তারেক রহমানের হাত ধরে বিএনপির ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন

Date:

শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচনে বিএনপির অভাবনীয় সাফল্যের পর পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নির্বাচনে তার দল দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিশ্চিত করেছে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির এই বিপুল বিজয়কে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম সেরা ‘রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে দুই দশক পর কেবল বিএনপিই ক্ষমতায় ফিরল না, দলটির শীর্ষ নেতার দীর্ঘ নির্বাসন ও এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটল।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ঘোষিত ২৯৭টি আসনের ফলাফলে বিএনপি একাই ২০৯টি আসনে জয়ী হয়েছে। তাদের জোটের শরিকরা পেয়েছে আরও ৩টি আসন। অন্যদিকে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্ররা পেয়েছে ৭৭টি আসন। ছাত্র–জনতার নজিরবিহীন অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ১৮ মাস পর অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি দলকে এই বিশাল বিজয় এনে দিলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের এই উত্থান গত তিন দশক ধরে দেশের রাজনীতিতে চলে আসা দ্বিমেরুকরণের দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাকে ভেঙে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

দেশে জেল খাটা ও পরে যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ নির্বাসনে থাকা ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান গত ডিসেম্বরে ১৭ বছরের বেশি সময় পর দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার পর এই প্রথমবারের মতো তিনি দুটি আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয় নিশ্চিত করেন।

বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর ১০ দিন পর মায়ের কাছ থেকে দলের হাল ধরেন তারেক। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি দলকে সুসংগঠিত করতে বিরামহীন কাজ করেছেন। দেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন এবং নির্বাচনী সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চষে বেড়িয়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলা। হাজারো সমর্থক তার প্রচারণায় অংশ নেন। এখন পর্যন্ত তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে জোরালো প্রচারণা হিসেবে দেখা হচ্ছে একে।

তবে ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার এই পথ তারেক রহমানের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। নির্বাসনের দীর্ঘ ও কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের তোলা দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির নানা অভিযোগ মোকাবিলা করতে হয়েছে তাকে।

তারেক রহমানের বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সালে তারেক যখন কিশোর, তখন এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন জিয়াউর রহমান। এরপর থেকে খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্ব দেন এবং ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সরকার গঠন করেন।

শৈশব ও কৈশোর ঢাকায় কাটানো তারেক ১৯৮৮ সালে ২২ বছর বয়সে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হন। তবে দলীয় রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার আগে থেকেই তিনি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে মায়ের সঙ্গে রাজপথে ছিলেন তিনি। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সালের জুনে তাকে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব করা হয়। এর তিন বছর পর তিনি তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিনিধি সম্মেলন শুরু করেন এবং দেশের প্রতিটি উপজেলায় গিয়ে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন।

ওই সময়েই তারেক রহমানকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ‘হাওয়া ভবন’ কেন্দ্রিক ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্রবিন্দু তৈরির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। তবে তারেক বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

২০০৭ সালে সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তারেক রহমান। অভিযোগ রয়েছে, ১৮ মাস কারাগারে থাকাকালে তিনি নির্যাতনের শিকার হন। ওই সময়ের সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আদালতে হাজির করার সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়েছিলেন। ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট চিকিৎসার জন্য তিনি জামিন পান এবং ৩ সেপ্টেম্বর কারাগার থেকে মুক্তি পান।

এর এক সপ্তাহ পর স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান তিনি। সে সময় দেশে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলছিল। প্রবাসে থাকাকালেই তিনি দলের নীতি-কৌশল ঠিক করতেন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এর মাঝে ২০১৫ সালে ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুতে ব্যক্তিগত শোক সইতে হয় তাকে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দীর্ঘ প্রবাসজীবন তারেক রহমানকে রাজনীতিতে আরও সহনশীল ও ধীরস্থির করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা ও দণ্ড বাতিল হলে দেশে ফেরার আইনি বাধা কাটে। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরলে তাকে বিপুল সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সে সময় বিশাল জনসমাবেশে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার দেশের মানুষের জন্য, দেশের জন্য আমার একটি পরিকল্পনা আছে।’

দলকে শক্তিশালী করতে তিনি সারা দেশ সফর করেন এবং অন্তত ৬৪টি জনসভায় ধানের শীষের পক্ষে ভোট চান। প্রচারণায় তিনি কর্মসংস্থান, জনকল্যাণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো ও কৃষি উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন।
দলের বিশাল বিজয়ের পর তারেক রহমান গুলশানের বাসভবনের সামনে সমবেত জনতার উদ্দেশে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। জুমার নামাজে যাওয়ার আগে তিনি বলেন, ‘আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমার জন্য দোয়া করবেন।’

Popular

More like this
Related

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্বাচনকালীন বিরোধের জেরে যুবককে গুলি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় নির্বাচনকালীন স্থানীয় বিরোধের জেরে এক যুবক...

ওষুধ বাজারে অস্থিরতা: বাংলাদেশসহ বিকল্প উৎসে ঝুঁকছে আফগানিস্তান

ওষুধ শিল্পে পাকিস্তানের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমাতে উদ্যোগ নিয়েছে...

মন্ত্রিপরিষদে ডাক পাননি বিএনপির যে জ্যেষ্ঠ নেতারা

দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে ২৫ মন্ত্রী ও ২৪...

গণভোটের ফলাফল বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি...