিশ্বাস এবং মানসিকতা, এবং আমরা সেটি নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমরা স্কটল্যান্ডকে বেছে নিয়েছি কারণ সেখানকার কন্ডিশন এবং আবহাওয়া ইংল্যান্ডের মতো হবে, যেখানে আমরা বিশ্বকাপে খেলব এবং বিদেশি খেলোয়াড়দের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করব।
নারী দলে বর্তমানে পুরোপুরি স্থানীয় কোচিং সেটআপ রয়েছে। বিদেশি কোচ আনার কোনো পরিকল্পনা কি আছে?
রুবাবা: বোর্ডের অবস্থান হলো—নারী দল কোনো গৌণ অগ্রাধিকার নয়। নারী দলের এখন এক্সপোজার প্রয়োজন। যদিও স্থানীয় কোচরা ফলাফল দেখাচ্ছেন, আমরা খতিয়ে দেখছি খেলোয়াড়দের আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করার জন্য কী প্রয়োজন। এটা সবসময় সত্য নয় যে কেবল বিদেশি কোচরাই ‘ভালো’ কোচ। তবে আমরা ব্যাটিংয়ের মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রগুলোর জন্য বিশেষ ট্রেইনার খুঁজছি এবং একটি সুশৃঙ্খল সিস্টেমের মধ্যে সঠিক সাপোর্ট স্টাফ আনার জন্য ডেটা-চালিত সিদ্ধান্ত নেব।
ডব্লিউবিপিএল নারী ক্রিকেটে কীভাবে সুফল আনবে বলে আপনি মনে করেন?
রুবাবা: ডব্লিউবিপিএল ম্যাচের এক্সপোজার বাড়াবে, আর্থিক সুযোগ তৈরি করবে, বিদেশি পেশাদারদের আকর্ষণ করবে এবং আমাদের খেলোয়াড়দের মার্কেট ভ্যালু তৈরি করবে। নারী ক্রিকেটে যদি কোনো বাণিজ্যিক ইঞ্জিন না থাকে, তবে এটি সবসময় নির্ভরশীল হয়ে থাকবে। ডব্লিউবিপিএল হলো স্বনির্ভরতার বিষয়।
ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকানার জন্য এখন পর্যন্ত কেমন সাড়া পেয়েছেন?
রুবাবা: বর্তমান পুরুষ বিপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকসহ বেশ কয়েকটি পক্ষ আগ্রহ দেখিয়েছে। আমরা সেগুলো চূড়ান্ত করার জন্য [৪ মার্চ] ইওআই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষায় আছি। আমরা টাইটেল স্পনসরশিপ নিয়েও আলোচনা করছি। আমি এটিকে কেবল একবারের টুর্নামেন্ট হিসেবে দেখতে চাই না, বরং চাই এটি একটি নিয়মিত টুর্নামেন্ট হোক যা নারী ক্রিকেটারদের পেশাদার ক্যারিয়ারের জন্য একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করবে।
পুরুষদের বিপিএলে খেলোয়াড়দের পেমেন্ট এবং সততা নিয়ে বড় উদ্বেগ ছিল। নারী বিপিএলে যাতে এই সমস্যাগুলো না ঘটে সেজন্য আপনারা কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
রুবাবা: ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক নির্বাচনের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা এবং আর্থিক সক্ষমতা আমাদের প্রধান মানদণ্ড। খেলোয়াড়দের পেমেন্ট নিশ্চিত করতে আমরা ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি এবং সিকিউরিটি ডিপোজিট নিচ্ছি, ঠিক যেমনটা পুরুষদের বিপিএলে করা হয়। যেহেতু আমরা মাত্রই পুরুষদের বিপিএল শেষ করেছি, তাই এই প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত করার এবং কোনো ফাঁকফোকর এড়ানোর মতো কাঠামো আমাদের হাতে আছে।
আপনারা এপ্রিলের একটি সময় বেছে নিয়েছেন যখন অনেক আন্তর্জাতিক দলের খেলা থাকে না। বিদেশি খেলোয়াড়দের কাছ থেকে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
রুবাবা: আমরা প্রতি দলে সর্বনিম্ন দুইজন এবং সর্বোচ্চ তিনজন আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় রাখার অনুমতি দিচ্ছি। আমরা এরই মধ্যে সরাসরি ইমেল এবং এমন খেলোয়াড়দের আগ্রহ পেয়েছি যারা সূচি সম্পর্কে জানতে চায়। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ কেউ আমাদের খেলোয়াড়দের সঙ্গেও কথা বলেছেন। ৪ তারিখে দলগুলো নির্বাচিত হয়ে গেলে আমরা অন্যান্য কাজ শুরু করব।
প্রতিভা বিকাশে শক্তি বাড়াতে আপনারা কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছেন?
