‘এই বীজগুলো আমার সন্তানের মতো, এগুলো আমার জীবনের সঙ্গী। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ এই বীজগুলোর সাথেই আমার সময় কাটে,’ কথাগুলো বলছিলেন করুণা মন্ডল (৫৫)।
গৃহবধূ করুণা মন্ডল খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার শুকদাড়া গ্রামের বাসিন্দা। বিয়ের পর থেকে প্রায় ৪১ বছর ধরে তিনি কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। আর তখন থেকেই দেশীয় বিভিন্ন প্রকারের বীজ সংরক্ষণ শুরু করেন। নিজ গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের অনেকেই তার কাছ থেকে দেশীয় বীজ সংগ্রহ করে নিয়ে যান।
আজ বৃহস্পতিবার বটিয়াঘাটা উপজেলা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত বীজ মেলায় তিনি ৩১৬ প্রকারের বীজ নিয়ে এসেছিলেন। হাতে ছোট ছোট কৌটা—ভেতরে রোদে শুকানো ধান, ডাল আর সবজির বীজ। প্রায় চার দশক ধরে তিনি এভাবেই আগলে রেখেছেন হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় জাতের বীজ।
তিনি বলেন, সারা বছর ধরে নানান উপায়ে নতুন নতুন বীজ সংগ্রহ করি। রোদে শুকানোর পর কৌটায় ভরে রাখি। সেই বীজগুলোতে যেন বাতাস না ঢোকে, সেই ব্যবস্থা করা হয়। আবার কোনো কোনো বীজের ক্ষেত্রে সংরক্ষণের প্রয়োজনে কৌটার মুখ সামান্য খোলা রাখা হয়, যাতে বাতাসের সংস্পর্শে থাকে।
‘এই বীজ সংগ্রহ করে ব্যক্তিগতভাবে আমি লাভবান হচ্ছি। তেমনই এই বীজ বিক্রি করে আর্থিকভাবে কিছুটা স্বাবলম্বীও হচ্ছি। এই বীজগুলো জমিতে লাগাই, আবার অন্যের সঙ্গে বিনিময়ও করি। বোঝার চেষ্টা করি কার বীজে উন্নতমানের সবজি বা ফসল হয়। ধান, সবজি, ডাল, আমের বীজসহ প্রায় ৩১৬ প্রকারের বীজ আমার সঙ্গে আছে,’ বলেন তিনি।
করুণা মন্ডলের মতো শতাধিক গ্রামীণ নারীকে কেন্দ্র করেই খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলা অডিটোরিয়ামে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হলো দিনব্যাপী ‘গ্রামীণ বীজমেলা ২০২৬’। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লোকজ ও মৈত্রী কৃষক ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে এবং জার্মানিভিত্তিক সংস্থা মিজরিও’র সহযোগিতায় আয়োজিত এই মেলা পরিণত হয় দেশীয় বীজ রক্ষার এক প্রাণবন্ত উৎসবে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আধুনিক উচ্চফলনশীল জাতের ভিড়ে আমাদের আদি জাতগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এই মেলার মাধ্যমে কৃষকরা একে অপরের সঙ্গে বীজ বিনিময়ের সুযোগ পেয়েছেন, যা আগামী মৌসুমে চাষাবাদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মেলার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন স্থানীয় ১৭টি গ্রামের অর্ধশতাধিক নারী কৃষক। তারা তাদের সংরক্ষিত কয়েকশ প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় ধান, সবজি, ডাল ও তেলবীজ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন।
স্টলগুলো ঘুরে দেখা যায় হরেক রকম দেশীয় ধান—মরিচশাইল, রানীসালোট, হিজলি, দিঘা, মোরগশাইল, কালামাণিক—এছাড়া বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন সবজির বীজ। গ্রামীণ নারীরা কেবল প্রদর্শনীই নয়, নিজেদের মধ্যে বীজ বিনিময় এবং আগত দর্শনার্থীদের কাছে তা বিপণন ও বিতরণও করেন।
