ইরানে হামলার ছুতা খুঁজছেন ট্রাম্প?

Date:

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দুই ধরনের সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। এক ধরনের সংবাদে দেখা যাচ্ছে—ইরানের ‘ইতিবাচক’ ভাষ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির ‘আশাবাদ’। অন্য সংবাদে দেখা যাচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রের ‘নেতিবাচক’ বক্তব্য বা ইরানে সম্ভাব্য সামরিক হামলার আশঙ্কা।

২২ ফেব্রুয়ারি মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত ফক্স নিউজকে বলেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশাল উপস্থিতি সত্ত্বেও ইরান কেন ওয়াশিংটনের দাবির কাছে মাথা নত করছে না তা দেখে বিস্মিত ট্রাম্প।’

এর একদিন আগে ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম তেহরান টাইমসের প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘ইসরায়েলের জন্য যুদ্ধ করে ট্রাম্প মার্কিনিদের জীবন ও অর্থনীতি ঝুঁকিতে ফেলছে’।

অন্যদিকে, ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেল টুয়েলভ-এর জরিপে বলা হচ্ছে—প্রায় ৫৯ শতাংশ ইসরায়েলি ইরানে মার্কিন হামলায় তেল আবিবের যোগ দেওয়াকে সমর্থন করেন। জরিপে অংশ নেওয়া ২৯ শতাংশ ইসরায়েলি এর বিরোধী।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্পের পছন্দের সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ জানিয়েছিল—ইরানকে ১০ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছেন ট্রাম্প, কিন্তু, বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটি হামলার আগে সময় নেওয়ার কৌশল হতে পারে।

২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের ইরান হামলার ঘটনা টেনে এর প্রতিবেদনে বলা হয়—সেসময় ট্রাম্প বলেছিলেন যে তিনি ইরানে হামলা করবেন কিনা সে বিষয়ে ‘দুই সপ্তাহের মধ্যে’ সিদ্ধান্ত নেবেন। বাস্তবে দেখা গেল, সবাইকে অবাক করে তিনি দুইদিন পরেই ইরানে হামলা চালিয়ে বসলেন।

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় শান্তি ফেরাতে ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত ‘বোর্ড অব পিস’ সভায় এক সম্ভাব্য অশান্তির প্রস্তাব দিয়ে বসেন যুক্তরাষ্ট্রের মহাক্ষমতাধর রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প। তিনি তেহরানকে সম্ভাব্য সমঝোতার জন্য ‘১০ দিনের’ সময় বেঁধে দেন। তা না হলে ‘ফলাফল’ ভোগ করতে হবে বলেও হুঁশিয়ার করেন।

ট্রাম্পের এমন হুমকি কৌশলে যুদ্ধ ঘোষণার সামিল বলে মনে করেন শান্তিবাদী মানুষেরা।
অথচ, চলতি মাসের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সম্ভাব্য ‘শান্তি চুক্তি’র জন্য কাজ করে যাচ্ছে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি ওমানের মধ্যস্থতায় দেশটির রাজধানী মাসকাটে প্রথম দফা আলোচনার পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় দ্বিতীয় দফা আলোচনায় বসেছিলেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।

জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ইরানি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি।

এ ছাড়াও, জেনেভায় ওমানি মিশনে আয়োজিত ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি।

আলোচনা শেষে কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ‘সন্তোষ’ প্রকাশ করেছিলেন। তবুও, এর দুইদিন পর সব আলোচনার কারিগর ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এলো আসন্ন ‘যুদ্ধের’ ঘোষণা।

যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সদস্যদের নিয়ে গঠিত অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড অ্যাগেনইস্ট নিউক্লিয়ার ইরান-এর অন্যতম পরিচালক জ্যাসন ব্রডস্কি সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেন, ‘ইরানের শাসকরা মহাভ্রান্তির মধ্যে আছেন। ট্রাম্পকে তারা ওবামা মনে করছেন। কিন্তু, ট্রাম্প পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে তা হওয়ার নয়।’

তিনি জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের অনেকেই মনে করে যে ইরানের সঙ্গে আলোচনা থেকে গ্রহণযোগ্য কিছু আসবে না।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে একদিকে যেমন ইরানি শাসকদের চাপে রাখছে; অন্যদিকে, যুদ্ধ শুরুর আগে সময় নিয়ে নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছে।

ইতোমধ্যে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে রণতরি পাঠিয়ে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার শিকার হতে পারে এমন সব ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কাজও চলছে।

মধ্যপ্রাচ্যের একটি সূত্র সংবাদমাধ্যমটিকে জানিয়েছে যে তেহরান এসব বিষয়ে অবগত। ইরানের শাসকদলও জানে তারা যুদ্ধের কতটা কাছাকাছি। তাই এমন পরিস্থিতিতে তারা ট্রাম্পকে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘রাগিয়ে’ দেওয়া থেকে বিরত থাকছে।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি আল জাজিরার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘ইরান বলছে মার্কিন সমরশক্তি বাড়ানোর প্রয়োজন নেই, চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব।’

