ভারত-পাকিস্তান: এক দ্বৈরথের মরীচিকা

Date:

শেষ কবে আপনাকে ঠকানো হয়েছিল?

ঠকানো, প্রতারণার শিকার হওয়া প্রায় সর্বজনীন মানবিক অভিজ্ঞতা। শিশুদের চকচকে খেলনা কিনতে ফুঁসলানো হয়, যা প্রথমবার ব্যবহারেই ভেঙে যায়; প্রাপ্তবয়স্কদের নানা প্রলোভনে পিরামিড স্কিমে বিনিয়োগ করিয়ে সঞ্চয় উড়িয়ে নেওয়া হয়; আর বয়স্কদের অনলাইনে তথাকথিত সব রোগ সারানো ক্রিম কিনতে রাজি করানো হয়, যা শেষ পর্যন্ত তাদের ত্বকে অ্যালার্জি বা ফুসকুড়ি তৈরি করে।

সাধারণত মানুষ একবার প্রতারিত হওয়ার পর শিক্ষা নেয় এবং পরেরবার তা থেকে দূরে থাকে। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যারা যেন কখনোই শিক্ষা নেন না, একইভাবে বারবার প্রতারিত হন।

রোববার যারা আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘এ’-এর ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ দেখতে বসেছিলেন, এই আশা নিয়ে যে তারা একটি জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচ দেখবেন, যা এই লড়াইকে ঘিরে তৈরি হওয়া সমস্ত উত্তেজনার যথার্থ প্রতিফলন ঘটাবে, তারা ঠিক এই শ্রেণির মধ্যেই পড়েন।

আগ্রহ তৈরির দিক থেকে ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন যেন সোনালি যুগ পার করছে, তবে যেটা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, সেই জায়গায় নয়।

শুধু রবিবারের কলম্বোর ম্যাচের আগে কী ঘটেছে, সেটাই দেখুন। কয়েক সপ্তাহ ধরে পুরো ক্রিকেটবিশ্ব গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করেছে পাকিস্তানকে ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনায় রাজি করাতে বহুপাক্ষিক যোগাযোগের চেষ্টা। বাংলাদেশ নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোয় বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে স্কটল্যান্ড জায়গা নেওয়ার ঘটনায় সংহতি প্রকাশ করে পাকিস্তান এই বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন, গুজব ছড়িয়েছে, ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ না হলে তার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে, শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান তাদের অবস্থান থেকে সরে আসে, যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) ও সংশ্লিষ্ট সবার জন্য স্বস্তির কারণ হয়।

এই জটিলতা কাটার পর দৃষ্টি যায় আরেক বিতর্কে, হ্যান্ডশেক না করার বিষয়টি। গত বছর ভারত শুরু করেছিল এই প্রথা ভাঙা, যখন তাদের খেলোয়াড়রা ম্যাচ শেষে পাকিস্তান দলের সঙ্গে প্রচলিত করমর্দন করতে অস্বীকৃতি জানায়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নজিরবিহীন এক ‘নৈতিক অবস্থান প্রদর্শনের’ পদক্ষেপ।

রোববারের ম্যাচের আগে দুই অধিনায়ককেই এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কিন্তু কেউই স্পষ্ট উত্তর দেননি, ফলে কী ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে নাটকীয়তা আরও বেড়ে যায়।

ম্যাচের দিন টসের সময় অধিনায়কদের মধ্যে করমর্দন হয়নি, ম্যাচ শেষে দল দুটিও প্রচলিত শুভেচ্ছা বিনিময় করেনি, আর এর মাঝখানে ভারত পাকিস্তানকে সম্পূর্ণভাবে গুঁড়িয়ে দেয়।

ভারত ম্যাচটি জেতে ৬১ রানে, কিন্তু এই ব্যবধান ভারতের আধিপত্য পুরোপুরি বোঝায় না।

মন্থর ও টার্ন পাওয়া উইকেটে আগে ব্যাট করে ১৭৫/৭ রান তোলার পর পাকিস্তানের ইনিংসের প্রথম পাঁচ ওভারেই চার ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে দিয়ে ভারত কার্যত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

