ফুটবলকে বলা হয় ‘দ্য বিউটিফুল গেম’। কিন্তু ২০০৬ সালের ওই রাতে জার্মানির নুরেমবার্গের ফ্রাঙ্কেন স্টাডিয়নে (বর্তমানে ম্যাক্স-মরলক স্টাডিয়ন) যা ঘটেছিল, তাকে আর যা-ই হোক, সুন্দর বলা চলে না। সেটি ছিল পেশিশক্তির আস্ফালন, জেদ আর আক্রোশের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। মাঠের ভেতর তখন রীতিমতো যুদ্ধ চলছে, যেখানে একপক্ষ অন্যপক্ষকে দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়ার নেশায় মত্ত। একে অপরকে ল্যাং মারা, কনুই দিয়ে পাঁজরে গুঁতো দেওয়া কিংবা অহেতুক ধাক্কাধাক্কি— ফুটবলের নান্দনিকতা যেন সেদিন গ্যালারির হাজার হাজার স্তম্ভিত দর্শকের সামনেই বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল।
সেই উত্তাল ও অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মাঝেও টেলিভিশন ক্যামেরায় ধরা পড়ে এক অবিশ্বাস্য ও শান্ত দৃশ্য। পর্তুগালের মাঝমাঠের জাদুকর ডেকো ও নেদারল্যান্ডসের নির্ভরযোগ্য লেফট-ব্যাক জিওভান্নি ফন ব্রঙ্কহর্স্ট পাশাপাশি সিঁড়িতে বসে নিভৃতে গল্প করছেন। অথচ কিছুক্ষণ আগেই রেফারি তাদেরকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দিয়েছেন। তখনও মাঠে তাদের সতীর্থরা একে অপরের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে লড়ে যাচ্ছেন, কিন্তু স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার এই দুই সতীর্থ যেন পৃথিবীর সব বৈরিতা ভুলে ‘ব্যাড বয়েজ কর্নার’-এ খুঁজে নিয়েছেন এক টুকরো শান্তির নীড়। ধারাভাষ্যকার গ্যারি ব্লুমের দেওয়া নামটি আজ ফুটবলের দলিলে এক অমলিন ও চিরস্থায়ী অধ্যায়।
২০০৬ সালের ২৫ জুন, বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর সেই রাতটি ফুটবল বিশ্ব কোনোদিন ভুলবে না। পর্তুগাল বনাম নেদারল্যান্ডস— কাগজে-কলমে এটি হওয়ার কথা ছিল শৈল্পিক ফুটবলের প্রদর্শনী। কিন্তু ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে নাম লেখাল ‘ব্যাটল অব নুরেমবার্গ’ হিসেবে।
সেদিন মাঠে কার্ড দেখানো যেন রাশিয়ান রেফারি ভ্যালেন্তিন আইভানোভের জন্য এক বাধ্যতামূলক রীতিতে পরিণত হয়েছিল। পুরো ম্যাচে মোট ১৬টি হলুদ কার্ড ও চারটি লাল কার্ড দেখিয়ে তিনি যে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন, তা আজও ফুটবলপ্রেমীদের গায়ে কাঁটা দেয়।
পর্তুগাল (নয়টি হলুদ কার্ড, দুটি লাল কার্ড):
মানিশ: ১৯তম মিনিটে মার্ক ফন বোমেলকে ফাউল করে পর্তুগাল শিবিরে কার্ড উৎসবের (!) সূচনা করেন।
কস্তিনিয়া: ৩১তম মিনিটে ফিলিপ কোকুকে স্লাইড ট্যাকল করার দায়ে পান প্রথম হলুদ কার্ড। এরপর প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে অহেতুক হ্যান্ডবল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের দায়ে ম্যাচের প্রথম লাল কার্ডের তেতো স্বাদ পান।
পেতিত: ৫০তম মিনিটে মেজাজ হারিয়ে কার্ড দেখেন।
লুইস ফিগো: ৬০তম মিনিটে ফন বোমেলের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও তাকে মাথা দিয়ে ঢুঁ (হেডবাট) মারার অপরাধে হলুদ কার্ড।
ডেকো: ৭৩তম মিনিটে জন হেইটিংগাকে কড়া ফাউল করে প্রথম হলুদ কার্ড। এর মাত্র পাঁচ মিনিট পর একটি ফ্রি-কিক নিতে বাধা দিয়ে সময় নষ্ট করায় দ্বিতীয় হলুদ কার্ডসহ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন।
রিকার্দো: ৭৬তম মিনিটে সময় নষ্ট করার অপরাধে গোলরক্ষক হয়েও হলুদ কার্ডের হাত থেকে রেহাই পাননি।
নুনো ভ্যালেন্তে: ৭৬তম মিনিটে এক জঘন্য ফাউলের জন্য কার্ড দেখেন।
নেদারল্যান্ডস (সাতটি হলুদ কার্ড, দুটি লাল কার্ড):
মার্ক ফন বোমেল: ম্যাচের মাত্র দুই মিনিটের মাথায় হলুদ কার্ড দেখে যেন গোটা ম্যাচের সুর বেঁধে দিয়েছিলেন।
খালিদ বুলাহরুজ: সপ্তম মিনিটে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ঊরুতে এক ভয়াবহ ফাউল করে প্রথম হলুদ কার্ড পান। এরপর ৬৩তম মিনিটে পর্তুগালের অধিনায়ক ফিগোকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ডে মাঠ ছাড়েন।
