প্রবীণ সামরার সঙ্গেই কি হারিয়ে যাবে মৌলভীবাজারের সৌরা ভাষা?

Date:

নিজের মাতৃভাষা কি মানুষ ভুলে যেতে পারে? হারিয়ে ফেলতে পারে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়? কালের পরিক্রমায় এমনটাই ঘটতে যাচ্ছে বাংলাদেশের মৌলভীবাজারে। বিলুপ্তির শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে এখানকার স্থানীয় ‘সৌরা’ ভাষা। সৌরা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারা একমাত্র ব্যক্তিটি গত ছয় মাস ধরে অসুস্থ। তিনি চলে গেলে হয়তো চিরতরে হারিয়ে যাবে একটি ভাষা, একটি জাতির পরিচয়।

চার বছর আগে দ্য ডেইলি স্টার সৌরা ভাষা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ওই সময় সামরা সৌরার বয়স ছিল ৮৫ বছর, এখন তিনি ৯০-এর কোঠায়। 

গত সোমবার মৌলভীবাজারের সেই সৌরা পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, সামরা সৌরা এখন খুব অসুস্থ। একা হাঁটতে পারেন না, শ্বাস নিচ্ছেন খুব জোরে জোরে। দু-তিনটি কথা বললেই হাঁপিয়ে পড়ছেন।

প্রতিবেদক কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। ক্ষীণ কণ্ঠে শুধু বললেন, ‘আমি মারা গেলে ভাষাটাও মারা যাবে। দয়া করে আমার মরার আগে আমার মায়ের ভাষাটা বাঁচানোর উদ্যোগ নেন। এই ভাষায় আমার পরিচয়।’

সৌরা সমাজের সচেতন ব্যক্তি আলকুমার সৌরা (৫৬) বলেন, ‘সামরা সৌরা একমাত্র ব্যক্তি যে আমাদের ভাষাতেই শুধু কথা বলতে পারতো। চা বাগানের অন্য দু-একটি ভাষা বুঝতে পারলেও সে সবার সাথে সৌরা ভাষাতেই কথা বলতো। সৌরা ভাষাভাষির তরুণ ছেলেমেয়েরা উচ্চারণ শুনে হাসাহাসি করলেও কেউ কেউ তার কারণে বলার চেষ্টাও করতো।’

সামরা সৌরাকে এই ভাষার ‘ওয়ান-ম্যান আর্মি’ আখ্যা দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘তার সমবয়সী আমাদের সমাজে আর কেউ নেই। এমনকি তার মতো পুরোদমে কেউ বলতেও পারে না। ৭০ বছর বয়সের ওপরে সৌরা জাতিসত্ত্বার যারা বেঁচে আছেন, তারা কিছু শব্দ পারেন। কিন্তু সামরা সৌরার মতো কেউ বলতে পারেন না।’

তবে তিনি ক্ষোভের সাথে জানান, ‘গত ১৫-২০ বছরে অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে মানুষজন এসে শুধু সাক্ষাৎকার নিয়ে গেছেন, কিন্তু ভাষাটি রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি। আস্তে আস্তে আমাদের মায়ের মুখের ভাষাটা হারিয়ে যাচ্ছে।’

৭০ বছর বয়সী শ্রীধর সৌরা বলেন, ‘আমরা আমাদের মাতৃভাষা রক্ষার জন্য সরকারের কাছে বারবার দাবি জানিয়ে আসছি, কিন্তু কিছুই করা হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরিবারের মধ্যে এই ভাষায় কেউ কথা বলতে পারে না। ফলে আমিও সৌরা ভাষার অনেক শব্দ ভুলে গেছি।’

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট (আইএসএলআই) যে ১৪টি ভাষাকে বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সৌরা তার মধ্যে একটি। বর্তমানে বাংলাদেশে মাত্র ১২০টি পরিবার এই ভাষায় কথা বলে, তার মধ্যে আবার বেশিরভাগই বয়স্ক সদস্য। 

অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা সৌরা ভারতের উড়িষ্যা, অন্ধ্র প্রদেশ, তামিলনাড়ু এবং বিহারেও পাওয়া যায়। এ ভাষার লিখিত রূপ আছে। অন্ধ্রপ্রদেশে সৌরা প্রাথমিক নামে একটি পাঠ্যপুস্তকও রয়েছে।

৭২ বছর বয়সী উমিলা সৌরা বলেন, ‘আমাদের সম্প্রদায়ের বেশিরভাগই বাংলা, ওড়িয়া ও সাদরি ভাষাতেই কথা বলেন। চা-বাগানে সৌরার থেকে ওড়িয়া ও সাদরি সম্প্রদায়ই বড়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বাড়িতে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলি। আজকাল অনেকে এ ভাষাকে উড়িয়া বা জংলি ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন। তাই আমাদের বাংলা ভাষায় কথা বলতে হয়। সৌরা বললে মানুষজন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে।’

তরুণ প্রজন্মের সাহান সৌরা জানায়, স্কুলে বা বন্ধুদের মাঝে সৌরা ভাষায় কথা বললে অন্যরা হাসাহাসি করে এবং একে ‘অপভাষা’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। ফলে তারা লজ্জায় এই ভাষা বলতে চায় না।

