হরমুজ প্রণালিতে সব জাহাজ পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি ইরানি জেনারেলের

Date:

হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে তা ‘পুড়িয়ে দেওয়া হবে’ বলে হুমকি দিয়েছেন ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) এক জেনারেল। তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পথে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

আইআরজিসির টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া এক পোস্টে জেনারেল সরদার জব্বারি বলেন, ‘আমরা তেলের পাইপলাইনেও হামলা চালাব এবং এই অঞ্চল থেকে এক ফোঁটা তেলও বাইরে যেতে দেব না। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাবে।’

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের ডামাডোলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেতে আগ্রহী নাবিক এখন খুব কমই পাওয়া যাচ্ছে। সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশই এই পথ দিয়ে যায়। এই পথ এড়িয়ে এখন বাণিজ্য চালু রাখার চেষ্টা করতে হবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে। এতে তেল ও গ্যাসের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বের জ্বালানি বাজারের জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তল-গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলেও এশিয়া-ইউরোপের আমদানি রপ্তানির প্রধান বাণিজ্যিক রুট খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

তবে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরের জন্য এই প্রণালি অপরিহার্য। বিশ্বের দশম বৃহত্তম এই কনটেইনার বন্দরটি এই অঞ্চলের ডজনখানেক দেশের জন্য রি-ডিস্ট্রিবিউশন হাব বা পণ্য বণ্টন কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

ফ্রান্সের টিএলএফ ফ্রেইটার্স ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান-সোফি ফ্রিবুর্গ জানান, জেবেল আলী বন্দরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করে ছোট জাহাজে করে পূর্ব আফ্রিকা থেকে ভারত পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়।

আগে কখনো বন্ধ হয়নি হরমুজ

হরমুজ প্রণালি সব সময়ই বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত ছিল। ফরাসি হাই ইনস্টিটিউট ফর মেরিটাম ইকোনমির পরিচালক পল টুরেট বলেন, ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তেলের ট্যাঙ্কারে কিছু হামলার ঘটনা ঘটলেও বাণিজ্যিক চলাচল অব্যাহত ছিল।

ফ্রান্সের নৌবাহিনীর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টারের গবেষণা পরিচালক সিরিল পোয়ারিয়ে-কুতানসাইস বলেন, এই প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন বন্ধ হওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন।

শনিবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলার পর বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিপিং কোম্পানিগুলো—ইতালিয়ান-সুইস এমএসসি, ডেনমার্কের মায়েরস্ক, ফ্রান্সের সিএমএ সিজিএম, জার্মানির হাপাক লয়েড এবং চীনের কসকো—তাদের জাহাজগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।

মেরিন ট্রাফিক ম্যাপে দেখা যাচ্ছে, কুয়েতের কাছাকাছি উত্তর দিকে এবং দুবাই উপকূলের কাছে প্রচুর জাহাজ, বিশেষ করে তেলের ট্যাঙ্কার নোঙর করে আছে। প্রণালির অপর পাশে ইরানের বন্দর আব্বাসের কাছেও ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজগুলো দেখা যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের ঠিক আগে আরও কয়েকটি জাহাজের জটলা চোখে পড়ছে।

আটকে আছে যেসব পণ্য, বাড়ছে খরচ

জার্মানি হরমুজ প্রণালি দিয়ে গাড়ি, যন্ত্রপাতি ও শিল্পপণ্য পাঠায়। ফ্রান্স পাঠায় মূলত খাদ্যশস্য, কৃষিপণ্য, প্রসাধনী, বিলাসবহুল পণ্য ও ওষুধ। ইতালি রপ্তানি করে খাদ্যপণ্য, বিপুল পরিমাণ মার্বেল পাথর ও সিরামিক।

উল্টো দিকে, সার ও প্লাস্টিক পণ্যের জন্য অপরিহার্জ তেল-গ্যাস ছাড়াও বিশ্বের অ্যালুমিনিয়াম চাহিদার ৯ শতাংশ পূরণ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো।

ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্ম গ্রাহকদের জানিয়েছে, পণ্য সরবরাহে দেরি হতে পারে। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেমু ও শেইন কয়েক দিনের বিলম্বের কথা জানিয়েছে, আর অ্যামাজন আরও বেশি সময় লাগার আশঙ্কা করছে।

শিপিং কোম্পানিগুলো এই অঞ্চলে চলাচলের জন্য বাড়তি চার্জ আরোপ করায় পণ্য পরিবহন খরচ ইতোমধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে।

এ ছাড়া ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার আশঙ্কায় ইউরোপ-এশিয়া রুটের জাহাজগুলো লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল এড়িয়ে চলছে। দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যাতায়াত করায় সমুদ্রপথে সময় লাগছে বাড়তি ১০ দিন এবং খরচ বাড়ছে প্রায় ৩০ শতাংশ।

Popular

More like this
Related

ইরান কি ভেঙে যাবে?

সব আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখিয়ে ইরানে দ্বিতীয়বারের মতো...

চীনের বিপক্ষে একাদশে নেই রূপনা

এশিয়ান কাপে নিজেদের অভিষেক ম্যাচে শক্তিশালী চীনের বিপক্ষে নিয়মিত...

জুলাই সনদ ও গণভোটের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের রুল

জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোটের অধ্যাদেশ এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের...

মার্কিন নাগরিকদের মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ার নির্দেশনা

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের নাগরিকদের মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ, বিশেষ...