জিওভান্নি ফন ব্রঙ্কহর্স্ট: ৫৯তম মিনিটে হলুদ কার্ড ও দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে তিয়াগোকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের দায়ে বহিষ্কৃত হয়ে ডেকোর পাশে গিয়ে বসেন।
ওয়েসলি স্নাইডার: ৭৩তম মিনিটে মেজাজ হারিয়ে পেতিতকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হলুদ কার্ড দেখেন।
রাফায়েল ফন ডার ভার্ট: ৭৪তম মিনিটে রেফারির সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদের জন্য হলুদ কার্ড পান।
লাল কার্ডের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত। ম্যাচের ৬০তম মিনিটে পর্তুগিজ তারকা ফিগো ডাচ মিডফিল্ডার ফন বোমেলকে মাথা দিয়ে ঢুঁ মারেন। ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী এটি ছিল সরাসরি লাল কার্ড পাওয়ার মতো অপরাধ। কিন্তু রেফারি আইভানোভ রহস্যময়ভাবে তাকে কেবল হলুদ কার্ড দেখিয়েই অব্যাহতি দেন। পরে পর্তুগালের কোচ লুইস ফিলিপে স্কলারি তার অধিনায়কের পক্ষ নিয়ে এক বিতর্কিত ও দার্শনিক মন্তব্য করেছিলেন, ‘যিশু খ্রিস্ট হয়তো (মার খাওয়ার জন্য) অন্য গাল বাড়িয়ে দিতে পারতেন, কিন্তু ফিগো তো আর যিশু খ্রিস্ট নন।’
মাঠের উত্তাপ আছড়ে পড়েছিল সংবাদ সম্মেলনেও। দুই দলের লড়াই রূপ নিয়েছিল কড়া ভাষার যুদ্ধে। স্কলারি সরাসরি ফিফার আদর্শকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন, ‘ফিফা সব সময় ফেয়ার প্লের বুলি আওড়ায়। কিন্তু নুরেমবার্গে বিন্দুমাত্র ফেয়ার প্লে ছিল না।’
এর জবাবে নেদারল্যান্ডসের কোচ ও কিংবদন্তি ফুটবলার মার্কো ফন বাস্তেন বেশ রূঢ়ভাবেই পাল্টা আক্রমণ করেন। প্রতিপক্ষের কৌশলকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি যদি ফেয়ার প্লের কথা বলেন, তবে আগে নিজেকে আয়নায় দেখুন। পর্তুগাল এসব নোংরা কৌশল আর সময় নষ্ট করার কারসাজিতে একটু বেশিই অভিজ্ঞ।’
কয়েক বছর পর স্কলারি স্মৃতি রোমন্থন করে আবারও বলেন, সেদিনের আবহাওয়াটা ছিল ঠিক দক্ষিণ আমেরিকার কোপা লিবার্তোদোরেসের মতো। সেখানে জয়টাই শেষ কথা, সৌন্দর্য নয়।
ম্যাচ শেষে সব দায় গিয়ে পড়েছিল রেফারি আইভানোভের ওপর। এমনকি তৎকালীন ফিফা প্রেসিডেন্ট সেপ ব্ল্যাটার পর্যন্ত কড়া সুরে বিদ্রূপ করে বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয়, ওই রেফারি খেলোয়াড়দের পর্যায়ের ছিলেন না। আইভানোভের নিজেরই একটা হলুদ কার্ড পাওয়া উচিত ছিল। এটি ছিল আবেগ আর নাটকে ঠাসা একটি ম্যাচ, কিন্তু রেফারির হস্তক্ষেপগুলো মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।’
ব্ল্যাটার পরে অবশ্য তার এই চড়া মন্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন। তবে ফিফা আর ঝুঁকি নেয়নি। আইভানোভকে ২০০৬ বিশ্বকাপে আর কোনো ম্যাচ পরিচালনা করতে দেওয়া হয়নি। আইভানোভ অবশ্য দমে যাননি। তিনি সাফ জানিয়েছিলেন যে, খেলোয়াড়রাই ছিলেন উস্কানিদাতা এবং তাদের অখেলোয়াড়সুলভ আচরণের কারণেই তাকে এত কঠোর হতে হয়েছিল।
নুরেমবার্গের ১৬টি হলুদ কার্ডের রেকর্ডটি ছিল ২০০২ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ক্যামেরুন-জার্মানি ম্যাচের রেকডের সমান। দীর্ঘ ১৬ বছর এটি ছিল যৌথভাবে বিশ্বকাপের এক ম্যাচে সর্বোচ্চ হলুদ কার্ডের রেকর্ড। তবে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-নেদারল্যান্ডসের স্মরণীয় কোয়ার্টার ফাইনালে স্প্যানিশ রেফারি মাতেউ লাহোজ ১৮টি হলুদ কার্ড দেখিয়ে নতুন রেকর্ড গড়েন।
হলুদ কার্ডের রেকর্ডটি হাতছাড়া হলেও বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক ম্যাচে চারজন খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেওয়ার অনন্য ও রক্তক্ষয়ী রেকর্ডটি আজও ‘ব্যাটল অব নুরেমবার্গ’-এর নামে খোদাই করা আছে। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে সেই রাতটি তাই রেফারির পকেট থেকে বারবার বেরিয়ে আসা কার্ডের ঝলকানিতে তৈরি হওয়া এক বিভীষিকাময় মহাকাব্য।