বাংলাদেশের বিভিন্ন ভাষা সংরক্ষণ কেন জরুরি

Date:

পৃথিবীতে প্রচলিত প্রায় সাত হাজার ভাষার মাঝে একটি বাংলা। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে প্রায় ২৫ কোটি মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। মাতৃভাষার ক্ষেত্রে সংখ্যার দিক থেকে বাংলা বিশ্বের সপ্তম সর্বাধিক ব্যবহৃত ভাষা। বাংলাদেশে বিভিন্ন জাতিসত্তা ও চা জনগোষ্ঠীর মানুষও (যাদের বেশিরভাগই স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয়ের অধিকারী) দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহার করে।

সরকারি তালিকায় ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে ৫০টি জাতিগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত। এর পাশাপাশি, সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড) আরও প্রায় ৫০টি ছোট বা স্বল্পপরিচিত জাতিগোষ্ঠীর তথ্য নথিভুক্ত করেছে। এসব তথ্য সেড তার প্রকাশিত দুটি গ্রন্থ—লোয়ার ডেপথস: লিটল-নোন এথনিক কমিউনিটিস অব বাংলাদেশ এবং স্লেভস ইন দিজ টাইমস: টি কমিউনিটিস অব বাংলাদেশ—এ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে।

এসব অবাঙালি গোষ্ঠীর মধ্যে ৪০টিরও বেশি ভাষা প্রচলিত আছে। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে ১০টি, চা বাগান এলাকায় প্রায় ডজনখানেক এবং দেশের উত্তর-পশ্চিম, উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-মধ্যাঞ্চলে বাকি ভাষা প্রচলিত রয়েছে।

আদিবাসী ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অনেক মাতৃভাষাই আজ বিলুপ্তির পথে। এসব ভাষার অনেকগুলোর কোনো বর্ণমালা নেই এবং লিখিত সংস্করণও তৈরি হয়নি। বর্তমানে এসব ভাষা মূলত গোষ্ঠীর বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখেই প্রচলিত; নতুন প্রজন্মের অধিকাংশই আর সেগুলো বলতে পারে না। এমন একটি উদাহরণ হলো কোচ জনগোষ্ঠীর ভাষা, যার কোনো লিখিত লিপি নেই।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা যে গভীর সংকটের মুখে রয়েছে তার স্পষ্ট উদাহরণ চা বাগান এলাকায় ‘জংলি’ নামে পরিচিত ভাষাটি। চা বাগানের লেবার লাইনে আবদ্ধ দাস-সদৃশ জীবনযাপনের কারণে ধীরে ধীরে তারা তাদের নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনেক কিছু হারিয়ে অনেকে এ মিশ্র ভাষায় কথা বলেন।

ক্ষুদ্র বেশ কিছু জাতিগোষ্ঠীর ভাষা অত্যন্ত সুন্দর ও বৈচিত্র্যময়। তেমনই একটি গোষ্ঠী বান্দরবান জেলার ‘চাক’, যাদের ‘সাক’ নামেও পরিচিতি রয়েছে। চার হাজারেরও কম জনসংখ্যার এই জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে, যার নাম চাক ভাষা। নাইক্ষ্যংছড়ি ও বান্দরবান সদর উপজেলায় অবস্থিত ২১টি দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে বসবাসকারী চাক জনগোষ্ঠী তাদের স্বতন্ত্র ভাষাগত পরিচয় আজও ধরে রেখেছে।

তাদের মনোমুগ্ধকর গান, নাচ ও সংগীতের শক্তি গভীরভাবে তাদের ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। চাক জনগোষ্ঠী দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাংলা বলতে পারলেও, দুর্গম গ্রামের অনেকের জন্য সাবলীলভাবে বাংলা বলাটা বেশ কঠিন। চিন্তা, অনুভূতি প্রকাশ ও শেখার ক্ষেত্রে চাক ভাষাই তাদের প্রধান ও সাবলীল ভাষা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে ছোট জাতিগোষ্ঠী লুসাই, যার জনসংখ্যা ৩৮০ জন। তাদেরও নিজস্ব ভাষা রয়েছে। ক্ষুদ্র জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে বাংলাদেশে বসবাসরত মিজো ভাষাভাষী লুসাই জনগোষ্ঠীর ভাষা মূলত পরিবার ও গ্রামভিত্তিক চর্চার মধ্যেই টিকে আছে। ভারতের মিজোরাম রাজ্যে এই ভাষা একটি শক্ত অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশে এই ভাষাভাষী মানুষের কম সংখ্যা, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব এবং শিক্ষা ও প্রশাসনে বাংলা ব্যবহারের চাপের কারণে বাংলাদেশে ভাষাটি তুলনামূলকভাবে বেশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