রুবাবা: প্রথমবারের মতো আমরা নারী দলের জন্য হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) প্রোগ্রাম শুরু করছি। সেখানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন নারী খেলোয়াড় থাকবেন এবং এটি বিশ্বকাপের পর শুরু হবে। তারা পুরুষ এইচপি দলের মতোই একই মানদণ্ডে এবং একই কোচের [ডেভিড হেম্প] অধীনে প্রশিক্ষণ নেবেন। আমরা বিকেন্দ্রীকরণের দিকেও নজর দিচ্ছি, যা সিলেটে একটি সেটআপের মাধ্যমে শুরু হবে এবং আমরা স্কুল পর্যায়ে মেয়েদের ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করছি। আমরা এখন আগামী ছয় মাসের মধ্যে কাঠামোটি চূড়ান্ত করার কাজ করছি।
জাহানারা আলমের হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ব্যাপারে আপনি কী ভাবছেন?
রুবাবা: এই বিষয়টি ২০২১-২২ সময়কালে ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বর্তমান বোর্ড যখন অভিযোগটি পায়, তখন আমরা এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি এবং একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্তের ফলাফলের পর বোর্ড প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করেছে এবং যেখানে একটি অভিযোগে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে, সেখানে আমরা আমাদের এক্তিয়ারের মধ্যে ব্যবস্থা নিয়েছি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিসিবির অধীনে সব ধরনের ক্রিকেটীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করেছি।
আমাদের অগ্রাধিকার হলো জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া বজায় রাখা এবং এটি পুনর্ব্যক্ত করা যে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও মর্যাদা আমাদের অগ্রাধিকার এবং যেকোনো ধরনের হয়রানির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’।
আপনি নতুন একটি অভিযোগ কমিটিরও সভাপতিত্ব করছেন। কোনো অভিযোগ কি পেয়েছেন?
রুবাবা: হ্যাঁ, আমরা এখন কয়েকটি হয়রানির মামলা নিয়ে কাজ করছি। আমরা এরই মধ্যে কিছু অভিযোগের ওপর কাজ শুরু করেছি। আমি খেলোয়াড়, কর্মকর্তা এবং উচ্চপদস্থ ব্যবস্থাপনার জন্য যৌন হয়রানি এবং নীতিমালা বিষয়ে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিচ্ছি। আমি এরই মধ্যে এমন প্রশিক্ষণ প্রদানকারী কয়েকজন আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। লিখিত অভিযোগ পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করার জন্য আমাদের একটি পাঁচ সদস্যের কমিটি রয়েছে।
এই অবৈতনিক ভূমিকায় কাজ চালিয়ে যেতে আপনাকে কী অনুপ্রাণিত করে?
রুবাবা: অতীতে ক্রিকেট স্পনসরদের সঙ্গে কাজ করার সুবাদে এই খেলার প্রতি আমার একটি দুর্বলতা রয়েছে, তবে আমার মূল লক্ষ্য হলো নারী ক্রিকেটারদের সমর্থন করা এবং এটি নিশ্চিত করা যে নারী উইংকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং তারা যেন স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে।
আপনি জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মনোনীত সদস্য হিসেবে বোর্ডে যোগ দিয়েছেন। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর আপনি কি মনে করেন যে এই পদে বহাল থাকতে পারবেন?
রুবাবা: সেই সিদ্ধান্ত নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করে। আপাতত আমার লক্ষ্য হলো—এই মাসগুলোতে যে ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে, তা যেন নারী ক্রিকেটের জন্য পরিমাপযোগ্য দীর্ঘমেয়াদী ফলাফলে রূপান্তরিত হয়।