জলাভূমি: জীববৈচিত্র্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তি

Date:

পানি ও ভূমির সংযোগস্থলে গড়ে ওঠা পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ ও উৎপাদনশীল বাস্তুতন্ত্র জলাভূমি—যা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, খাদ্য উৎপাদন, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা এবং জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কৃষি ও মানুষ টিকিয়ে রাখতে এক অনিবার্য প্রাকৃতিক ভিত্তি হচ্ছে জলাভূমি। অথচ গত ৩০০ বছরে বিশ্বজুড়ে ৮৫ শতাংশের বেশি জলাভূমি হারিয়ে গেছে এবং অবশিষ্ট জলাভূমিগুলো বনভূমির তুলনায় প্রায় তিনগুণ দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে।

জলাভূমি সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারের লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ইরানে রামসার কনভেনশন সই হয়, যা ১৯৭৫ সালে কার্যকর হয়।

বাংলাদেশ ১৯৯২ সালে এই কনভেনশনে যুক্ত হয়। রামসার কনভেনশন অনুযায়ী, স্বাদু, লবণাক্ত বা মিশ্র পানির স্থায়ী ও অস্থায়ী জলাশয়—সবই জলাভূমির অন্তর্ভুক্ত।

রামসার কনভেনশনই একমাত্র আন্তর্জাতিক পরিবেশ চুক্তি, যা একটি নির্দিষ্ট বাস্তুতন্ত্র ‘জলাভূমি’ সংরক্ষণের জন্য করা হয়েছে। এই বৈশ্বিক স্বীকৃতি থেকেই জলাভূমির পরিবেশগত গুরুত্ব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম উপকূলীয় জলাভূমি অঞ্চলের দেশ বাংলাদেশ। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ৪১৪টি হাওর, জলাশয় ও জলাভূমি রয়েছে, যার মোট আয়তন প্রায় ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬০ হেক্টর।

বাংলাদেশে সুন্দরবন ও টাঙ্গুয়ার হাওর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রামসার সাইট। এসব জলাভূমি শুধু মাছের আবাসস্থল নয়; জলজ উদ্ভিদ, ফল ও খাদ্যশস্য উৎপাদনের মাধ্যমে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল, চুনারি, বন বা জলানির্ভর দরিদ্র পরিবার, কৃষক, নৌকা-শ্রমিকসহ প্রকৃতিনির্ভর জীবিকার ওপর নির্ভরশীল বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।

একইসঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতেও জলাভূমি অপরিহার্য।

বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা জলাভূমির পানির ওপর নির্ভরশীল। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত জোগানের জন্য ধান উৎপাদনে জলাভূমির ভূমিকা অনস্বীকার্য।

সিলেট, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা অঞ্চলের হাওর এলাকায় উৎপাদিত বোরো ধান জাতীয় খাদ্য স্বনির্ভরতায় বড় অবদান রাখছে। পাশাপাশি হাওরাঞ্চলে সূর্যমুখীর মতো ফসল চাষ ভোজ্যতেল উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি করছে, যা খাদ্য বৈচিত্র্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বরিশালের জলাভূমিগুলোতে লবণাক্ততা আকস্মিক বন্যার বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে অনন্য অভিযোজন পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছে ‘ভাসমান কৃষি’।

কিন্তু অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের মতোই অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন, কৃষি রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অস্থিতিশীল কৃষি পদ্ধতি, অতিরিক্ত মাছ ধরা, পলি জমে যাওয়া, দূষণ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন ও নগরায়নের ফলে দেশের জলাভূমি বাস্তুতন্ত্র ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে।

বিশেষ করে শহরাঞ্চলে জলাভূমি ভরাটের হার সবচেয়ে বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতি উচ্চমাত্রায় সংবেদনশীল ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা এমনিতেই ঝুঁকির মুখে। জলাভূমি রক্ষা ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবিকায় এর প্রভাব আরও গভীর হবে।

এখন পর্যন্ত পরিবেশ অধিদপ্তর দেশের ১২টি এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে, যার অধিকাংশই জলাভূমি। এর মধ্যে রয়েছে সুন্দরবন, টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, মারজাত বাঁওড়।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী, এসব এলাকায় ক্ষতিকর কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন সীমিত। হাওড়াঞ্চল—যা একসময় জীববৈচিত্র্যের ভান্ডার ও লাখো মানুষের জীবিকার ভিত্তি ছিল—এখন দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার, হাওরের বুক চিরে রাস্তা ও স্থাপনা নির্মাণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই অঞ্চলের কৃষি ও অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বর্ষায় উজান থেকে নেমে আসা পলি ও বালিতে নদী, খাল ও কৃষিজমি ভরাট হচ্ছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী আমন ও আউশসহ নানা ফসলের চাষ কমে গেছে।

চায়না দুয়ারি জালের মতো বিধ্বংসী জালের ব্যবহারে মাছের বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, কমে যাচ্ছে মৎস্যসম্পদ।

রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওর আন্তর্জাতিকভাবে সংরক্ষিত জলাভূমি হলেও তা আজ অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

একদিকে রয়েছে এসব বিপর্যয়, অন্যদিকে দেশের সাতটি হাওর অঞ্চলে বসবাসকারী দুই কোটিরও বেশি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮ক অনুচ্ছেদে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব স্বীকৃত। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ দেশের সব জলাভূমিকে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ঘোষণা করেছে এবং জলাভূমি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর নির্দেশনা দিয়েছে।

এসব উদ্যোগ খাদ্য অধিকার ও পরিবেশগত ন্যায়ের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ হলেও কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো চ্যালেঞ্জ।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন পানির চাহিদা বাড়ছে এবং বন্যা ও খরার ঝুঁকি প্রতিদিন তীব্রতর হচ্ছে, তখন টেকসই উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জলাভূমির ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ বছর বিশ্ব জলাভূমি দিবসের প্রতিপাদ্য হলো ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত জলাভূমি ও প্রথাগত জ্ঞান’। এই প্রতিপাদ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জলাভূমি কেবল একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা জ্ঞান, জীবিকা ও খাদ্য ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এই প্রেক্ষাপটে জলাভূমি সংরক্ষণ ও এর সুপরিকল্পিত ব্যবহার নীতিগতভাবে অগ্রাধিকার পাওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি। খাদ্য নিরাপত্তা, বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং জলবায়ু অভিযোজন নিশ্চিত করতে কৃষি ও জলাভূমির মধ্যে টেকসই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। স্থানীয় বাস্তবতা ও প্রথাগত জ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়ে কৃষি, জলাভূমি ও জীবিকার মধ্যে টেকসই সহাবস্থানের কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

খাদ্য অধিকার নিশ্চিতকরণের দৃষ্টিকোণ থেকে জলাভূমি শুধু উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়; এটি জলাভূমিনির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবিকা, পুষ্টি ও সামাজিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

তাই জলাভূমি সংরক্ষণ মানে কেবল পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং এটি মানুষের খাদ্য অধিকার রক্ষা এবং জলাভূমির আশপাশে বসবাসকারী জেলে, কৃষক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা সুরক্ষার প্রশ্নও।

জলাভূমি সংরক্ষণকে খাদ্য অধিকার কাঠামোর অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সমন্বিত নীতি, শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে জলাভূমি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য খাদ্য, জীবিকা ও পরিবেশগত নিরাপত্তার একটি টেকসই ভিত্তি হিসেবে টিকে থাকবে।

উম্মে সালমা, অ্যাডভোকেসি ও ক্যাম্পেইন ব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক–খানি

[email protected]

Popular

More like this
Related

যে কারণে পুরস্কার নিতে যাচ্ছেন না শান্তিতে নোবেলজয়ী মাচাদো

বেশ কিছুদিন ধরেই এ বছরের শান্তিতে নোবেলজয়ী ভেনেজুয়েলার বিরোধী...

বিপিএলে ব্যাংক গ্যারান্টির সময়সীমা বাড়ল ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) দলগুলোর ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দেওয়ার...

আগেও দুবার হত্যাচেষ্টা, গুরু-শিষ্যের দ্বন্দ্বে সারোয়ারের শেষ পরিণতি

চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে একসময় গুরুর নির্দেশে চলতেন সারোয়ার হোসেন বাবলা।...

প্যারিসে এক্সের অফিসে তল্লাশি, ইলন মাস্ককে আদালতে হাজিরের নির্দেশ

ফ্রান্সের প্যারিসে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ও প্রযুক্তিবিদ ইলন...