বটিয়াঘাটা উপজেলার শুকদাড়া গ্রামের গৃহবধূ দিপালী মন্ডল ৫০ প্রকারের শাকের বীজ—লাল শাক, পুঁই শাক, ডাটা শাকসহ অন্যান্য সবজির বীজ নিয়ে এসেছেন। তিনি জানান, প্রতিবছর গ্রামে যে বীজ মেলা হতো, এবছর তা উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয়েছে।
তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এই বীজ মেলায় আসলে জানতে পারি কার কাছে কত প্রকারের বীজ আছে, কোন বীজে ফলন বেশি হয়। আবার বীজ সংরক্ষণের বিভিন্ন পদ্ধতির প্রতিযোগিতায় এখানে পুরস্কারের ব্যবস্থাও আছে। ফলে বীজ সংরক্ষণ করে পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টা খুবই চমৎকার।’
বটিয়াঘাটা সদরের গৃহবধূ জয়া রায় কৌতূহল নিয়ে প্রথমবারের মতো এই বীজ মেলা দেখতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, অনেক কিছু দেখলাম এবং শেখার চেষ্টা করলাম—গ্রামে থেকে বীজ কীভাবে সংরক্ষণ করে, কীভাবে বীজ থেকে চারা তৈরি করতে হয়। বীজ মেলা দেখে সত্যিই ভালো লাগলো।
‘নিজে এটি প্রয়োগ করার চেষ্টা করব,’ বলেন তিনি।
বীজ মেলা নিয়ে লোকজের প্রধান নির্বাহী দেবপ্রসাদ সরকার বলেন, ‘গ্রামীণ বীজ মেলার মূল উদ্দেশ্য আমাদের দেশীয় বীজ, যা আজ হারিয়ে যাচ্ছে, সেগুলো সংরক্ষণ করা। প্রত্যন্ত গ্রামেও এখন বিদেশি বীজের আগ্রাসন পৌঁছে গেছে—বীজের প্যাকেট সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। ফলে আগে যারা দেশীয় বা লোকাল বীজ লাগাতেন, তারা এখন উচ্চফলনশীল বীজ লাগাচ্ছেন। যদিও আমরা উচ্চফলনশীল বীজ লাগানোর বিপক্ষে নই। কিন্তু হাইব্রিড বা বন্ধ্যা বীজ এখন গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বহুজাতিক কোম্পানির এই বীজের আগ্রাসনের ফলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কারণ হাইব্রিড বীজ থেকে উৎপাদিত সবজি বা ফসল থেকে বীজ সংগ্রহ করে রাখা যায় না। তাছাড়া অধিক দামে এই বীজ কিনতে হয় এবং এতে সার ও কীটনাশক বেশি ব্যবহার করতে হয়।’
‘আমরা চাই কৃষকরা যেন বন্ধ্যা বীজের কবলে না পড়ে দেশীয় বীজ সংরক্ষণ করেন। কারণ দেশীয় বীজে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হয় না, উৎপাদিত ফসলের স্বাদ বেশি হয়, কীটনাশকও কম লাগে,’ বলেন তিনি।
মেলা শেষে সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বটিয়াঘাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার খন্দকার কামরুজ্জামান বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে আমাদের দেশীয় জাতের বীজগুলোই সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। প্রান্তিক নারী কৃষকরা যেভাবে বংশপরম্পরায় এই বীজগুলো টিকিয়ে রেখেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।’
মেলায় প্রদর্শিত স্টলগুলোর বীজের সংখ্যা, বৈচিত্র্য, মান এবং উপস্থাপন কৌশলের ভিত্তিতে নির্বাচনী প্যানেল অংশগ্রহণকারী নারী কৃষকদের মূল্যায়ন করে। এতে শুকদাড়া গ্রামের করুণা মন্ডল প্রথম, নমিতা সরকার দ্বিতীয় এবং হালিয়া গ্রামের শিউলী মন্ডল তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। পাশাপাশি মেলায় অংশগ্রহণকারী সকল নারী কৃষককে পুরস্কৃত করা হয়।