সান্তনা সৌরা বলেন, ‘আমরা দাদুর কাছ থেকে কিছু শব্দ শুনেছি, কিন্তু ঠিকমতো বলতে পারি না। স্কুলে সবাই বাংলায় কথা বলে, তাই আমরাও বাংলাই বলি।’

তবে নিপা সৌরা এই ভাষায় আগ্রহী। তিনি বলেন, ‘দাদু যখন এই ভাষা বলেন, তখন আমরা সবকিছু বুঝতে পারি না। কেউ যদি আমাদের ব্যাখ্যা করেন, তাহলে আমরা আরও আগ্রহী হব।’

গবেষক পরিমল বাড়াইক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আইন (২০১০) বাস্তবায়নের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের দাবি জানান। তিনি সমস্ত জাতিগত ভাষার সংরক্ষণ এবং লিখিত রূপের বিকাশের উপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যদিও এনজিওগুলো ক্ষুদ্র জাতিগত গোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতির জন্য কাজ করে, ভাষা সংরক্ষণ প্রায়ই অবহেলিত হয়।’

আদিবাসী ভাষা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, ভাষা সম্পদ কেন্দ্রের (এলআরএইচ) প্রধান এবং ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা দশকের (আইডিআইএল) গ্লোবাল টাস্কফোর্স সদস্য সমর এম. সরেন বলেন, ‘বাংলাদেশে সৌরা ভাষা, যা সাভারা নামেও পরিচিত এবং সিলেট ও ​​মৌলভীবাজারের চা বাগানে প্রধানত সাভারা সম্প্রদায়ের লোকেরা এই ভাষা ব্যবহার করে, তা বিলুপ্তির পথে।’

তরুণ প্রজন্ম সৌরা ভাষা শিখছে না বা ব্যবহার করছে না। মূলত বাংলার মতো প্রভাবশালী ভাষার প্রভাব এবং সম্প্রদায়ের আকার ছোট হওয়ার কারণে ভাষাটি চর্চা করা হচ্ছে না।

ডিজিটাল স্পেস, গণমাধ্যম বা শিক্ষায় এই ভাষার তেমন কোনো উপস্থিতি নেই। খুব সীমিত সাক্ষরতার উপকরণ এবং লিপি রয়েছে এবং কোনো সরকারি স্বীকৃতি নেই। যদিও এই ভাষার নিজস্ব সোরাং সোম্পেং লিপি রয়েছে, বাংলাদেশে লেখার জন্য বাংলা বেশি ব্যবহৃত হয়। 

সৌরা ভাষার পাশাপাশি এই ভাষার লোককাহিনী, আচার-অনুষ্ঠান, গান, গল্প এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুশীলনের মতো মূল্যবান ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানও চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ডকুমেন্টেশন, পুনরুজ্জীবন কর্মসূচি, সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তায় না পেলে আগামী বছরগুলোতে সৌরা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক এ এফ এম জাকারিয়া বলেন, ‘পরিবার-ভিত্তিক অনুশীলনের মাধ্যমে একটি ভাষা টিকে থাকে। যখন এক প্রজন্ম অন্য প্রজন্মকে তা শেখায় না বা শেখাতে পারে না, তখন বিলুপ্তি অনিবার্য হয়ে ওঠে। কখনও কখনও ভাষাগুলো জোর করে নয়, বরং সামাজিক চাপ এবং হীনমন্যতার মাধ্যমে হারিয়ে যায়। এটি সাংস্কৃতিক সহিংসতার একটি নীরব রূপ।’

এই অধ্যাপক সামরা সৌরার মতো এই ভাষার শেষ বক্তাদের কাছ থেকে অডিও এবং ভিডিও ডকুমেন্টেশন সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

৬০ বছর বয়সী যামিনী সৌরা বলেন, ‘মাত্র দুজন প্রবীণ এই ভাষায় অনর্গল কথা বলতেন। একজন বহু বছর আগে মারা গেছেন। অন্যজন এখন কথা বলতেও কষ্ট পাচ্ছেন। মনে হচ্ছে যখন তিনি মারা যাবেন, তখন আমাদের ভাষাও তার সাথে মারা যাবে।’

 

 

 

Popular

More like this
Related

লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ১২

লেবাননের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের পৃথক হামলায় অন্তত ১২...

প্রকৃতি ও মানুষের মঙ্গল কামনায় বট-পাকুড়ের বিয়ে

উৎসবমুখর পরিবেশে বিশ্বাস ও লোকাচারের এক অনন্য মেলবন্ধনে ঠাকুরগাঁওয়ে...

একটি মহল প্রশাসনে থেকে গোপনে মবকে পৃষ্ঠপোষকতা করে: তথ্যমন্ত্রী

প্রশাসনের একটি মহল গোপনে মবকে পৃষ্ঠপোষকতা করে বলে মন্তব্য...

আদিবাসী ভাষা শিক্ষা শুধু কাগজে-কলমেই

সিলেট বিভাগে আদিবাসী শিশুদের জন্য মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক চালু হলেও...