শেষ পর্যন্ত তোমাকে চাই…

Date:

১৯৯২ সালের কলকাতা, কিশোর-শ্যামল-হেমন্তের প্রয়াণের পর বাংলা গানে তখন একরকম শূন্যতা। ভালো গায়কেরা আছেন, তবে একেবারে ধাক্কা দেওয়ার মতো কাজ আসছে না।

সুরকারদের ভেতর নচিকেতা ঘোষ-সুধীন-হেমন্ত কেউ বেঁচে নেই। সলিল চৌধুরী তখন জীবনের অস্তরাগে। বাপ্পি লাহিড়ীর খুব ভালো সময় তখন, আর সঙ্গে আছে ডিস্কো গান।

গৌরীপ্রসন্নের মৃত্যুর পর পুলক ব্যানার্জি দু’হাতে প্রচুর লিখছেন। কিন্তু গানের সেই কাব্যময়তা তখন আর নেই। ‘হয়তো তোমারি জন্য’-র পুলক তখন প্রযোজকদের জন্য লিখছেন—উরি উরি বাবা কিংবা বলো বলো সুন্দরী।

এসব গান জনপ্রিয় তো হচ্ছে, কিন্তু কোথাও একটা কমতি যেন থেকেই যাচ্ছে। এমন সময় একদিন কলকাতার সিডির দোকানগুলোয় বাজতে শোনা গেল নতুন একটা গান। সেই গান রাতারাতি ঝড় তুলে পশ্চিমবাংলার সংগীতাঙ্গনে।

অ্যালবামটার নাম ‘তোমাকে চাই’। টাইটেল গানটা তখন মেগা-হিট।

‘প্রথমত আমি তোমাকে চাই, দ্বিতীয়ত আমি তোমাকে চাই, তৃতীয়ত আমি তোমাকে চাই, শেষ পর্যন্ত তোমাকে চাই…’

সুমনের লেখা এই গানের ভেতর শ্রোতারা খুঁজে পেলেন চিরাচরিত ধারার বাইরের এক প্রেম। এর সঙ্গেই মিশে গেল বিক্ষোভ-বিপ্লব, শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজ। ফিরে এলেন হিমাংশু দত্ত কিংবা সলিল চৌধুরী। সুমন গাইলেন—ভীষণ অসম্ভবে তোমাকে চাই!

এভাবে বাংলা গানে প্রেম ও দ্রোহের মিশেলে এলো বক্তব্যধর্মী গানের ধারা। মোহিনী চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, ভূপেন হাজারিকাদের পরবর্তীতে আইকন হয়ে উঠলেন সুমন। আবার রবীন্দ্রনাথ, গৌরীপ্রসন্নের প্রেমটাও নিয়ে এলেন গানে।

সুমনের এই অ্যালবামের ‘পেটকাটি চাঁদিয়াল’, ‘কখনো সময় আসে’, ‘আমাদের জন্য’—সহ সব গানই হিট করে। অঞ্জন দত্ত, শিলাজিৎ, পল্লব কীর্তনীয়া কিংবা রূপঙ্কর বাগচীসহ সমসাময়িক আরও অনেক শিল্পীর জীবনেই প্রভাব বিস্তার করেছিলেন সুমন, যা তারা প্রায়ই বলেন।

সুমনের গানের শুরু কিন্তু ঠিক ১৯৯২ সালে নয়। ১৯৬৬-৬৭ সালের দিক থেকে রেডিওতে গাইতেন। ১৯৭২ সালে দুটো রেকর্ড বেরোয় রবীন্দ্রসংগীতের। এরপর ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র সুমন ব্যাংকে চাকরি করতে গেলেন। তারপর সাংবাদিকতার কাজ নিয়ে বিদেশে।

১৯৮৯ সালে দেশে ফিরে ঠিক করেন গানবাজনা নিয়েই থাকবেন। কৈশোরের প্রেম কাজের ব্যস্ততায় সরে গিয়েছিল দূরে, বাকি জীবনটা গান নিয়েই থাকতে চাইলেন তিনি।

প্রথম প্রথম তেমন সাড়া পাননি। বামপন্থী চিন্তার অধিকারী সুমন সিপিএমের দুয়েকটা সভায় গিটার নিয়ে গেয়েছেন, তেমন সাড়া পড়েনি। এরপর ‘তোমাকে চাই’ এলো, বাকিটা ইতিহাস।

সুমন তার অ্যালবাম ‘গানওয়ালা’-তে আরও ছাড়িয়ে গেলেন নিজেকে।

‘আমি যাকে ভালোবাসি’ গানে ‘ঘাতকের ষড়যন্ত্র, সভ্য আণবিক অস্ত্র/ অর্থহীন যত যুদ্ধ, এই অর্থহীন অপচয়’-এর মতো লাইন লিখে দৃঢ় বার্তা দিলেন যুদ্ধের বিরুদ্ধে।

কিংবা ‘সারারাত জ্বলেছে নিবিড়’ গানে ‘বড় বেরঙিন আজকাল, কোনো রঙ পাই না, তাই দিতে পারি না কিছু’ থেকে ‘এ চাওয়ার রঙ নাও তুমি, আগামীর রঙ দাও তুমি’ গেয়ে সুমন নিরন্তর আশাবাদী করে গেছেন তরুণদের।

সুমনের গানের বড় বিষয় কথা। কম্পোজিশনেও দেখিয়েছেন মুনশিয়ানা। তবে তার লিরিকে তিনি ছিলেন বিপ্লবী। যেমন: বানতলার ঘটনায় যখন অনেকে চুপ, তখন সুমন গাইলেন—‘অনিতা দেওয়ান ক্ষমা করো।’

নিজে সারাজীবন সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী হলেও দলদাসত্ব তাকে স্পর্শ করেনি। গানেই বলেছেন—‘বিরোধীর দৃষ্টি দিয়েও সবাই নিজের হিসেব নিক।’

আবার সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় গিটার নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন। ‘হুল’ (২০১০)-এর মতো অ্যালবাম করেছেন। কার্টুনিস্ট গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে চিটফান্ড ইস্যুতে সরব থেকেছেন।

১৯৪৯ সালের ১৬ মার্চ তার জন্ম। সুমন পার করেছেন জীবনের ৭৩টি বসন্ত। এখন তিনি ব্যস্ত বাংলা খেয়াল নিয়ে।

নিজের ইউটিউব চ্যানেলে কথা বলেন গান কিংবা জীবন নিয়ে। ‘বেজে ওঠা স্মৃতি’ নামের এই সিরিজে সুমন স্মৃতির অর্গল খুলে বলে গিয়েছেন তার জীবনের কথা।

গান নিয়ে তার প্রেমের শুরু বড়ে গুলাম আলীর ‘তেরে তিরছি নজরোকে বান’ থেকে। তখন বয়স কেবল ৭ বছর। রেডিওতে শুনে শুনে গুনগুন করতেন গানটি। তারপর ক্লাসিকাল শেখা, রবীন্দ্রগীতির প্রতি অনুরাগ। তারপর তো গিটার হাতে গান।

সেই ৪৩ বছর বয়সে শুরু করেছিলেন গান। এরপর পেরিয়ে গেল ৩০ বছর। এ বয়সে এসেও সমাজ-রাষ্ট্র নিয়ে ভাবেন। দীর্ঘ মনোলগ প্রকাশ করেন বিভিন্ন বিষয়ে।

ক্লাসিকালে প্রচণ্ড দক্ষ সুমন এখন শিক্ষার্থীদের খেয়ালের তালিম দিতেই ব্যস্ত। আর তো রয়েছে স্মৃতিচারণা। তার শৈশব-কৈশোরের রঙিন স্মৃতিতে অবগাহন। নিজের গানেই (জাতিস্মর) বলেছেন—‘অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, নেই কোনো দাবি-দাওয়া/ এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই চাওয়া’ কিংবা ‘আবার আসবো আবার বলবো শুধু তোমাকেই চাই।’

আমাদের জীবন থেকে মানুষ হারিয়ে যায়৷ জীবন নামের ট্রেন একেকটা স্টেশনে থামে। কেউ হারিয়ে যায় জীবন থেকে, কেউ আসে। কিছু স্বপ্ন হারিয়ে যায়, কিছু আমরা বুনতে থাকি৷ আমাদের জীবন চলতে থাকে৷ বহুদিনের চেনা রাস্তায় একা হাঁটতে হাঁটতে সঙ্গীবিহীন আমরা গুনগুন করি সুমনের গান। মানুষ চলে গেলেও স্মৃতিগুলো থাকে। থাকে নাগরিক কোলাহল। আর তার সঙ্গে রয়ে যান কবীর সুমন।

Popular

More like this
Related

রিয়ালের মুখোমুখি হওয়ার আগে কোনো সুনির্দিষ্ট ‘প্ল্যান’ নেই গার্দিওলার

রিয়াল মাদ্রিদের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে শেষ ষোলোর প্রথম লেগেই...

শহীদ মিনারের সামনে তরুণ হত্যার ঘটনায় আটক ৩

রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে দুর্বৃত্তের গুলিতে মোহাম্মদ রাকিব...

ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে: যেভাবে এলো হলুদ ও লাল কার্ড

ফুটবল মাঠে রেফারির পকেট থেকে হলুদ বা লাল কার্ড...

খাল পুনঃখনন হলে বাংলাদেশের কৃষি ও অর্থনীতির চিত্র বদলে যাবে: অর্থমন্ত্রী

অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন,...