ভাষা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তিত ও বিকশিত হয়। প্রজন্ম ও সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে উচ্চারণ বদলে যায়, নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শব্দভাণ্ডার ও এর ব্যাকরণও পরিবর্তিত হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের সময়ে যে ইংরেজি ভাষা ব্যবহৃত হতো, তা আজকের ইংরেজি থেকে অনেক ভিন্ন। একইভাবে শতকের পর শতক ধরে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে বাংলা ভাষার উচ্চারণ ও বানান বর্তমান রূপে এসেছে। আজ আমরা যেভাবে কথা বলি ও লিখি, হাজার বছর আগে তা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। ঠিক তেমনি, আজকের বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রচলিত অন্যান্য ভাষাও শতকের পর শতক ধরে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত ও বিকশিত হয়েছে।

আরও বহু অতি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী রয়েছে, যেমন: কোল, কড়া, কাদর, খেড়োয়ার, ডালু, পাংখোয়া (বা পাংখো বা পাংখু), ভূঁইমালি, শবর এবং হো, যাদের প্রত্যেকটির জনসংখ্যা দুই হাজারেরও কম। এসব গোষ্ঠী তাদের ভাষা সংরক্ষণের জন্য কঠিন বাস্তবতার মুখে। ক্ষুদ্র ও বৃহৎ উভয় নৃগোষ্ঠীই তাদের মাতৃভাষা টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহারের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নানাবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে।

একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা হলো বিশ্বের অনেক ভাষা হয় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে, নয়তো ইতোমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ইউনেস্কোর হিসাব অনুসারে, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ ভাষা বিপন্ন হিসেবে বিবেচিত। ভাষাবিজ্ঞানীদের অনুমান, প্রায় প্রতি দুই সপ্তাহে একটি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক নথিপত্র থেকে জানা যায়, সময়ের প্রবাহে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

ঔপনিবেশিকতা এবং প্রভাবশালী ভাষার আরোপ—যেমন: ইংরেজি, স্প্যানিশ, ফরাসি ও পর্তুগিজ ভাষা—ভাষা-বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে; যা প্রায়শই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ধ্বংস এবং তাদের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দমনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। এর একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ হলো ১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আগমনের পরবর্তী দশকগুলোতে নেটিভ আমেরিকানদের উপরে ব্যাপকভাবে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো।

১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর ক্রিস্টোফার কলম্বাস ক্যারিবীয় অঞ্চলে পা রাখেন। আমরা এখন যাকে আমেরিকা বলে জানি, সেই সময় সেখানে আনুমানিক ১০ কোটি স্থানীয় মানুষ বা আদিবাসীর (নেটিভ আমেরিকান) বসবাস ছিল। এই জনসংখ্যা ছিল সেই সময়ের বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। পরবর্তী কয়েক দশকে গণহত্যা, রোগ, যুদ্ধ, দাসত্ব এবং বাধ্যতামূলক শ্রমের ফলে সেখানকার জনসংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে আসে। ইউরোপীয় উপনিবেশ বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য আদিবাসী গোষ্ঠী উচ্ছেদ বা ধ্বংস হয়ে যায় এবং খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে তাদের ভাষা হারিয়ে যায়।

বিভিন্ন নীতি ও চর্চার মাধ্যমে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং আদিবাসী জ্ঞানব্যবস্থার ক্ষয়প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। এর মধ্যে ছিল আদিবাসী ভাষা নিরুৎসাহিত করা বা নিষিদ্ধ করা; শিক্ষা, আদালত ও প্রশাসনে ঔপনিবেশিক বা প্রভাবশালী ভাষা চাপানো; প্রভাবশালী সংস্কৃতির সঙ্গে জোরপূর্বক আত্মীকরণে বাধ্য করা; অর্থনৈতিক চাপ; নগরায়ণ ও অভিবাসন ত্বরান্বিত করা এবং জনগোষ্ঠীগুলোকে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও সংঘাতের মুখে ঠেলে দেওয়া। বিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষায় জাতীয় ভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে সংখ্যালঘু ও আদিবাসী ভাষাগুলো আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ে এবং প্রায়শই বিলুপ্তির পথে ধাবিত হয়।