প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন যে ইরান কূটনৈতিক পন্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তির জন্য প্রস্তুত। তিনি জানান, ওয়াশিংটনের ক্রমাগত হুমকি সত্ত্বেও শান্তি চুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তেহরান।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন—সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার প্রশাসনের তুলনায় বর্তমানের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মোকাবিলা করতে তেহরানকে বেশি বেগ পেতে হবে।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি ফরাসি সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর জানায়—মার্কিন রণতরি জেরাল্ড আর ফোর্ড ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করেছে। ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার প্রেক্ষাপটে এই রণতরিকে ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে সেখানে আনা হলো।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সামরিক দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক উপস্থিতি সত্ত্বেও নতুন করে রণতরি আনা হয়েছে।

এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়—বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি যুদ্ধজাহাজ আছে। এদের মধ্যে একটি রণতরি—আব্রাহাম লিংকন, ৯টি ডেস্ট্রয়ার ও ৩টি কম্ব্যাট জাহাজ।

বর্তমানে ভূমধ্যসাগরে অবস্থান করা বিশ্বের সবচেয়ে বড় রণতরি জেরাল্ড আর ফোর্ডের সঙ্গে ৩টি ডেস্ট্রয়ার আছে, উল্লেখ করে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মোট মার্কিন যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা ১৭ হলো।

এসব যুদ্ধজাহাজে কয়েক হাজার সেনার পাশাপাশি আছে কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান।

ইরান যেখানে বলছে যে আগামী ‘দুই-তিন’ দিনের মধ্যে নতুন পরমাণু চুক্তির জন্য তারা প্রস্তুত, সেখানে যুদ্ধের ওপরই যেন বেশি জোর দিচ্ছে হোয়াইট হাউস।

কিন্তু, শান্তির মাধ্যমে যা সমাধান করা সম্ভব তার জন্য যুদ্ধ কেন? এটি কি শুধুই ইরানকে চাপে ফেলার কৌশল? নাকি ইরানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্ষতি করার নীতি?

ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের ডিস্টিংগুইশড ফেলো, ইরান বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিক বারবারা স্লাভিন মনে করেন, ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করতে সফল নাও হতে পারে।

Middle East Journalist Barbara Slavin: "Iran Gets a New ...

গত ২০ ফেব্রুয়ারি এই বিশ্লেষক ফ্রান্স টুয়েন্টিফোরকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু অবাস্তব দাবি করে বসতে পারে যা ইরানের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হবে না। তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে ট্রাম্প নিজের বিজয় ঘোষণা করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প ছোট ছোট সামরিক হামলার মাধ্যমে যে সফলতা পাচ্ছেন তা তাকে ও তার মিত্রদের আরও ‘আত্মবিশ্বাসী’ করে তুলছে। তবে ট্রাম্পের পরবর্তী নির্দেশ নিয়ে আগেভাগে কিছু বলা মুশকিল বলেও মন্তব্য করেন তারা।

অপর এক প্রতিবেদনে ফরাসি সংবাদমাধ্যমটি জানায়—ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের হুমকি দেওয়ার পরদিন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি বলেছেন, পরমাণু চুক্তি নিয়ে তেহরানের পরিকল্পনা তারা প্রস্তাব আকারে দিতে প্রস্তুত।

সংবাদমাধ্যমটি আরও জানায় যে ট্রাম্প ইরানে সীমিত আকারে সামরিক হামলার কথা ভাবছে। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। তিনি হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বিষয়টি আমি বিবেচনায় রেখেছি।’

একই দিনে তেহরান টাইমস-এর এক মতামত প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করতে পারবে কিন্তু, নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না’।

প্রতিবেদনটিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বক্তব্য তুলে ধরা হয়। সম্প্রতি, দেশটিতে গণবিক্ষোভ দমন করা এই নেতা মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের সামরিক উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে বলেন, ‘আমেরিকার যুদ্ধজাহাজের তুলনায় ভয়ঙ্কর অস্ত্র সাগরের নিচ দিয়ে পাঠানো হবে’।

শত্রুপক্ষের নজরদারি ফাঁকি দিতে সক্ষম এমনসব ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইরান পারস্য উপসাগরে থাকা মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর প্রভূত ক্ষতি করতে পারে বলেও মন্তব্য করা হয়। এতে জানানো হয়, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী ও চারপাশে ছড়িয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।

ফিরে তাকানো যাক তেহরানের দিকে। বিবিসি জানায়, গত ২১ ফেব্রুয়ারি সেখানকার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নতুন করে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে। সরকার সমর্থকদের সঙ্গে বিরোধীদের সংঘর্ষও হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প কোনো ছুতা তুলে ইরানে হামলা করে বসেন কিনা¬—এমন আশঙ্কা অনেকের মনে।

Popular

More like this
Related

চলতি সপ্তাহে আবারও ওয়াশিংটন-তেহরান বৈঠক

ইরান প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তাধারা যেন মুহূর্তেই বদলে যাচ্ছে। একবার...

ভারতকে সবচেয়ে বড় হারের তেতো স্বাদ দিল দক্ষিণ আফ্রিকা

বাজে শুরুর ধাক্কা কাটিয়ে ডেভিড মিলার, ডেওয়াল্ড ব্রেভিস ও...

নতুন চিফ অব জেনারেল স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমান

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল আনা...

কে হচ্ছেন নতুন হামাস নেতা?

গত আড়াই বছরে ইসরায়েলের সরাসরি ও গুপ্ত হামলায় ফিলিস্তিনি...