ইরানে চলমান বিক্ষোভ এখন বিশ্ব গণমাধ্যমের খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে। দেশটিতে সহিংসতা উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী পক্ষ একে অপরকে দায়ী করছে। সরকার দাবি করছে, এই বিক্ষোভের পেছনে বিদেশি হস্তক্ষেপ রয়েছে।
এটি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে হওয়া সর্বশেষ বড় কোনো আন্দোলন। ওই বিপ্লবে শাহকে উৎখাত করে দেশটিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
গত পাঁচ দশকে ইরান ভূমিকম্প, দীর্ঘ যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা, আঞ্চলিক হস্তক্ষেপ এবং টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মতো একের পর এক বড় সংকটের ভেতর দিয়ে গিয়েছে।
নিচে গত পাঁচ দশকে ইরানের উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনার সংক্ষিপ্ত কালানুক্রম তুলে ধরা হলো।
ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ১৪ বছর ইরাক ও ফ্রান্সে নির্বাসনে থাকার পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ইরানে প্রত্যাবর্তন করেন। পরে এপ্রিলে গণভোটের মাধ্যমে ইরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়।
নভেম্বরে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে মার্কিন নাগরিকদের জিম্মি করার ঘটনার জেরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর প্রথম দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
পাশাপাশি ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় সংঘটিত এক অভ্যুত্থানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে অপসারণেও তাদের ভূমিকা ছিল।
ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ইরাক ইরানে হামলা চালায়। শুরু হয় দীর্ঘ আট বছরের যুদ্ধ।
ওই যুদ্ধে আনুমানিক পাঁচ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। নিহতদের বেশিরভাগই ইরানের নাগরিক।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো এই যুদ্ধেও ছিল বিস্তৃত পরিখা, মেশিনগান ও বেয়নেটের ব্যাপক ব্যবহার। পাশাপাশি ইরাক ইরানি সেনা ও ইরাকের কুর্দিদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্রও ব্যবহার করে।
জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাকি সব জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হয়, এর মধ্য দিয়ে ইরান জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে। এরপর জুনে তেহরানে ইসলামিক রিপাবলিকান পার্টির সদরদপ্তরে ভয়াবহ বোমা হামলায় বিচার বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ বেহেশতিসহ এক ডজনেরও বেশি শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। খোমেনির পর তাকে ইরানের দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
আগস্টে তেহরানে এক বৈঠকে বোমা হামলায় প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ-আলি রাজাই ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ জাওয়াদ বাহোনার নিহত হন। কর্তৃপক্ষ এই হামলার দায় দেয় বামপন্থী বিপ্লবী বিরোধী গোষ্ঠী মুজাহিদিন-ই খালকের (এমইকে) ওপর। এই গোষ্ঠীর ওপর আগের বছর দমন অভিযান চালানো হয়েছিল।
জুনে ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালায়। ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবে অনুপ্রাণিত হয়ে লেবাননের ধর্মীয় নেতারা প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু করেন। একটি ‘মতবাদ’ বা প্রতিরোধ আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও পরবর্তীতে এটি ‘হিজবুল্লাহ’ নামের একটি রাজনৈটিক দল ও সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
পশ্চিমাদের দাবি, শুরু থেকেই তেহরান হিজবুল্লাহকে অর্থ ও অন্যান্য সমর্থন দিতে শুরু করে।
জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর গাইডেড মিসাইল ক্রুজার ইউএসএস ভিনসেনস পারস্য উপসাগরের আকাশে ইরান এয়ারের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ভূপাতিত করে। এতে উড়োজাহাজে থাকা ২৯০ জন যাত্রীর সবাই নিহত হন।
আগস্টে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া আলোচনার পর ইরান ও ইরাকের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এতে দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান ঘটে।
৩ জুন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যু হয়। পরদিন বিশেষজ্ঞ পরিষদ (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস) তার উত্তরসূরি হিসেবে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে নির্বাচন করে।
জুনে ইরানে ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ নিহত হন।
মার্চ ও মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর তেল ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ ছিল, ইরান ‘সন্ত্রাসবাদে’ মদদ দিচ্ছে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি চেষ্টা করছে।
সেপ্টেম্বরে তালেবান স্বীকার করে যে আগের মাসে আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় শহর মাজার-ই-শরিফ দখলের সময় আটজন ইরানি কূটনীতিক ও একজন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান আফগানিস্তানের সঙ্গে যৌথ সীমান্তে হাজারো সেনা মোতায়েন করে।
জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ উত্তর কোরিয়া ও ইরাকের সঙ্গে ইরানকে ‘অ্যাক্সিস অব ইভিল’-এর অংশ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, এসব দেশ ‘সন্ত্রাসবাদে’ সমর্থন দিচ্ছে।
মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা চালায়। এরপর ইরান ইরাকের ভেতরে শিয়া মিলিশিয়া ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও সমর্থন দিতে শুরু করে। এসব গোষ্ঠীর ওপর ইরানের প্রভাব এখনো বিদ্যমান।
নভেম্বরে ইরান ঘোষণা দেয়, তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত করবে এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে জাতিসংঘের আরও ব্যাপক পরিদর্শনের অনুমতি দেবে।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানায়, পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির কোনো প্রমাণ তারা পায়নি। এর আগে ইরান অনেকবারই পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের অনুমতি দেয়নি। সেই অবস্থান থেকে এটি ছিল একটি বড় পরিবর্তন।
ডিসেম্বরে দক্ষিণ ইরানের বাম শহরে ভয়াবহ ভূমিকম্পে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হন।
ডিসেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (ইউএনএসসি) ইরানের সংবেদনশীল পারমাণবিক উপকরণ ও প্রযুক্তি বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
জার্মানি ও নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র—কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রণোদনার বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিতের যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তাতে ইরান সম্মত না হওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরও কঠোর ও বিস্তৃত অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
জুনে পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের বিরুদ্ধে চতুর্থ দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর মধ্যে ছিল অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণ এবং কঠোর আর্থিক বিধিনিষেধ।
সেপ্টেম্বরে ইরান অভিযোগ করে, তাদের পারমাণবিক স্থাপনার কম্পিউটার সিস্টেমে ম্যালওয়্যার ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তেহরানের দাবি ছিল, এর পেছনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র জড়িত।
মার্চে আরব বসন্তের ধারাবাহিকতায় সিরিয়ায় শুরু হওয়া গণ-অভ্যুত্থান প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকার কঠোরভাবে দমন করে। আসাদ ছিলেন ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। বছরের শেষ দিকে ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী (আইআরজিসি) ইরানি ও বিদেশি মিলিশিয়াদের সিরিয়ায় পাঠিয়ে আসাদ সরকারকে সমর্থন দেয়।
জানুয়ারিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানি তেল রপ্তানি বয়কট শুরু করে।
সেপ্টেম্বরে আইএইএ জানায়, ইরানের পারচিন সামরিক স্থাপনায় পরিদর্শনে তাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। তখন ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের আরও কাছাকাছি চলে যাচ্ছে বলে উদ্বেগ বেড়ে যায়।
অক্টোবরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরানি মুদ্রা রিয়াল মার্কিন ডলারের বিপরীতে রেকর্ড পরিমাণে দরপতনের মুখে পড়ে। ২০১১ সালের পর থেকে রিয়ালের মূল্য প্রায় ৮০ শতাংশ কমে যায়।
জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ইরান একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছায়।
যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) বা ‘পারমাণবিক চুক্তি’র আওতায় ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে সম্ত হয়, বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়।
এই চুক্তি ইরানে ব্যাপক আশার সঞ্চার করে; বহু মানুষ দেশটির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক একঘরে অবস্থার অবসান প্রত্যাশা করেন।
মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন বারাক ওবামার উত্তরসূরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার যুক্তি ছিল, জেসিপিওএ ইরানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছে এবং এর বদলে একটি ‘আরও ভালো চুক্তি’ হওয়া উচিত।
জানুয়ারিতে ইরাকের বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানি নিহত হন। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ভয়াবহভাবে বাড়িয়ে তোলে।
এপ্রিলে সিরিয়ার দামেস্কে ইরানের দূতাবাস ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়। এতে দুইজন আইআরজিসি জেনারেলসহ সাতজন নিহত হন।
মে মাসে ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি দেশটির পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশে একটি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হন।
জুলাইয়ে হামাসের প্রধান ইসমাইল হানিয়া তেহরানে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইসরায়েলের হাত ছিল বলে মনে করা হতো।
জুনে ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়, যার ফলে দুই দেশের মধ্যে ১২ দিনব্যাপী যুদ্ধ শুরু হয়।
এই সংঘাতে অন্তত ৬১০ জন ইরানি ও ২৮ জন ইসরায়েলি নিহত হন।