জন্মনিরোধক সংকটে দেশে বাড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ

Date:

দেশে জন্মনিরোধক সামগ্রীর চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ৪৮৭টি উপজেলার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এলাকায় সরকারিভাবে সরবরাহ করা সব ধরনের জন্মনিরোধক ইতোমধ্যে ফুরিয়ে গেছে। এতে অনিচ্ছাকৃত বা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের (ডিজিএফপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে চলে আসা এই সরবরাহ ঘাটতি এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জন্মনিরোধক পদ্ধতি কনডম। বর্তমানে ৩৯৭টি উপজেলায় এই সামগ্রীটি সম্পূর্ণ স্টক-আউট বা মজুতহীন অবস্থায় রয়েছে।

ডিজিএফপি সারা দেশে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মাধ্যমে পাঁচ ধরনের জন্মনিরোধক—কনডম, খাওয়ার বড়ি (ওরাল পিল), আইইউডি (ইন্ট্রা ইউটারিন ডিভাইসেস), ইনজেকশন এবং ইমপ্ল্যান্ট বিনামূল্যে সরবরাহ করে থাকে।

২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২২০টি উপজেলায় খাওয়ার বড়ির মজুত শেষ হয়ে গেছে। পাশাপাশি দেশের সবকটি উপজেলাতেই ইমপ্ল্যান্ট নেই। এছাড়া ৩৫৩টি উপজেলায় আইইউডি এবং ১৬৯টি উপজেলায় ইনজেকশনের মজুতও ফুরিয়ে গেছে।

গত এক বছরে জন্মনিরোধক সামগ্রীর সরবরাহ ক্রমাগত কমেছে। উদাহরণ হিসেবে, গত বছরের জানুয়ারিতে যেখানে ৫৩ দশমিক ৩১ লাখ কনডম সরবরাহ করা হয়েছিল, চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা কমে মাত্র ৭ দশমিক ৪৯ লাখে নেমে এসেছে, অর্থাৎ ৮৫ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, চলমান এই সংকট জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যখন গত পাঁচ দশকের মধ্যে দেশে প্রথমবারের মতো মোট প্রজনন হার (টিএফআর) বেড়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, জন্মনিরোধক ব্যবহারের হার কমে যাওয়া এবং প্রজনন হার বৃদ্ধি পাওয়া—দুটোই ইঙ্গিত দেয় যে তৃণমূল পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি ঠিকমতো কাজ করছে না।

তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, জন্মনিরোধক সরবরাহে এই বিঘ্ন সরাসরি নিম্নবিত্ত মানুষকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে, কারণ বাজার থেকে কিনে ব্যবহারের সামর্থ্য তাদের অনেকেরই নেই। ফলে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ বেড়ে যেতে পারে।

অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম আরও জানান, দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ সংকট প্রজনন হার বাড়িয়ে দিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত দেশের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের পথে বাধা সৃষ্টি করবে।

ডিজিএফপি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সব ধরনের জন্মনিরোধক কেনার জন্য গত বছরের নভেম্বরে অনুমোদিত বড় প্রকল্পটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। পুরো কেনাকাটার প্রক্রিয়া শেষ করতে কমপক্ষে চার মাস সময় লাগবে।

সংকট সামাল দিতে ডিজিএফপি জরুরি ভিত্তিতে সীমিত আকারে কনডম ও খাওয়ার বড়ি কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এতে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

গত নভেম্বরে প্রকাশিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ (মিকস)’-এর ফল প্রকাশের তিন মাস পর এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সামনে এলো। ওই জরিপে দেখা গেছে, প্রজনন হার (টিএফআর) ২০১৯ সালের ২ দশমিক ৩ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৪ হয়েছে।

জরিপে আরও উঠে এসেছে, জন্মনিরোধক ব্যবহারের হার এবং আধুনিক পদ্ধতির সুবিধা পাওয়ার সুযোগ—দুটোই কমেছে। এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, জন্মনিরোধক সামগ্রীর সংকটের সঙ্গে প্রজনন হার বাড়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যেহেতু গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বড় অংশ সরকারি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল, তাই সরবরাহ কমে যাওয়া জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে ব্যাহত করবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ইউনিসেফের যৌথ জরিপ অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের জন্মনিরোধক ব্যবহারের হার ২০১৯ সারে সর্বোচ্চ দেখা গিয়েছিল, ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ। সেখান থেকে কমে এখন ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। আধুনিক জন্মনিরোধক পদ্ধতির চাহিদা পূরণের হারও ৭৭ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে কনডম সরবরাহ ছিল ৯৯ দশমিক ২৪ লাখ, খাওয়ার বড়ি ৭২ দশমিক ৩৫ লাখ, ইনজেকশন ৯ দশমিক ৫ লাখ, আইইউডি শূন্য দশমিক ১৪ লাখ এবং ইমপ্ল্যান্ট শূন্য দশমিক ৩৫ লাখ।

