যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক নিয়ে অস্থিরতা, বাংলাদেশের জন্য বিপদ নাকি সুযোগ

Date:

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘রেসিপ্রোকাল’ বা পারস্পরিক শুল্কব্যবস্থা বাতিল হয়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ও বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা।

তারা মনে করছেন, এতে বাংলাদেশি পণ্যের ক্রয়াদেশ বাড়তে পারে। তবে ঢাকার সঙ্গে ওয়াশিংটনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত বলেই মনে করছেন তারা।

এই অনিশ্চয়তা আরও গভীর হয়েছে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরপরই। রায় ঘোষিত হওয়ার পর পরই ট্রাম্প বিশ্বের সব দেশ থেকে পণ্য আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। গতকাল শনিবার তা আরও বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেছেন।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির এই ঘন ঘন পরিবর্তনের মুখে বাংলাদেশকে কৌশলগত সতর্কতা ও হিসাবনিকাশ করে এগোতে হবে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল না ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে তড়িঘড়ি করে বাণিজ্য চুক্তিটি স্বাক্ষর করা। ভবিষ্যতের দর-কষাকষিতে আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।

মোস্তাফিজুর রহমান উল্লেখ করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এখনো শুল্ক পুনর্বিবেচনা করার সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে, যা ট্রাম্প ব্যবহার করেছেন।

যদি বাণিজ্য চুক্তির ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্কের বদলে নতুন ১৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর কার্যকর শুল্ক দাঁড়াবে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ (বিদ্যমান ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ এমএফএন শুল্কসহ)। অবশ্য পোশাকের ক্যাটাগরিভেদে এমএফএন শুল্কহার ভিন্ন হয় এবং ট্রাউজার, টি-শার্ট, শার্ট ও ডেনিমের মতো অনেক পণ্যে এই হার ১৬ দশমিক ৫ শতাংশের কম।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কব্যবস্থায় এই আকস্মিক পরিবর্তন রপ্তানিকারকদের হিসাবনিকাশ উল্টে দিতে পারে। তিনি বলেন, ‘ঘন ঘন শুল্ক পরিবর্তন ব্যবসার পরিকল্পনা কঠিন করে তোলে। রপ্তানিকারকরা ১৯ শতাংশ শুল্ক ধরে তাদের পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন।’

তবে তিনি এ–ও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের রায় বাংলাদেশের জন্য ‘ইতিবাচক’ হতে পারে। কারণ, শুল্ক কমলে পণ্যের দাম কমবে। এর ফলে বাজারে চাহিদা বাড়বে, যাতে করে রপ্তানিও বাড়তে পারে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‍্যাপিড)-এর চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. মো. আবদুর রাজ্জাক অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, এই রায়ের ফলে রপ্তানি বাড়লেও তা সাময়িক হতে পারে। নতুন শুল্কহার হয়তো সীমিত সময়ের জন্য বলবৎ থাকবে এবং এরপর আরও নতুন পদক্ষেপ আসতে পারে। তিনি বলেন, আদালতে বাতিল হওয়া শুল্ক এবং বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত চুক্তির আইনি ব্যাখ্যা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যেসব পণ্য (উড়োজাহাজ, গম, তুলা, সয়াবিন, এলএনজি, এলপিজি) আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা এখনো বাধ্যতামূলক কি না, তা স্পষ্ট নয়। প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ কি মার্কিন চাপ উপেক্ষা করে প্রতিশ্রুত পণ্য কেনা থেকে সরে আসতে পারবে?’

বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান স্বীকার করেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকার চুক্তি করতে দেরি করতে পারে—যুক্তরাষ্ট্রের এমন আশঙ্কা থেকে চাপের কারণেই অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছিল। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে এই চুক্তিও হয়তো বাতিল হবে। তিনি বলেন, ‘শুল্ক বাতিল হওয়া বাংলাদেশের জন্য সুখবর।’

চুক্তির আওতায় বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ বোয়িংয়ের ১৪টি উড়োজাহাজসহ বিপুল পরিমাণ মার্কিন পণ্য আমদানিতে সম্মত হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। বর্তমানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাংলাদেশের অনুকূলে রয়েছে। বছরে যুক্তরাষ্ট্রে আট বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়, বিপরীতে আমদানি হয় দুই বিলিয়ন ডলারের পণ্য। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানির ৮৬ শতাংশই তৈরি পোশাক।

বাণিজ্যসচিব বলেন, ‘ব্যবসায়িক সম্পর্ক রক্ষায় আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখব।’ তিনি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ ব্রেন্ডন লিঞ্চের বরাত দিয়ে বলেন, ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্পর্ক নির্ভর করবে অংশীদার দেশগুলোর বাণিজ্য চুক্তিতে সম্পৃক্ততার ওপর। নতুন শুল্কহার আরোপের পর ওয়াশিংটন নতুন নির্দেশনা জারি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ৯ ফেব্রুয়ারির চুক্তিটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, চুক্তিতে কিছু কঠিন শর্ত রয়েছে। নতুন শুল্কহার আরও কমানো যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনার পরামর্শ দেন তিনি।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান আরও কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাণিজ্য চুক্তিটি এখনো কার্যকর হয়নি এবং অনুসমর্থিতও হয়নি। চুক্তির কিছু ধারা উদ্বেগজনক হলেও বর্তমান শুল্কহার অন্তত ১৫০ দিনের জন্য স্বস্তি দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কারণে মার্কিন কংগ্রেস ভিন্ন অবস্থান নিতে পারে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীন বলেন, তারা প্রথমে চুক্তিটি বিশ্লেষণ করবেন এবং পরে সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে একটি ‘এক্সিট ক্লজ’ বা বেরিয়ে যাওয়ার ধারা রয়েছে, যা অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে নেই। তিনি বলেন, ‘সরকারি নীতি অনুযায়ী আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’ ওয়াশিংটনে চুক্তি স্বাক্ষরের সময় খাদিজা নাজনীন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২ এপ্রিল জাতীয় জরুরি অবস্থার আওতায় ট্রাম্প পারস্পরিক শুল্ক ঘোষণা করেছিলেন। শুরুতে বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব ছিল, যা পরে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ এবং আলোচনার পর ২০ শতাংশ ও শেষে চুক্তির মাধ্যমে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল।

Popular

More like this
Related

কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের তৎপরতা চলতে দেওয়া যাবে না: আইজিপি

কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কোনো তৎপরতা চলতে দেওয়া যাবে...

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আটক নীতি যেভাবে আপত্তিকর হয়ে উঠেছে

প্রথম আলোতে ২০২৫ সালের আগস্টে লিখেছিলাম, ২০২৪ সালের অক্টোবরে—অর্থাৎ...

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বালু উত্তোলনে বাধা দেওয়ায় গ্রামবাসীর ওপর গুলি, আহত ৪

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় নির্ধারিত সীমানার বাইরে মেঘনা নদী থেকে...

সংসদের প্রথম অধিবেশন ১২ মার্চ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আগামী ১২ মার্চ বসবে...