অর্থনৈতিক চাপে প্রাইভেটকার বিক্রি কমে ১৩ বছরে সর্বনিম্ন

Date:

বাংলাদেশে প্রাইভেটকার বিক্রি কমে গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

গত বছর নিবন্ধন হয়েছে ৯ হাজার ৩৮৭টি নতুন প্রাইভেটকার। ২০২৪ সালেও ১০ হাজার ৪৯৯ ও ২০২৩ সালে ১০ হাজার ৭৮৪ নতুন নিবন্ধন দিয়েছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০১১ সালের পর কোনো বছর গাড়ির নিবন্ধ এত কম সংখ্যক হয়নি।

ব্যবসায়ী ও বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থনৈতিক অব্যাহত চাপ, আমদানিতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে গাড়ির বাজারে।

করোনা মহামারির আগে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ওঠা এই বাজার দীর্ঘদিন ধরেই নিম্নমুখী। এর কারণ ডলারের মূল্য বাড়ায় গাড়ির দাম বেড়ে যাওয়া, আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি, ব্যবসার দুর্বল পরিবেশ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া, বলেন তারা।

এইচএনএস গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—দুটি কারণ একসঙ্গে বাজারে প্রভাব ফেলেছে। ফলে গাড়ি বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।

‘দেশের সামগ্রিক ব্যবসা পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বছর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দুর্বল ছিল। সরবরাহ শৃঙ্খলও মসৃণ ছিল না। আমাদের নিজস্ব সরবরাহ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে,’ বলেন তিনি।

শহীদুল আরও বলেন, তারল্য সংকটে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। ‘ভয় ও অনিশ্চয়তা ছিল, আর তারল্য সংকটের কারণে মানুষ খরচের ব্যাপারে সতর্ক।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, গত বছর ভোক্তা ঋণের সুদের হার বেড়ে ১২ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, ২০২২ সালে যা ছিল ৮ থেকে ৯ শতাংশ।

ঋণের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা আরও কমে গেছে। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) এই সাবেক মহাসচিব ইসলাম বলেন, ‘ঋণের সুদের হার বেড়েছে এবং অর্থের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে গ্রাহকরা ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনতে নিরুৎসাহিত হয়েছেন।’

একই সময়ে মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে গাড়ির দাম বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘ডলারের মূল্য এক সময় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। যে গাড়ি আগে ১৬ লাখ টাকায় বিক্রি হতো, সেটার দাম বেড়ে প্রায় ২৪ লাখ টাকায় পৌঁছায়,’ তুলনামূলক সাশ্রয়ী গাড়ির উদাহরণ দিয়ে বলেন তিনি।

শহীদুলের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সড়কে আন্দোলন ও ব্যবসায়িক বিঘ্নতার কারণে ভোক্তাদের আস্থা কমেছে। 
তিনি বলেন, ‘যখন অনিশ্চয়তা থাকে এবং ব্যবসা ঝামেলার মধ্যে পড়ে, তখন মানুষ বেশি টাকা খরচ করে কেনাকাটার সিদ্ধান্তে যেতে চান না। সব মিলিয়েই বিক্রি কমে গেছে।’

রিয়াজ মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াজ রহমান বলেন, গত বছর গাড়ি বিক্রি ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল এবং বাজারে ‘অত্যন্ত ধীরগতি’।

এই মন্দার জন্য ব্যয় বৃদ্ধি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ব্যাংকিং পরিস্থিতি দায়ী। আরও দুই থেকে তিন বছর আগে গাড়ির দাম বাড়লেও, গত দুই বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নে ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে, বলেন তিনি।

রিয়াজ বলেন, ‘ডলারের হার ৩০ শতাংশের বেশি বাড়ায় আমদানি ব্যয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়েছে। শুল্কও সে অনুযায়ী বেড়েছে। ফলে অনেক গাড়ি মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।’

বারভিডা বর্তমান মহাসচিব রিয়াজ আরও বলেন, গত দুই বছরে রাজনৈতিক ও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা ভোক্তাদের আস্থা দুর্বল করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে পরিস্থিতিও ব্যবসায়িক মনোভাবকে আরও শ্লথ করেছে।

রিকন্ডিশন্ড গাড়ির প্রধান উৎস জাপানে সরবরাহ সংকটের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, বাংলাদেশে ৫ বছর পর্যন্ত পুরোনো গাড়ি আমদানির অনুমতি থাকলেও, ২০২১ ও ২০২২ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় উপযুক্ত মডেলগুলো এখন স্বল্প ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।

‘ওই গাড়িগুলোর জন্য আমরা বিড করলে দাম অনেক বেশি থাকে।’

গাড়ির দাম কমিয়ে সরবরাহ বাড়াতে এবং রাজস্ব বাড়াতে ৭ বা ৮ বছরের পুরোনো গাড়ি আমদানির অনুমতি দেওয়ার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

মোটরস বে এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ খান বিপু মনে করেন, আর্থিক সংকট ও দুর্বল ব্যবসায়িক মনোভাবই গাড়ি বিক্রি কমার প্রধান কারণ। বলেন, ‘আমার মতে, মানুষ বড় অঙ্কের নগদ অর্থ ব্যয় করতে অনীহা বোধ করছে। ৪০ থেকে ৬০ লাখ টাকার গাড়ি কিনলে বড় অঙ্কের অর্থ আটকে যায়, আর ঋণ নিলে কিস্তি পরিশোধের চাপ তৈরি হয়। ব্যবসায় ধীর গতি থাকলে কিস্তি কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন গ্রাহকরা। এই আর্থিক চাপই বড় কারণ।’

সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দা সব খাতের মতো গাড়ি খাতেও প্রভাব ফেলেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থায় বড় বিনিয়োগ ও তারল্য প্রবাহ সাধারণত দুর্বল থাকে, যা বড় অঙ্কের কেনাকাটা নিরুৎসাহিত করে, যোগ করেন তিনি।

বিপু আরও বলেন, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নে সিবিইউ (সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় বিদেশ থেকে আমদানি করা) গাড়ির দাম বেড়েছে, ফলে নতুন গাড়ি মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।

চীনা ও বৈদ্যুতিক ব্র্যান্ডের উত্থানে বাজার অংশীদারত্বে পরিবর্তন এলেও, সরকারি তথ্য অনুযায়ী সামগ্রিকভাবে গাড়ি কেনার সংখ্যা কমেছে, জানান বিপু।

Popular

More like this
Related

টেন্ডার নিয়ে জামায়াতের ২ নেতাকে মারধরের অভিযোগ বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে

পাবনার চাটমোহর উপজেলায় হাট-বাজার ইজারার টেন্ডার জমা দেওয়া নিয়ে...

অভিষেক ও হার্দিকদের তাণ্ডবে ভারতের রেকর্ড পুঁজি

বাঁচা-মরার লড়াইয়ে একাদশে দুই বদল নিয়ে নামল ভারত, বাড়াল...

মাথাপিছু আয় ১ শতাংশ বেড়ে ২৭৬৯ ডলার

দেশে বার্ষিক মাথাপিছু আয় ১ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার...

কক্সবাজারে গ্যাস স্টেশনে বিস্ফোরণ: ৬ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক

কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকায় এলপিজি গ্যাস স্টেশনে বিস্ফোরণে আহতদের...