১৭৮৮ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অ্যাবরিজিনাল জাতিগুলোর ওপরে গণহত্যাসহ ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়। টেরা নালিয়াস নীতি অর্থাৎ ‘মালিকানাহীন ভূমি’ হিসেবে এই ভূখণ্ডকে জনবসতিশূন্য হিসেবে গণ্য করে আদিবাসীদের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করা হয়। কিন্তু বাস্তবে শত শত অ্যাবরিজিনাল জনগোষ্ঠী এবং পাপুয়া নিউ গিনি ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার ছোট ছোট দ্বীপের বাসিন্দারা তাদের নিজস্ব সুপ্রতিষ্ঠিত আইন, শাসনব্যবস্থা এবং ভূমি-রক্ষণাবেক্ষণের চর্চা বজায় রেখে আসছিল। টেরা নালিয়াস নীতির অজুহাতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে উপনিবেশবাদীদের কোনো চুক্তি সম্পাদিত হয়নি। প্রকৃতপক্ষে এই নীতির ফলে আদিবাসীদের ভূমির অধিকার উপেক্ষিত হয় এবং ঔপনিবেশিক বসতি স্থাপন বাধাহীনভাবে এগিয়ে যায়।

অস্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে সীমান্ত সংঘর্ষ, গণহত্যা, জোরপূর্বক উচ্ছেদ, মহামারি এবং ঔপনিবেশিক শোষণের সমন্বিত প্রভাবে জনসংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে আসে; আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আঘাতের শিকার হয় এবং শত শত ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যায়।

ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি শুধু তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের মাধ্যম নয়, বরং গল্প বলারও মাধ্যম। মানুষের ভাষার বিশেষত্ব তুলে ধরতে ইউভাল নোয়া হারারি’র বহুল আলোচিত বই ‘সেপিয়েন্স: এ ব্রিফ হিস্টরি অব হিউম্যানকাইন্ড’ থেকে একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরছি: ‘মানুষের ভাষার প্রকৃত বৈশিষ্ট্য শুধু মানুষ বা সিংহ সম্পর্কে তথ্য জানানো নয়, বরং “ভাষা” ব্যবহার করে এমন কিছু বিষয়েও কথা বলা যায়, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই। আমরা যতদূর জানি, শুধু মানুষই পারে এমন সব সত্তা নিয়ে কথা বলতে যা তারা কখনো চোখে দেখেনি, ছুঁয়ে দেখেনি বা গন্ধও পায়নি। কিংবদন্তি, পৌরাণিক কাহিনী, দেবতা ও ধর্মের ধারণা প্রথম শুরু হয় মানুষের বোধ বা চিন্তাশক্তির বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে…কল্পনা বা কাল্পনিক বিষয় নিয়ে কথা বলার এই ক্ষমতাই মানুষের ভাষাকে অনন্য করেছে।’

নিজ মাতৃভাষায় কথা বলার ক্ষমতাই বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীকে—ছোট হোক বা বড়—তার স্বতন্ত্র পরিচয় দেয়। ভাষার মাধ্যমে মানুষ এমন অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারে যেগুলোর বাস্তব বা ভৌত কোনো অস্তিত্ব নেই, যেমন: মিথ বা পৌরাণিক কাহিনী, কিংবদন্তি, ঈশ্বর, দেবতা, জাতি, অর্থ ও আইন। এই সক্ষমতা প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন, যারা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিবেশে বাস করে নিজেদের সমাজ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস, রীতি-নীতি ও মূল্যবোধ গড়ে তুলেছে। কোনো ভাষা যখন হুমকির মুখে পড়ে বা বিলুপ্ত হয়ে যায়, তখন সেই ভাষাভাষী মানুষেরা গোষ্ঠী বা জাতি হিসেবে তাদের পরিচয় নির্ধারণকারী সাংস্কৃতিক জ্ঞান ও মূল্যবোধ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।

বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর ভাষা তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় দেয় এবং তাদের জীবনকে বৈচিত্র্যময় করে তোলে। এই বৈচিত্র্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাদের আচার–অনুষ্ঠান, উৎসব, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, পোশাক ও সামাজিক আচরণের মাধ্যমে।

বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষা ও সংস্কৃতির চমকপ্রদ বৈচিত্র্য তুলে ধরেছেন সুইস–জার্মান নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক এল জি লফলার যিনি ম্রো ও খুমি জনগোষ্ঠী নিয়ে দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে গবেষণার জন্য সুপরিচিত।