এরপর পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের নিয়ে যেন খেলতেই থাকে ভারত। এমনকি তিলক ভার্মা ও রিঙ্কু সিংয়ের মতো খণ্ডকালীন বোলারদের দিয়ে মোট তিন ওভার করানো হয়, যদিও ভারতের তিনজন মূল স্পিনারই তখনও বোলিং করার মতো ওভার বাকি রেখেছিলেন।

ম্যাচের আগে ক্রিকেটীয় দিক থেকে যে একমাত্র বিষয়টি কিছুটা আলোচনায় ছিল, তা হলো পাকিস্তানি স্পিনার উসমান তারিকের অদ্ভুত বোলিং অ্যাকশন। ম্যাচে অফস্পিনার হিসেবে তিনি মোটামুটি ভালোই করেন, ১ উইকেটে ২৪ রান দেন। তবে তিনিই ছিলেন পাকিস্তানের শেষ আউট হওয়া ব্যাটসম্যান; হার্দিক পান্ডিয়ার বলে শূন্য রানে বোল্ড হয়ে তিনি এক ধরনের তিক্ত হাসি দেন, যা পাকিস্তানের ওপর নেমে আসা অপমানেরই প্রতিফলন।

পুরো ঘটনার সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, এতে অবাক হওয়ার কিছুই ছিল না।

২০২২ সালের পর থেকে কোনো ফরম্যাটেই পাকিস্তান ভারতকে হারাতে পারেনি। টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের মোট জয় মাত্র তিনটি, হার ১৩টি। ভারত বর্তমান চ্যাম্পিয়ন এবং র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে, আর পাকিস্তান ২০০৯ সালের পর এই টুর্নামেন্ট জিততে পারেনি এবং এখন ছয়ে অবস্থান করছে।

প্রতিটি প্রতিদ্বন্দ্বিতারই উত্থান-পতন থাকে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে পাকিস্তানই ভারতকে বেশি হারাত, তাদের জয় শতাংশও ছিল অনেক বেশি।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের মুখোমুখি লড়াইগুলোতে সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো পাকিস্তানি খেলোয়াড়দের, বিশেষ করে ব্যাটসম্যানদের লড়াইয়ের অভাব। বড় ম্যাচের চাপ যেন তাদের গ্রাস করে ফেলে, আর ভারত সহজেই তাদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

তবুও বিশ্বের নানা প্রান্তের দর্শকরা রেকর্ড সংখ্যায় এই ম্যাচ দেখতে বসেন, মূলত নস্টালজিয়ার কারণে। তারা মনে করেন সেই সোনালি সময়ের কথা, যখন দুই দল প্রাণ উজাড় করে খেলত, ক্রিকেটাররা নিজেদের দেশের জন্য দাঁত-নখ বের করে লড়াই করত, আর ম্যাচ শেষে পারস্পরিক সৌহার্দ্যের পরিবেশ তৈরি হতো।

কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ব্যবধান যত বাড়ছে, ততই সেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচগুলো ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। তবুও নস্টালজিয়ায় ভোগা দর্শকরা প্রতি বারই এই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের লড়াই দেখতে বসবেন এবং শেষে মনে হবে, যেন আবারও তারা প্রতারিত হলেন।

Popular

More like this
Related

প্রগতি বর্মণের ইশতেহারে গুরুত্ব পেয়েছে নারীর অধিকার ও কৃষি সংস্কার

নির্বাচনী মাঠজুড়ে যখন বড় দলগুলোর ব্যানার-ফেস্টুন, মাইকিং আর বিশাল...

মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে আহত শিশু হুজাইফা মারা গেছে

মিয়ানমার সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত বাংলাদেশি...

কারাবন্দি সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন মারা গেছেন

দিনাজপুর জেলা কারাগারে অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের...

গণমাধ্যমের কাছে সরকার দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা প্রত্যাশা করে: প্রেস সচিব

ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে...