‘হাজার ফুলে ছেয়েছে যে পথ/ আমি চিনি, চিনি সে ঠিকানা/ তোমার মনের নীরব ভাষা, সে-ও তো আমার আছে জানা’—এই লাইনগুলো কুমার বিশ্বজিতের গাওয়া কালজয়ী ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ গানের। লাকী আখন্দের সুরে গানটি লিখেছিলেন কাওসার আহমেদ চৌধুরী।
গুণী এই গীতিকবির জন্ম ১৯৪৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর। মৃত্যু ২০২২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। জ্যোতিষী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। তবে বাংলা গানে এমন অসাধারণ অনেক গীতি কবিতার জন্ম তিনি দিয়েছেন, যেগুলো সত্যিকার অর্থেই আধুনিক।
আধুনিক গানের মূল বিষয়টি হলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য। নগর জীবন, একাকীত্ব, প্রেম-বিরহ আর জীবনের নানাবিধ সংকট নিয়ে গড়ে ওঠে এসব গান। যেমন—’যেখানে সীমান্ত তোমার’-এ আছে শেষ থেকে শুরুর ইঙ্গিত৷ কেন এই সম্পর্ক শেষ হলো, তা এখানে নেই। কিন্তু শীতের শেষে বসন্তে নতুন পাতার আগমনের মতো এখানেও সম্পর্কটি নতুন করে গড়ে তোলার একটা অনুরোধ থাকে। সীমান্ত যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই হয় বসন্তের শুরু। তাই এই গানটি হয়ে ওঠে নিছক কোনো প্রেমের গানের চেয়েও অনেক বেশিকিছু।
আবার লাকী আখন্দের সুর ও কণ্ঠে তার লেখা ‘এই নীল মণিহার’-এ আমরা শুনি—‘দীপজ্বালা রাত জানি আসবে আবার/ কেটে যাবে জীবনের সকল আঁধার/ স্মরণের জানালায় দাঁড়িয়ে থেকে পথ চেয়ে থেকো, পথ চেয়ে থেকো…’
এই গানটি খুব ভালো একটি কবিতাও। নিরন্তর সংকটের পরেও যে আশার আলো মানুষকে স্বপ্ন দেখায়, সেই স্বপ্নের পথে আহ্বান।
আবার লাকী আখন্দের সুরে নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর গাওয়া ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে’ গানটিতে শোনা যায়—‘বেদনাকে সাথি করে পাখা মেলে দিয়েছ তুমি/ কতদূরে যাবে বলো/ তোমার পথের সাথি হবো আমি…’
কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা অধিকাংশ গানই লাকী আখন্দের সঙ্গে৷ তাই তার গানের কথা এলে লাকী আখন্দের কথাও বারংবার আসে। লাকী আখন্দের ‘নীলা’ গানেও আছে সেই আশ্বাস—‘দিয়েছে কে তোমার ও মনে ব্যথা/ কাঁটা হয়ে বিঁধেছে কি তার কথা/ কাছে এসো তুমি মেয়ে, মুছে দেবো আঁখি ঝরা/ ভুলে যাবে তখনি যত বেদনা…’
এই আশ্বাসের কারণে কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা প্রেমের গানগুলো অপবাদের জায়গায় না গিয়ে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
এদেশে ব্যান্ড সঙ্গীতের উত্থানের সময় তাদের জন্যও গান লিখেছেন কাওসার আহমেদ চৌধুরী। ফিডব্যাকের ‘মৌসুমী’ গানে যেমন ‘তুলনাহীনা বান্ধবী’ ও ‘অপরাজিতা নন্দিনী’-র মতো উপমা ব্যবহার করেছেন, এর সঙ্গে লিখেছেন—‘মৌসুমী, আছি একা এই আমি/ ভুলে অভিমান হও সঙ্গিনী।’
এলআরবির জন্য রুপালী গিটার গানটি লিখেছিলেন তিনি। আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া সেই গানে তিনি লিখেছেন—‘মনে রেখ তুমি কতরাত-কতদিন/শুনিয়েছি গান আমি ক্লান্তিবিহীন/ অধরে তোমার ফোটাতে হাসি/ চলে গেছি শুধু সুর থেকে কত সুরে…’
তার লেখা গানের ভেতর আরেকটি বিখ্যাত গান ফোয়াদ নাসের বাবুর সুরে নিলয় দাশের ‘সেই যে চলে গেলে’।
‘এখানেতে আজ উৎসব সারারাত / আলো করে দেয়ালি জ্বলে আছে/ এখানেতে এক উল্লাস ভরা গান/ আবেগের দরজা খুলে গেছে/ তোমাকে বারেবারে মনে পড়ে / আজও স্মৃতির শিখা সারাক্ষণ জ্বলে/ কত যে খুঁজেছি তোমায় অকারণ অশ্রুজলে’ এর মতো লাইনগুলো তীব্র এক নস্টালজিয়া তৈরি করে।
লাকী আখন্দের তুলনামূলক স্বল্পপ্রজ গান ‘রীতিনীতি জানিনা’-র কথাও লিখেছিলেন কাওসার আহমেদ চৌধুরী। ‘এই পৃথিবী আমায় আজও কি ভালোতে চায়/ ভেঙে গেছি নিরাশায়/ কী হবে ডেকে আমায়?’—এই লাইনগুলোতে আবার হতাশাটা স্পষ্ট। যেমন স্পষ্ট লাকী আখন্দের বিখ্যাত গান ‘আমায় ডেকো না’-তে। ‘বিবাগী এ মন নিয়ে জনম আমার/ যায় না বাধা আমাকে কোনো পিছুটানের মায়ায়…’—লাইনগুলো হতাশার যতটা, তারচেয়েও বেশি আত্মপ্রত্যয়ের।
প্রিন্স মাহমুদের প্রথম ব্যান্ড মিক্সড অ্যালবাম ‘শক্তি’-তে তিনি আইয়ুব বাচ্চুর জন্য লিখেছিলেন ‘কোনো এক নিহত নারীকে’। সাইকেডেলিক রক ব্যালাড এই গানটির সুর আইয়ুব বাচ্চুই করেছিলেন৷ ‘মানুষের বেঁচে থাকা দেয়ালের বাধা ভেঙে/ মানুষের যত আশা আমরণ থাকে জেগে/ বিশ্বাস করো আমায়, নিয়ে যাবো যে আলোয়/ ভালোবাসা দেবো তোমায়/ দেবো তোমায়…’—এই লাইনগুলো আমাদের আবারো আশ্বাস দেয়, বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা যোগায়।
কাওসার আহমেদ চৌধুরী এর বাইরে লিখেছেন ‘কবিতা পড়ার প্রহর’-এর মতো স্বপ্নময় রোমান্টিক গানও। ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে/ জোনাকির আলো নেভে আর জ্বলে শাল-মহুয়ার বনে’-র মতো লাইন আমাদের কোলাহল মুখরতা থেকে সরিয়ে স্বপ্নময় এক জগতে নিয়ে যায়, যেখানে শুধু কবিতা পড়ে আর সুর শুনে সারা রাত কাটিয়ে দেয়া যায়।
এভাবে কখনো প্রেমে, কখনো অভিমানে, কখনো হতাশায়, কখনো আশ্বাসে, কখনো ভালোবাসা ঘেরা মুগ্ধতায় জীবন্ত হয়ে ওঠে কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা গানগুলো। যা শুনতে শুনতে জীবনের সঙ্গে বোঝাপড়া করা যায় নতুন করে।