ইরানে গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ফ্লাইট চলাচলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে একাধিক দেশ তাদের আকাশসীমা ও গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়ায় বিভিন্ন দেশে আটকা পড়েছেন হাজারো যাত্রী। এর প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের দেশগুলোতেও।
বার্তাসংস্থা এপিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব ও যাত্রীদের ভোগান্তির খবর।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং সংস্থা ‘ফ্লাইটরাডার-২৪’ এর তথ্য অনুযায়ী, রোববার মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত সাতটি বিমানবন্দরে ৩ হাজার ৪০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
যেসব বিমানবন্দর বন্ধ
মধ্যপ্রাচ্যের সাতটি বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো হলে—দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, দোহার হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, আবুধাবির জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, শারজাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বাহরাইন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দুবাই ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল আল মাকতুম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
এসব বিমানবন্দর কবে নাগাদ চালু হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিভিন্ন এয়ারলাইনস কোথায়-কতদিন পর্যন্ত কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে তার তথ্য দিয়েছে।
এমিরেটস এয়ারলাইনস জানিয়েছে, সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের সময় বিকেল ৩টা পর্যন্ত দুবাই এয়ারপোর্ট দিয়ে ফ্লাইট চলাচল স্থগিত থাকবে।
কাতার এয়ারওয়েজ জানিয়েছে, আকাশসীমা নিরাপদ হলেই কার্যক্রম শুরু করবে তারা। দোহার সময় সোমবার সকাল ৯টার মধ্যে আপডেট তথ্য দেবে তারা।
ইত্তেহাদ এয়ারওয়েজ জানিয়েছে, সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের সময় রাত ২টা পর্যন্ত আবুধাবিতে ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে।
এয়ারলাইনসগুলো যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে অনলাইনে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে।
যেসব বিমানবন্দরে হামলা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার বিপরীতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত দুই দেশে তিনটি বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, শনিবার ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাদের দুটি বিমানবন্দর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এর মধ্যে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চারজন আহত হয়েছেন।
আবুধাবির জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় একজন নিহত ও সাতজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলা হয়েছে। এতে কয়েকজন কিছুটা আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
আকাশসীমা বন্ধ যেসব দেশে
পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ৭টি দেশের আকাশসীমা পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতও অস্থায়ী ও আংশিক আকাশসীমা বন্ধের ঘোষণা দেয়। তবে দেশটির ওপর দিয়ে বিমান চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে।
আকাশসীমা বন্ধের পর এসব দেশ থেকে বহু ফ্লাইট মাঝপথে ঘুরিয়ে অন্য বিমানবন্দরে অবতরণ করানো হয়।
কতদিন চলবে ভোগান্তি
বিমান চলাচল বিশ্লেষক ও অ্যাটমোসফিয়ার রিসার্চ গ্রুপের প্রেসিডেন্ট হেনরি হার্টেভেল্ট এপিকে বলেন, ‘পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।’
যাত্রীদের আগামী কয়েক দিন ফ্লাইট বিলম্ব ও বাতিলের জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
সংঘাতপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে অনেক বিমান এখন সৌদি আরবের দক্ষিণ দিক দিয়ে ঘুরে চলাচল করছে, ফলে যাত্রার সময় ও জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে। এতে বিমান ভাড়াও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা জানান, সামরিক কার্যক্রমের ঝুঁকি কমলে আগামী ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে কিছু দেশ ধাপে ধাপে আকাশসীমা খুলে দিতে পারে।
তবে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
বিশ্বজুড়ে প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যে ফ্লাইট বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে অন্যান্য দেশেও।
বিমান চলাচল বিষয়ক সংস্থা ‘ফ্লাইটঅ্যাওয়ার’ জানিয়েছে, শনিবার রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ১৮ হাজারের বেশি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে এবং বাতিল করা হয়েছে ২ হাজার ৩৫০টির বেশি।
ইন্দোনেশিয়ার পর্যটন দ্বীপ বালির বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, মধ্যপ্রাচ্যগামী অন্তত ১ হাজার ৬০০ পর্যটকের ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট হাব দুবাই, আবুধাবি ও দোহা বিমানবন্দর বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
বিমান চলাচল বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, এই তিন হাব দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৯০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে আরও বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিতে পারে এবং যাত্রীদের বিকল্প পথ ব্যবহার করে গন্তব্যে পৌঁছাতে হতে পারে।