ধীরে ধীরে এই মজুত কমতে কমতে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। তখন কনডম সরবরাহ দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৫৪ লাখে। খাওয়ার বড়ির মজুত ছিল ২১ দশমিক ৯৬ লাখ, ইনজেকশন ৪ দশমিক ৮২ লাখ, আইইউডি ৩ হাজার ২৮৬টি এবং ইমপ্ল্যান্ট ২ হাজার ৩২৫টি।

ডিজিএফপির তথ্যমতে, ৩৯৭টি উপজেলায় কনডম পুরোপুরি শেষ। ৫০টি উপজেলায় মজুত শেষের পথে, সর্বোচ্চ আর ১৮ দিন চলবে। আরও ৯টি উপজেলায় মজুত প্রয়োজনের তুলনায় কম, সর্বোচ্চ ৪৮ দিন চলতে পারে। 

মাত্র ৭টি উপজেলায় সন্তোষজনক মজুত রয়েছে (৫১ থেকে ৯০ দিন চলবে), আর ২৪টি উপজেলায় তিন মাসের বেশি চলার মতো মজুত আছে।

খাওয়ার বড়ির ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সংকটজনক। ২২১টি উপজেলায় কোনো মজুত নেই। ১২৫টি উপজেলায় মজুত প্রায় শেষ, ৬৩টি উপজেলায় কম। মাত্র ৪১টি উপজেলায় সন্তোষজনক এবং ৩৭টি উপজেলায় অতিরিক্ত মজুত রয়েছে।

রাজশাহী বিভাগের এক জেলা উপপরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এক বছরের বেশি সময় ধরে সরবরাহ সংকট চলছে। সামান্য পরিমাণে কিছু সরঞ্জাম পাওয়া গেলেও এখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

তিনি জানান, ইনজেকশনের মজুত এক মাসেরও কম তাদের কাছে। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা সেবাগ্রহীতাদের চাপে থাকছেন। এই সংকটের বিরূপ প্রভাব দুই-তিন বছর পর দৃশ্যমান হবে।

লজিস্টিকস অ্যান্ড সাপ্লাই ইউনিটের পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক জানান, সরকার গত নভেম্বরে ১ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকার একটি ক্রয় প্রকল্প অনুমোদন দিলেও প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মাত্র গত সপ্তাহে।

তিনি ২২ ফেব্রুয়ারি জানান, পরিচালক এখন ক্রয়প্রক্রিয়া শুরু করবেন, তবে তা শেষ করতে অন্তত চার মাস লাগবে।

বর্তমানে হাতে থাকা তহবিল দিয়ে ডিজিএফপি ১ কোটি ২০ লাখ কনডম এবং ৩০ লাখ খাওয়ার বড়ি কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

রাজ্জাক বলেন, ঈদুল ফিতরের পর কনডম হাতে পাওয়ার আশা করা হচ্ছে, তবে খাওয়ার বড়ি পেতে আরও সময় লাগবে। এই পরিমাণ সামগ্রী সংকট মোকাবিলায় খুবই সামান্য।

ডিজিএফপি কর্মকর্তারা জানান, ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় জন্মনিরোধকের ববহার কমে যায়। কিন্তু তৎকালীন সরকার এই কমার হার বাড়ানোর ব্যাপারে তৎপর হয়নি।

২০২৪ সালের জুনে ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি’ (এইচপিএনএসপি) শেষ হওয়ার পর সংকট আরও তীব্র হয়, কারণ এর আওতায় আগের বেশিরভাগ কেনাকাটা হতো।

যোগাযোগ করা হলে ডিজিএফপি মহাপরিচালক আশরাফী আহমদ বলেন, গত বছর সামান্য কিছু কেনাকাটা ছাড়া ২০২৩ সাল থেকে আমরা কোনো জন্মনিরোধক কিনতে পারিনি।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি তিনি বলেন, এই সংকটের ক্রমপুঞ্জিত প্রভাব রয়েছে। আমরা এটা অস্বীকার করতে পারি না… সত্য বলতে, তৎকালীন সময়ে পরিবার পরিকল্পনা খাত যথাযথ অগ্রাধিকার পায়নি।

প্রজনন হার বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, এই সংকট রাতারাতি কাটবে না, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নিয়েছে এবং সংকট নিরসনের বিষয়টি তাদের নজরে আনা হবে।

Popular

More like this
Related

ইসরায়েল-মার্কিন যৌথ হামলায় ইরানে নিহত ২০১, আহত ৭৪৭

ইরানে ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ২০১ জন নিহত ও ৭৪৭...

ইরানে ইতিহাসের ‘বৃহত্তম বিমান হামলা’র দাবি ইসরায়েলের

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর হামলায় নিজেদের...

শ্রীলঙ্কাকে হারিয়েও পাকিস্তানের বিদায়, সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ড

৮ উইকেটে ২১২ রানের বড় পুঁজি পাওয়া পাকিস্তানকে সেমিফাইনালে...

খামেনির পতন হলেও যেভাবে চলতে পারে ইরানের শাসনব্যবস্থা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা যে যুদ্ধে রুপ...