ত্রয়োদশ সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যই নতুন মুখ

Date:

দেশের ইতিহাসে এই প্রথম সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতা—দুজনেই নতুন এমপি নির্বাচিত হয়েছেন এবার। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, আর ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

তারেক রহমান বা শফিকুর রহমান—দুজনের কেউই আগে সংসদ সদস্য ছিলেন না। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের মতোই নির্বাচিত এমপিদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি প্রথমবারের মতো সংসদে বসতে যাচ্ছেন।

নতুন সংসদে মোট আটটি দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এর মধ্যে পাঁচটি দলের শীর্ষ নেতারাই প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) নেতা নাহিদ ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলনের নেতা জোনায়েদ সাকি এবং গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক (নুর)।

সংসদীয় বিষয়াবলি–সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞ নিজাম আহমেদ বিষয়টিকে ‘নজিরবিহীন’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত প্রথম সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন না। তখন বিরোধী বেঞ্চে মাত্র সাতজন এমপি ছিলেন, যাদের ‘বিরোধী গ্রুপ’ হিসেবে অভিহিত করা হতো।

সংসদীয় রেকর্ড অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা পাঁচবার সংসদ নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সপ্তম সংসদে প্রথম এই দায়িত্ব নেন। এরপর নবম থেকে দ্বাদশ সংসদ পর্যন্ত টানা চার মেয়াদে এই পদে ছিলেন। তিনি ১৯৮৬ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। তিনি তিনবার সংসদ নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পঞ্চম সংসদে প্রথম এবং পরে ষষ্ঠ ও অষ্টম সংসদে সংসদ নেতা ছিলেন।

বিভিন্ন সময় অন্যান্য দলের নেতারাও সংসদ নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন। চতুর্থ সংসদে জাতীয় পার্টির কাজী জাফর আহমদ ও মওদুদ আহমদ পর্যায়ক্রমে এই দায়িত্ব পালন করেন। তৃতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির মিজানুর রহমান চৌধুরী, দ্বিতীয় সংসদে বিএনপির শাহ আজিজুর রহমান এবং প্রথম সংসদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ নেতা মনসুর আলী সংসদ নেতা ছিলেন।

জাতীয় পার্টির দুজন নেতা বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন—দ্বাদশ সংসদে জি এম কাদের এবং দশম ও একাদশ সংসদে রওশন এরশাদ।

খালেদা জিয়া নবম ও সপ্তম সংসদে এবং শেখ হাসিনা অষ্টম, পঞ্চম ও তৃতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন। জাসদ নেতা আ স ম আবদুর রব চতুর্থ সংসদে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রতিনিধি হিসেবে এবং দ্বিতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের একটি অংশের নেতা আসাদুজ্জামান খান বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন।

কেমন হলো ত্রয়োদশ সংসদ
নতুন সংসদের ২৯৭ জন সদস্যের মধ্যে অন্তত ২০৯ জনই (৭০ শতাংশ) প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন।

২০৯টি আসনে জয়ী বিএনপির ১৩২ জনই নতুন মুখ। অর্থাৎ দলটির সংসদীয় দলের ৬৩ শতাংশ সদস্য এবারই প্রথম সংসদে ঢুকবেন। বিএনপির তুলনায় জামায়াতে ইসলামীতে নতুন মুখের হার আরও বেশি। দলটির ৬৮ জন সাংসদের মধ্যে ৫৯ জনই (৮৬ শতাংশ) নতুন।

ছোট দলগুলোর এমপিদের পুরোটাই নতুন। এনসিপির ছয়জনই প্রথমবারের মতো নির্বাচিত। একইভাবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, গণঅধিকার পরিষদ এবং গণসংহতি আন্দোলনের ছয়জনের সবাই নতুন মুখ। সাতজন স্বতন্ত্র সাংসদের মধ্যে ছয়জনই প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল তারেক রহমানের প্রথম নির্বাচন। তিনি দুটি আসন—বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং দুটিতেই জয়ী হন।