‘পৃথিবীর কোথাও যদি এমন কোনো জায়গা থেকে থাকে যেখানে অল্প কয়েক বর্গমাইল এলাকার মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির একাধিক জাতিগোষ্ঠীকে একসঙ্গে দেখা যাবে, তবে তা নিঃসন্দেহে পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণের কিছু অঞ্চল। 
এখানে একই মৌজায় পাওয়া যাবে প্রায় চারটি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, যারা সম্পূর্ণ আলাদা ভাষায় কথা বলে, যাদের ঘরবাড়ি ভিন্ন ধরনের, পোশাক আলাদা এবং ভিন্ন রীতি–নীতি ও ধর্ম (বৌদ্ধ, হিন্দু, খ্রিস্টান ও প্রকৃতিপূজা) অনুসরণ করে।’ (এল জি লফলার, ম্রো—হিল পিপল অন দ্য বর্ডার অব বাংলাদেশ)

ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত ভাষাগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে এবং ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশে চা বাগানগুলোতে প্রায় এক ডজন ভাষা—সাঁওতালি, মুন্ডারি, মাহালে ও গারো ভাষা—প্রচলিত থাকলেও সেগুলোর প্রতি পর্যাপ্ত মনোযোগ নেই। কিছু ব্যক্তি ও গবেষক এসব ভাষার প্রতি কিছুটা মনোযোগ দিলেও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের (আইএমএলআই) মতো রাষ্ট্রীয় সংস্থার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে খুব সামান্যই বা কার্যত কোনো মনোযোগ দেওয়া হয়নি। এসব ভাষার অনেকগুলোর ক্ষেত্রেই পূর্ণাঙ্গ অভিধান, মৌলিক শব্দতালিকা কিংবা ব্যাকরণগ্রন্থের অস্তিত্ব নেই।

তবে বাংলাদেশে কিছু নৃগোষ্ঠীর ভাষা নিয়ে উচ্চমানের ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্তও আছে। এদের মধ্যে সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য দ্য ল্যাংগুয়েজ অব দ্য মধুপুর মান্দি (গারো): গ্রামার বইয়ের রচয়িতা রবিন্স বার্লিং, যিনি ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের একজন অধ্যাপক, তিনি তার জীবনের একটি বড় অংশ উৎসর্গ করেছেন মধুপুর ও ভারতের গারো জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজ নিয়ে গবেষণায়। গ্রন্থটিতে আমরা মান্দি (গারো) ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব এবং উপভাষাগত ভিন্নতার বিস্তারিত বিশ্লেষণ পাই। এটি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ভাষাবিদ—সকলের জন্য সমভাবে সহায়ক। পাশাপাশি এটি একটি শব্দতালিকা, পরিভাষা-সংকলন ও অভিধানসহ আরও কয়েকটি পরিপূরক গ্রন্থের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করা হয়েছে।

হিমেল রিচিলের ব্যবহারিক গারো অভিধান ৪৯৫ পাতার একটি অভিধান, যেখানে দৈনন্দিন গারো কথ্য ভাষায় ব্যবহৃত শব্দগুলোর সংকলন করেছে। বার্লিংয়ের শব্দতালিকা ও অভিধানের সঙ্গে একত্রে এটি গারো ভাষার সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য একটি দৃঢ় ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

সাঁওতালি ভাষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিধান ‘অ্যা সান্তাল ডিকশনারি’, যা সংকলন করেছেন নরওয়েজিয়ান মিশনারি, ভাষাতত্ত্ববিদ, লোকসংস্কৃতিবিদ এবং গবেষক পল ওলাফ বোডিং। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রকাশিত এ অভিধান সাঁওতালি-ইংরেজি’র একটি পরিপূর্ণ অভিধান, যা বর্তমান ভারতের ও বাংলাদেশের সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিস্তারিত গবেষণার ওপর ভিত্তি করে লেখা। বহু খণ্ডে বিভক্ত (প্রায় ৬ হাজার পৃষ্ঠা) এই অভিধান হাজারো শব্দ, প্রবাদ এবং সাংস্কৃতিক প্রকাশভঙ্গি সংরক্ষণ করেছে, যা এটিকে কেবল একটি ভাষাতাত্ত্বিক সম্পদই নয়, বরং সাঁওতালি সমাজ ও মৌখিক পরম্পরার একটি মূল্যবান দলিলে পরিণত করেছে। এটি আজও সাঁওতালি ভাষার গবেষক ও ভাষাভাষীদের জন্য একটি মানদণ্ডস্বরূপ রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত।

মুহাম্মদ জাকারিয়া রচিত ‘অ্যা গ্রামার অব হাইও’ গ্রন্থটি হাইও ভাষার একটি বিস্তারিত ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা। হাইও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী খিয়াংদের ভাষা। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী খিয়াং জনসংখ্যা ৪ হাজার ৮২৬ জন এবং তারা বান্দরবান ও রাঙামাটি জেলায় বসবাস করে। এই গবেষণায় ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব এবং মূল ব্যাকরণগত কাঠামোগুলো সংরক্ষিত হয়েছে। এটি তিব্বত-বার্মা ভাষা অধ্যয়নের এক একাডেমিক অবদান হিসেবে ভূমিকা পালন করে এবং একইসঙ্গে একটি স্বল্পবর্ণিত স্বদেশি ভাষার সংরক্ষণ ও দলিলীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।

