রংপুরে জমজমাট ‘ফাটা কোম্পানি’ কাপড়ের ব্যবসা

Date:

টানা শৈত্যপ্রবাহ আর হাড়কাঁপানো শীতে রংপুর অঞ্চলে জমজমাট হয়ে উঠেছে ‘ফাটা কোম্পানি’র কাপড়ের ব্যবসা। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এই নামে মূলত কম দামের বা পুরোনো শীতবস্ত্র বিক্রি হয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে বিক্রি দ্বিগুণ ছাড়িয়ে গেছে।

সাধারণত শীত মৌসুমে রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, ফুটপাত বা জনসমাগমপূর্ণ স্থানে অস্থায়ীভাবে এসব দোকান বসে। পোশাক কারখানায় বাতিল হওয়া বা ব্যবহৃত শীতবস্ত্র এখানে বিক্রি হয়। শীতের তীব্রতা বাড়ায় নিম্নবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্তেরাও এখন ভিড় করছেন এসব দোকানে।

রংপুর নগরের আলমনগর ও স্টেশন এলাকা এই ব্যবসার মূল কেন্দ্র। এখান থেকে পাইকারি দরে কাপড় কিনে নিয়ে যান দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও নীলফামারীর খুচরা ব্যবসায়ীরা।

দোকানিরা জানান, এসব দোকানে ২০ থেকে ৮০ টাকায় কানটুপি ও মাফলার, ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় সোয়েটার, জ্যাকেট ও চাদর এবং ৩০০ থেকে ৬০০ টাকায় কম্বল পাওয়া যায়। নতুন পোশাকের দোকান বা বিপণিবিতানে এসব পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় স্বল্প আয়ের ক্রেতারা এদিকেই ঝুঁকছেন।

৩০ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রংপুরের স্টেশন এলাকার মনসুর আলী ব্যাপারী (৬৫)। তিনি বলেন, ‘গত মৌসুমে ১৫ লাখ টাকার কাপড় বিক্রি করেছিলাম। আর এবার ৪ জানুয়ারি পর্যন্তই বিক্রি হয়েছে ২৪ লাখ টাকার বেশি। আশা করছি, মৌসুম শেষে বিক্রি ৩০-৩৫ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে।’

আলমনগর এলাকার ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিন (৫৫) জানান, নভেম্বরে তোলা ৯ লাখ টাকার শীতবস্ত্র ডিসেম্বরের ২০ তারিখের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। পরে আনা আরও ১৫ লাখ টাকার অর্ধেকও গত ১৫ দিনে বিক্রি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এবার পুরোনো কাপড়ের চাহিদা অস্বাভাবিক রকম বেশি।’

শুধু রংপুর নয়, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামেও একই চিত্র। লালমনিরহাট শহরের ব্যবসায়ী সোহেল রানা (৪৫) জানান, গত মৌসুমে পুরো সময়ে যেখানে দুই লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছিল, এবার মাত্র দুই সপ্তাহেই বিক্রি হয়েছে আড়াই লাখ টাকার বেশি। কুড়িগ্রামের কলেজ রোডের ব্যবসায়ী আজিজার রহমান (৫০) প্রতিদিন গড়ে চার শতাধিক শীতবস্ত্র বিক্রি করছেন বলে জানান।

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র পাড়ের কৃষক মকবুল হোসেন (৬০) জানান, তিনি ‘ফাটা কোম্পানি’র দোকান থেকে ৭ হাজার ২০০ টাকায় পরিবারের ১২ সদস্যের জন্য আটটি সোয়েটার, দশটি জ্যাকেট, চারটি করে মাফলার ও কম্বল এবং ছয়টি টুপি কিনেছেন। নতুন কিনতে গেলে এসব পণ্যের দাম ৪০ হাজার টাকা লাগত।

লালমনিরহাটের তিস্তাপাড়ের দিনমজুর আক্তার আলী (৫৫) বলেন, ‘মার্কেট থেকে নতুন কাপড় কেনার সাধ্য নেই। তাই ফাটা কোম্পানিই ভরসা। এসব দোকান গরিবের জন্য আশীর্বাদ।’

তবে পুরোনো কাপড়ের রমরমা ব্যবসায় কিছুটা বিপাকে পড়েছেন নতুন পোশাকের ব্যবসায়ীরা। রংপুরের পোশাক ব্যবসায়ী রিশন ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দোকানে এক হাজার টাকার নিচে কোনো শীতবস্ত্র নেই। দামের পার্থক্যের কারণে অনেকেই ফুটপাতের দিকে ঝুঁকছেন।’

রংপুর শহরের পাইকারি ব্যবসায়ী আতোয়ার রহমান (৫০) জানান, আগে রংপুর বিভাগের প্রতিটি জেলায় ৬০-৭০টি দোকান বসত। এবার তা বেড়ে ১০০-১২০টি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘গত মৌসুমে বিভাগে ৮-১০ কোটি টাকার লেনদেন হলেও এবার তা ১৮-২০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।’

কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল মতিন বলেন, ‘সরকারি কম্বল চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। তাই মানুষ বাধ্য হয়ে বাজার থেকে শীতবস্ত্র কিনছেন। তবে আমরা মন্ত্রণালয়কে চাহিদামাফিক বরাদ্দের জন্য চিঠি দিয়েছি।’

Popular

More like this
Related

জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তির অধ্যাদেশ অনুমোদন

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সংগঠিত রাজনৈতিক...

ভোটের মাঠে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই: ইসিকে জামায়াত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ভোটের মাঠে নির্বাচনী...

মার্কিন অভিবাসী ভিসা ইস্যুতে কৌশল ঠিক করবে সরকার: তথ্য উপদেষ্টা

বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া...

চট্টগ্রামে খাল থেকে শিশুর মরদেহ উদ্ধার

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় একটি খাল থেকে এক শিশুর মরদেহ...