ডা. শফিকুর রহমান ২০০১ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে মৌলভীবাজার-২ আসনে লড়ে পরাজিত হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে জামায়াতের নিবন্ধন না থাকায় তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ঢাকা-১৫ আসনে নির্বাচন করে হেরেছিলেন। এবার তিনি ওই আসন থেকেই জয়ী হয়েছেন।

২০১৮ সালে জোনায়েদ সাকি ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির মনোনয়নে নির্বাচন করে হেরেছিলেন। এবার তিনি বিএনপির সমর্থনে নিজের দলীয় প্রতীকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন।

গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক (নুর) বিএনপির সমর্থনে পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে প্রথমবারের মতো নির্বাচন করেই জয়ী হয়েছেন।

একইভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সম্মুখসারির নেতা নাহিদ ইসলাম প্রথমবারের মতো নির্বাচন করে ঢাকা-১১ আসন থেকে জয়ী হয়েছেন। এনসিপির আরও পাঁচজন নেতাও প্রথম ভোটেই জয়ী হয়েছেন। তারা সবাই জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের অংশ ছিলেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক নিজাম আহমেদ বলেন, নতুনরা শুরুতে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি মেনে চলতে কিছুটা সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। তিনি বলেন, তাদের ‘লার্নিং বাই ডুয়িং’ নীতি অনুসরণ করতে হবে। কারণ, একসঙ্গে সবকিছু শিখে ফেলা কঠিন।

তবে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্সের পরিচালক অধ্যাপক এস কে তৌফিক এম হকের আশা, নতুনরা দ্রুতই নিয়মকানুন শিখে নেবেন।

তিনি বলেন, ‘নতুনরা সংসদ কার্যকরভাবে চালাতে পারবেন না, এটা ঠিক নয়। অতীতের রেকর্ড বলে, পুরোনো এমপিরাই জাতীয় সংসদকে অকার্যকর করেছেন।’

তৌফিক এম হক আরও বলেন, ‘আমরা যদি ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দেখি, তখন অভিজ্ঞ রাজনীতিকেরাই দায়িত্বে ছিলেন—সেটা সরকার বা বিরোধী দল যেখানেই হোক। তারা সংসদকে কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অর্থাৎ উভয় দলের প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকেরা এই দায় এড়াতে পারেন না।’

অধ্যাপক তৌফিকের ভাষ্য, সংসদে নতুন সদস্য আসা পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল নেতৃত্বে পরিবর্তন।

নতুনরা যদি মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে পারেন, তবে সংসদে বিতর্ক ও সংলাপ হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে দাবি-দাওয়া নিয়ে রাজপথে নামতে হবে না বলে মনে করেন তিনি।

এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বাস করেন, প্রথমবারের মতো নির্বাচিত এমপিদের সংখ্যা বৃদ্ধি গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। তিনি বলেন, ‘মানুষ পুরোনো নেতৃত্বের পরিবর্তন চেয়েছিল। তারা নতুন মুখ চেয়েছিল।’

Popular

More like this
Related

জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পারমাণবিক আলোচনা শুরু

তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে ওমানের মধ্যস্ততায় সুইজারল্যান্ডের জেনেভাতে যুক্তরাষ্ট্র...

বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান, উপনেতা তাহের, চিফ হুইপ নাহিদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা মনোনীত হয়েছেন জামায়াতে...

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্বাচনকালীন বিরোধের জেরে যুবককে গুলি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় নির্বাচনকালীন স্থানীয় বিরোধের জেরে এক যুবক...

ওষুধ বাজারে অস্থিরতা: বাংলাদেশসহ বিকল্প উৎসে ঝুঁকছে আফগানিস্তান

ওষুধ শিল্পে পাকিস্তানের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমাতে উদ্যোগ নিয়েছে...