মণিপুরি ভাষার গবেষক এ কে শেরাম তার মাতৃভাষা মণিপুরিকে নিয়ে প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। তার গ্রন্থ মণিপুরি ভাষার শব্দকোষ ৭৮ পৃষ্ঠার একটি ত্রিভাষিক (বাংলা–ইংরেজি–মণিপুরি) অভিধান, যেখানে মণিপুরি শব্দভাণ্ডারকে অর্থ, ব্যবহার ও ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাসহ সুসংগঠিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। শিক্ষার্থী ও গবেষক—উভয়ের ব্যবহারের জন্য রচিত এই গ্রন্থে মণিপুরি ভাষার ধ্বনিতত্ত্ব, লিপি ও ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্যের একটি প্রামাণিক পরিচয়ও উপস্থাপন করা হয়েছে; উচ্চারণ ও গঠন স্পষ্ট করার জন্য অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ধ্বনিতাত্ত্বিক বর্ণমালা (আইপিএ) ব্যবহার করা হয়েছে, যা বাংলা পাঠকদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক। সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশে মণিপুরি ভাষার সংরক্ষণ, অধ্যয়ন ও মানসম্পন্ন করার ক্ষেত্রে এই গ্রন্থটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য রচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অন্যান্য ভাষার ক্ষেত্রেও অনুরূপ গবেষণা পরিচালিত হলে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা ভাষাগুলোও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তা হবে এক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান (সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি) রচিত বাংলাদেশের নানান ভাষা গ্রন্থটি বাংলাদেশের ভাষাগত বৈচিত্র্যের একটি সামগ্রিক ও সুস্পষ্ট পরিচয় উপস্থাপন করে। এতে বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক উৎস, লিপি, ধ্বনি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি দেশের বহু আদিবাসী ও সংখ্যালঘু ভাষা আলোচিত হয়েছে। আরবি, উর্দু, ইংরেজি, খাসি প্রভৃতি ভাষা নিয়ে সংক্ষিপ্ত অধ্যায়ের মাধ্যমে গ্রন্থটি অভিবাসন, ধর্ম, শিক্ষা ও রাষ্ট্রনীতি কীভাবে বাংলাদেশের ভাষা ব্যবহারের ধরন গড়ে তুলেছে তার ব্যাখ্যা দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে, এটি বাংলাদেশকে একটি বহুভাষিক সমাজ হিসেবে তুলে ধরে এবং স্বল্পপরিচিত ভাষাগুলোর সাংস্কৃতিক মূল্য ও তাদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে।

বাংলাদেশে বাংলার বাইরে ব্যবহৃত ভাষাগুলো নিয়ে উপরে উল্লিখিত গবেষণাগুলো নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। তবে আরও বহু ভাষাতাত্ত্বিক ও নৃগোষ্ঠীগত গবেষণা রয়েছে, যেগুলোর প্রতি যথাযথ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন এবং এখনো অনেক গবেষণা হওয়া দরকার। এসব ভাষার ওপর পদ্ধতিগত ও সুসংহত গবেষণা যে এখনো অত্যন্ত সীমিত—এ নিয়ে বিশেষ সন্দেহের অবকাশ নেই। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং তাদের অস্তিত্ব সংরক্ষণের স্বার্থে একাডেমিক মহল ও শিক্ষার্থীদের যথাযথ দিকনির্দেশনা ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর একটি বিশেষ দায়িত্ব বর্তায়।

ফিলিপ গাইন: গবেষক এবং সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের (সেড) পরিচালক

Popular

More like this
Related

ভেনেজুয়েলা যত সহজ ছিল, ট্রাম্পের ইরান অভিযান তত সহজ হবে কি?

পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার চুক্তিতে ইরানকে রাজি করাতে দেশটিতে...

‘আজাদ’ ভাষ্যে ভাষা আন্দোলন

ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতিসত্তার জাগরণ কাল। পাকিস্তানি শোষণ ও...

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরও কি ট্রাম্প নতুন করে শুল্ক আরোপ করতে পারেন?

ট্রাম্প গত বছর ‘লিবারেশন ডে’ নামে একটি কর্মসূচির মাধ্যমে...

ঢালাও শুল্ক ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণা ট্রাম্পের

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি করা পণ্যের ওপর বিশ্বব্যাপী শুল্ক ১০...