সরবরাহ সংকটের শঙ্কায় আমন মৌসুমের জন্য সার কিনছে সরকার

Date:

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ অল্প সময়ে শেষ না হলে জুনের পর সার সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে—এমন আশঙ্কায় পাঁচ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে সরকার।

সতর্কতার অংশ হিসেবে ইউরিয়া ছাড়াও ডিএপি ও টিএসপি সার আমদানির জন্য মিসরের সঙ্গে চুক্তি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

সূত্র জানিয়েছে, আরও বিভিন্ন ধরনের সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে কয়েকটি দেশের কাছ থেকে পাওয়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে।

জুনের পর আমন মৌসুম শুরু হবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বার্ষিক মোট ধানের উৎপাদন প্রায় চার কোটি টন ধরা হয়েছিল, যার প্রায় ৪০ শতাংশই আমন।

যুদ্ধের কারণে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা এবং জ্বালানি পরিবহনে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় ৪ মার্চ থেকে বাংলাদেশের ছয়টি ইউরিয়া কারখানার মধ্যে পাঁচটি বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। ইউরিয়ার দেশীয় উৎপাদন কখনোই মোট চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জাহাজ সংকটে আমদানি নির্ভরতা আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশে ইউরিয়া সার উৎপাদন ও আমদানির দায়িত্ব বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি)। সংস্থাটির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, কয়েক দিন আগে কৃষি মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও জ্বালানি বিভাগের এক বৈঠকে সার সংগ্রহের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, পাঁচ লাখ টনের মধ্যে তিন লাখ টন জি-টু-জি (সরকার থেকে সরকার) ব্যবস্থায় আমদানি করা হবে এবং বাকি দুই লাখ টন কেনা হবে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে।

সৌদি আরবের সঙ্গে বিদ্যমান জি-টু-জি চুক্তির আওতায় বিকল্প রুটে সার আনা সম্ভব কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। একইসঙ্গে দেশি ও আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে, জানান ওই কর্মকর্তা।

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বাংলাদেশে আসার কথা ছিল এমন একটি ইউরিয়া সারের চালান যুদ্ধের কারণে আটকে আছে। আশা করা হচ্ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং সমুদ্র পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে জাহাজটি বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেবে।

ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সার—ডায়ামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি), ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) এবং মিউরিয়েট অব পটাস (এমওপি) আমদানি করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও তদারকি শাখার অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সাল ইমাম বলেন, বর্তমানে দেশে জুন পর্যন্ত ইউরিয়া সারের মজুত রয়েছে এবং ইউরিয়া ছাড়া অন্যান্য সারের মজুত অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। দেশে এই মুহূর্তে সারের কোনো সংকট নেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুসারে, দেশে মোট সারের চাহিদা প্রায় ৬৮ থেকে ৬৯ লাখ টন, যার মধ্যে ইউরিয়ার চাহিদা ২৬ লাখ টন।

ইমাম আরও জানান, আগামী মাসে মিসরের সঙ্গে চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিসিআইসির এক কর্মকর্তা জানান, চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশকে সার বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে।

বাংলাদেশ সাধারণত কানাডা, রাশিয়া, সৌদি আরব, চীন, মরক্কো ও তিউনিসিয়া থেকে সার আমদানি করে।

বাংলাদেশে ব্যবহৃত ডিএপি সারের অন্যতম প্রধান উৎস সৌদি আরব। গত বছর বিএডিসি দেশটি থেকে ছয় লাখ টন সার কিনেছিল এবং এ বছরও একই পরিমাণ আমদানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমদানি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

ওই কর্মকর্তা জানান, মিসর বাংলাদেশকে তিন লাখ টন করে ডিএপি ও টিএসপি সার বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে এবং তিন লাখ টন টিএসপি আমদানির বিষয়েও বর্তমানে আলোচনা চলছে।

এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশকে দুই লাখ টন করে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে এবং জানিয়েছে যে, এসব চালান অন্যান্য দেশ থেকে বাংলাদেশে পাঠানো হবে।

বছরে দুই লাখ ৮০ হাজার টন ডিএপি আমদানির জন্য চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি চুক্তি ছিল। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এখন তা নবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। একইসঙ্গে বার্ষিক আমদানি লক্ষ্য ৪০ হাজার টন বাড়িয়ে তিন লাখ ২০ হাজার টনে উন্নীত করতে নতুন একটি চুক্তির কাজও এগোচ্ছে।

ইমাম বলেন, চলমান যুদ্ধের কারণে একটি সরবরাহ রুট—সৌদি আরব প্রভাবিত হয়েছে। যে কারণে বাংলাদেশ একাধিক বিকল্প খোলা রেখেছে। কয়েকটি দেশের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে এবং নতুন কিছু চুক্তিও স্বাক্ষর করা হবে।

বাংলাদেশ প্রধানত রাশিয়া ও কানাডা থেকে এমওপি সার আমদানি করে। যুদ্ধের কারণে এই সার সরবরাহ প্রভাবিত হয়নি। ডিএপি সার চীন, মরক্কো ও সৌদি আরব থেকে আমদানি করা হয়, যার অধিকাংশ আসে মরক্কো থেকে। সৌদি আরব থেকে আমদানিতে সমস্যা হলে বাংলাদেশ চীন ও মরক্কো থেকে সার কিনবে, বলেন তিনি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন ডিএপি সার প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড বছরে প্রায় এক লাখ টন উৎপাদন করে। বাকি চাহিদা পূরণ হয় আমদানির মাধ্যমে, যার বেশিরভাগই বিএডিসি পরিচালনা করে। এর একটি ছোট অংশ বেসরকারি খাত কিনে থাকে।

বিএডিসির ক্রয় বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছর ২৬ লাখ টন সার কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ১১ লাখ ৭৬ হাজার টন ডিএপি, আট লাখ ৫৯ হাজার টন এমওপি এবং সাড়ে ছয় লাখ টন টিএসপি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল ই মোহামেদ এই প্রতিবেদককে বলেন, সরকার যুদ্ধ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। আমাদের পরিকল্পনা এটাও রয়েছে, প্রয়োজন হলে অন্যান্য দেশ থেকে সার কেনা হবে।

বেশি সার ব্যবহার করলেই বেশি ফলন হবে—বিষয়টি এমন নয় সেটা কৃষকদের বোঝানো হচ্ছে, যোগ করেন তিনি।

রফিকুল জানান, সরকার সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহ দেবে।

তিনি আরও বলেন, অনেক সময় সারের চাহিদা অতিরঞ্জিতভাবে দেখানো হয় এবং সচেতনতার অভাবে কখনো কখনো অতিরিক্ত সার ব্যবহার করা হয়। চাহিদার হিসাব সমন্বয় এবং সঠিক পরিমাণে ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে সরবরাহ যদি কমেও যায়, আশা করি আগামী কৃষি মৌসুম সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।

Popular

More like this
Related

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে।আজ...

হাসপাতালে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি-নোংরা পরিবেশ দেখে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ক্ষোভ

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে অব্যবস্থাপনা...

শৃঙ্খলাভঙ্গ করায় শাস্তি পেলেন সালমান আঘা

অদ্ভুতভাবে রানআউট হয়ে সিদ্ধান্ত না মেনে ক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন...

হবিগঞ্জের সুতাং নদীর মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য

হবিগঞ্জের সুতাং নদীর পানি ও মাছের দেহে আশঙ্কাজনক মাত্রায়...