এখনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি ভাষা সৈনিক আহমেদ সালেক

Date:

মাত্র ১৭ বছর বয়সে ভাষা আন্দোলনে যোগ দেন শিক্ষাবিদ আহমেদ সালেক। ২০০৯ সালে প্রয়াত হন তিনি। কিন্তু ভাষা সৈনিক হিসেবে আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি তার। 

উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পাকিস্তান শাসকদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যখন সারা দেশে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে, তখন বিভিন্ন পেশার মানুষ ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। অনুপ্রাণিত তরুণ সালেকও তার সহপাঠীদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন।

ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে ১৯৫২ সালের মার্চ মাসে সালেককে ময়মনসিংহ শহর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর পর তিনি দুই মাস কারাভোগ করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে প্রচারণা চালানোর সময় শেরপুর থেকেও গ্রেপ্তার হন। ওই সময় ময়মনসিংহ ও জামালপুর কারাগারে পাঁচ মাস আটক থাকেন তিনি।

১৯৩৫ সালের ১৭ মার্চ ময়মনসিংহ সদর উপজেলার দড়িভাবখালী গ্রামে মামা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন আহমেদ সালেক। তার বাবা ছিলেন মরহুম আব্দুল আজিজ এবং মা মরহুমা আজিজুন্নেসা। ১৯৫১ সালে শেরপুর ভিক্টোরিয়া স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫৩ সালে ময়মনসিংহের সরকারি আনন্দ মোহন কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। তৎকালীন ইকবাল হলের (পরবর্তীতে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) আবাসিক ছাত্র ছিলেন সালেক। 

কিন্তু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে কারাবাস এবং চরম দারিদ্র্যের ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। ১৯৫৫ সালে একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরে তিনি বিএ এবং বি.এড ডিগ্রি অর্জন করেন ও শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। ১৯৯৫ সালে মৃত্যুঞ্জয় স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি ময়মনসিংহ শহরের সিটি কলেজিয়েট স্কুলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন।

দ্য ডেইলি স্টারকে ৮৭ বছর বয়সী মুক্তিযোদ্ধা ও সমাজ-সংস্কৃতিকর্মী জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা নিষিদ্ধ করা হলে ময়মনসিংহ শহরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন সালেক। সেইসঙ্গে রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপনেরও উদ্যোগ নেন।

‘সালেক ছিলেন প্রগতিশীল চিন্তার একজন শিক্ষক, যিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পরও তিনি তার প্রতিবাদী ও প্রগতিশীল কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসেননি,’ বলেন জিয়াউদ্দিন আহমেদ । 

সালেক কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে সক্রিয় ছিলেন না। তবে তিনি ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা যেমন—কমরেড রবি নিয়োগী, জিতেন সেন, অমর ভট্টাচার্য, হাতেম আলী খান, তাহের উদ্দিন মল্লিক, আব্দুল আজিজ ভূঁইয়া, পরেশ দাস, নগেন সরকার, জ্যোতিষ বসু এবং দুর্গেশ চন্দ্র পত্রনবিশের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে জানান জিয়াউদ্দিন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ তাকে কালো তালিকাভুক্ত করে। তিনি পরিবারসহ আত্মগোপনে যান। তবে ময়মনসিংহ সিটি কলেজিয়েট স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প স্থাপনে তিনি সহায়তা করেন।

২১ ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত এবং প্রতিবছর নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালিত হয়। ভাষা শহীদদের স্মরণ করা হলেও জীবিত ভাষা সৈনিকদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ করেন সালেকের ছেলে আহমেদ শফিক।

তিনি বলেন, ‘এখনো ভাষা সৈনিকদের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন করা হয়নি।’

ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক ও উন্নয়ন আন্দোলনের সভাপতি ৮৬ বছর বয়সী অ্যাডভোকেট এএইচএম খালেকুজ্জামান বলেন, ‘ভাষা সৈনিকদের বিশেষ সম্মান দেওয়া উচিত। কিন্তু এ বিষয়ে এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’ 

‘ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকেই স্বাধীনতার সংগ্রামের সূচনা, আর এই আন্দোলনই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূতিকাগার,’ বলেন তিনি।

উদীচী ময়মনসিংহ জেলা সংসদের সভাপতি ডা. প্রদীপ চন্দ্র কর দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এখনো কয়েকজন ভাষা সৈনিক জীবিত আছেন। ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক ভূমিকার জন্য সকল ভাষা সৈনিক ও শহীদদের জাতীয় স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।’

দুঃখজনকভাবে ভাষা সৈনিক আহমেদ সালেককে চেনেন না নতুন প্রজন্মের অনেকেই। তার নামটিও হারিয়ে যাচ্ছে বিস্মৃতির অতলে।

Popular

More like this
Related

‘আজাদ’ ভাষ্যে ভাষা আন্দোলন

ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতিসত্তার জাগরণ কাল। পাকিস্তানি শোষণ ও...

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরও কি ট্রাম্প নতুন করে শুল্ক আরোপ করতে পারেন?

ট্রাম্প গত বছর ‘লিবারেশন ডে’ নামে একটি কর্মসূচির মাধ্যমে...

ঢালাও শুল্ক ১০ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার ঘোষণা ট্রাম্পের

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি করা পণ্যের ওপর বিশ্বব্যাপী শুল্ক ১০...

অমর একুশের দিনে এফডিএফের বারোয়ারি বিতর্ক প্রতিযোগিতা

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও শহীদ দিবস উপলক্ষে ফরিদপুরের স্কুল শিক্ষার্থীদের...