মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেড়শ বছরের পুরনো একটি বিলাসবহুল স্টিমারের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া গেছে। ১৯ শতকের শেষ ভাগে ওই স্টিমারটি লেক মিশিগানে ডুবে যায়।
আজ সোমবার এই তথ্য জানিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন।
শিপরেক ওয়ার্ল্ড একটি ভিন্ন ধরনের সংগঠন। তাদের মূল কাজ বিশ্বের বিভিন্ন অংশে ডুবে যাওয়া জাহাজের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা।
সংগঠনটি শুক্রবার জানায়, ইলিনয়ের ‘জাহাজ শিকারী’ পল ইহর্ন লাক লা বেল নামের ঐতিহাসিক জাহাজটির ধ্বংসাবশেষের খোঁজ পান। ২০২২ সালের অক্টোবরে উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের রেইসিন ও কেনোশার মাঝামাঝি জায়গায় এটি খুঁজে পান পল ও তার দলের সদস্যরা। এর অবস্থান উপকূল থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে।
পল ইহর্ন বার্তা সংস্থা এপিকে রোববার টেলিফোনে সাক্ষাৎকার দেন।
খোঁজ পাওয়ার তিন বছরেরও বেশি সময় পর কেন এই ঘোষণা এলো, সে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন তিনি। জানান, তার দল জাহাজের একটি ত্রিমাত্রিক ভিডিও মডেলসহ ঘোষণা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বৈরি আবহাওয়া ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে ঐ ভিডিও তৈরিতে অপ্রত্যাশিত বিলম্ব দেখা দেয়। গত গ্রীষ্ম পর্যন্ত বারবার তারা পানির গভীরে থাকা ধ্বংসাবশেষের কাছে যেতে বাধ্য হন।
১৫ বছর বয়স থেকে জাহাজ উদ্ধারের কাজ করছেন পল ইহর্ন (৮০)। তিনি জানান, ১৯৬৫ সাল থেকে লাক লা বেলে’র অবস্থান খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন তিনি। এ বিষয়ে ২০২২ সালে অপর এক জাহাজ শিকারী রস রিচার্ডসনের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পান তিনি। এরপর লেক মিশিগানে সাইড-স্ক্যান সোনার দিয়ে দুই ঘণ্টা খোঁজ করেই জাহাজটি চিহ্নিত করেন তিনি।
ইহর্ন বলেন, ‘এটা একটা খেলার মতো। ধাঁধার সমাধান খোঁজার মতো। কখনো কখনো ধাঁধার উত্তর পেতে খুব বেশি সূত্র পাবেন না আপনি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমার হাতে থাকা সূত্রটি কাজে লেগেছে এবং আমরা প্রায় তাৎক্ষণিক ভাবে এর খোঁজ পাই।’
তবে ওই ‘সূত্র’ নিয়ে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি ইহর্ন।
শিপরেক ওয়ার্ল্ড জানিয়েছে, লাক লা বেল স্টিমারটি ১৮৬৪ সালে ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ডে নির্মাণ করা হয়। ২১৭ ফুট (৬৬ মিটার) দীর্ঘ স্টিমারটি ক্লিভল্যান্ড থেকে লেক সুপেরিয়রে যাত্রী পারাপারের কাজে নিয়োজিত ছিল। ১৮৬৬ সালে সেইন্ট ক্লেয়ার নদীতে অন্য একটি নৌযানের সঙ্গে সংঘর্ষের পর স্টিমারটি ডুবে যায়। ১৮৬৯ সালে উদ্ধার করে আবারও একে চলাচলের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
১৮৭২ সালের ১৩ অক্টোবর ঝড়ো বাতাসপূর্ণ এক রাতে মিলওয়াকি ছেড়ে মিশিগানের গ্র্যান্ড হ্যাভেনের উদ্দেশে রওনা হয় লাক লা বেল। বিলাসবহুল স্টিমারটিতে ৫৩ জন যাত্রী ও ক্রু ছিলেন। মালামাল হিসেবে ছিল বার্লি, শূকরের মাংস, ময়দা ও হুইস্কি। যাত্রা শুরুর প্রায় দুই ঘণ্টা পর স্টিমারে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পানি ঢুকতে শুরু করে।
বিপদ বুঝতে পেরে লাক লা বেলের ক্যাপ্টেন স্টিমারের গতিপথ বদলে মিলওয়াকির দিকে আগাতে শুরু করেন। কিন্তু একের পর এক বড় বড় ঢেউ স্টিমারে আছড়ে পড়তে থাকে। এতে বয়লারের আগুন নিভে যায়। ঝড় কবলিত নৌযানটি দক্ষিণ দিকে আগাতে থাকে।
ভোর ৫টার দিকে ক্যাপ্টেন লাইফবোটে যাত্রীদের ওঠানোর উদ্যোগ নেন। অল্প সময়ের মধ্যে স্টিমারটি ডুবে যায়।
ফেরার পথে একটি লাইফবোট ডুবে আট আরোহী প্রাণ হারান। তবে বাকি লাইফবোটগুলো রেইসিন ও কেনোশার মাঝামাঝি উইসকনসিনের উপকূলে নিরাপদে ভিড়তে সক্ষম হয়।
খুঁজে পাওয়া ধ্বংসাবশেষ পর্যবেক্ষণ করে বাইরের অংশটিকে কুয়াজ্ঞা ঝিনুক দিয়ে আচ্ছাদিত অবস্থায় পাওয়া যায়। এর উপরের কেবিনটি ধ্বংস হয়েছে। ইহর্ন জানান, হাল এবং ওক কাঠ দিয়ে নির্মিত ভেতরের অংশগুলো অক্ষত আছে।
উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, উইসকনসিনের লেকগুলোতে ছয় থেকে ১০ হাজার নৌযান ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর বেশিরভাগই অনাবিষ্কৃত।
লাক লা বেলের ধ্বংসাবশেষ পাওয়ার আগে আরও ১৪টি নৌযানের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করেছেন পল ইহর্ন।