শুল্ক হ্রাস ও এফটিএ দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত করতে পারে ৪ বিলিয়ন ডলার: বিশ্ব ব্যাংক

Date:

দেশীয় শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্ক কমানো এবং মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে ভালোভাবে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের বাড়তি জিডিপি যুক্ত হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রাথমিক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

তবে বৈশ্বিক ঋণদানকারী সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বিকল্প ব্যবস্থা না করে বর্তমান বাণিজ্য সুবিধাগুলো হারালে বাংলাদেশের ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।

গতকাল মঙ্গলবার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের এই গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।

আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। তবে সরকার এই উত্তরণ অন্তত তিন বছর পেছানোর জন্য আবেদন করেছে। চলতি মাসের শেষের দিকে এই বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

যেভাবে আসবে লাভ

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অর্থনৈতিকভাবে এই লাভ মূলত দুই স্তরের সংস্কারের ওপর নির্ভর করবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমদানিকৃত মধ্যবর্তী পণ্যের ওপর শুল্ক কমানো এবং অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক পুরোপুরি তুলে দিলে প্রকৃত জিডিপি শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। মধ্যবর্তী পণ্য বলতে ওই সব কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও পণ্যকে বোঝায়, যা ব্যবহার করে অন্য কোনো পণ্য উৎপাদন করা হয়।

অন্যদিকে, প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে পারলে জিডিপি আরও শূন্য দশমিক ৭৩ শতাংশ বা প্রায় ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে। এই বিশ্লেষণে ধরে নেওয়া হয়েছে যে ভিয়েতনাম যেসব দেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে, বাংলাদেশও সমপর্যায়ের চুক্তি করতে পারবে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি থেকে যে সুবিধা আসবে, তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আসতে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান ও রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ বা আরসিইপিভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে।

সম্ভাব্য ক্ষতি

বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, এ ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় থাকার মাশুলও গুণতে হতে পারে বাংলাদেশকে। কোনো বিকল্প বাণিজ্য চুক্তির ব্যবস্থা না করে বর্তমান অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা হারালে জিডিপি শূন্য দশমিক ২৪ শতাংশ বা প্রায় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার কমে যেতে পারে।

বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো যদি আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বেশি প্রবেশাধিকার পেয়ে যায় এবং বাংলাদেশ যদি চুপচাপ বসে থাকে, তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে জিডিপি আরও শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ কমতে পারে। পাশাপাশি মোট রপ্তানি ২ দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং অদক্ষ শ্রমিকদের মজুরি শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশীয় শিল্পে অতি-সুরক্ষা

গবেষণায় বাংলাদেশের আমদানি শুল্কব্যবস্থার মাধ্যমে দেশীয় শিল্পকে দেওয়া অতিরিক্ত সুরক্ষার বিষয়টিও উঠে এসেছে।

বর্তমানে ৫ হাজার ৬৬৬টি পণ্যের ওপর বাংলাদেশের গড় ‘মোস্ট-ফেভারড-নেশন’ (এমএফএন) শুল্ক বা সাধারণ আমদানি শুল্কের হার ৭ শতাংশ। কিন্তু ‘প্যারা-ট্যারিফ’ নামে পরিচিত অন্যান্য সম্পূরক শুল্ক ও কর যুক্ত হলে সুরক্ষার এই মাত্রা ১৫ দশমিক ৪ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়।

কিছু খাতে এই সুরক্ষার হার অনেক বেশি। যেমন জুতা খাতে মোট সুরক্ষা শুল্ক ৭০ দশমিক ৪ শতাংশ। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রে তা যথাক্রমে ৬৭ দশমিক ১ ও ২২ দশমিক ১ শতাংশ।

শুল্ক কমানোই যথেষ্ট নয়

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা শুল্ক কমানোর প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে একমত হলেও সতর্ক করে বলেছেন, শুধু শুল্ক কমালেই দেশীয় শিল্প রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক হতে পারবে না।

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, ‘আমাদের দেশীয় পণ্যের মান দুর্বল। শুধু শুল্ক বাধা তুলে নিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে রপ্তানি সক্ষমতা তৈরি হবে না।’

পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার বলেন, তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অন্য ব্যবসায়ীদের জন্য বর্তমান শুল্ককাঠামো এমনভাবে সাজানো, যা তাদের রপ্তানির চেয়ে দেশীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করতে বেশি উৎসাহিত করে। তিনি চূড়ান্ত পণ্য ও আমদানিকৃত কাঁচামাল—উভয় ক্ষেত্রেই শুল্ক কমানোর পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, ‘দুটি একসঙ্গে না কমালে প্রকারান্তরে সুরক্ষার হার আরও বেড়ে যাবে, যা রপ্তানি নিরুৎসাহিত করবে।’

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, শুল্ক সংস্কারের পাশাপাশি জ্বালানি, অবকাঠামো ও অর্থায়নের মতো দুর্বলতাগুলোও দূর করতে হবে। শুল্ক সংস্কার বহু সংস্কারের একটি অংশ মাত্র। এটি একাই পুরো পরিস্থিতি বদলে দিতে পারবে না।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সুবিধা নিতে হলে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ অত্যন্ত জরুরি।

সেলিম রায়হান বলেন, আমাদের নীতি প্রণয়নের ক্ষমতা ভালো হলেও বাস্তবায়নের সক্ষমতা খুবই দুর্বল। তিনি প্যারা-ট্যারিফ কমানোর পাশাপাশি স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি মানদণ্ড পূরণে সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন সতর্ক করে বলেন, সব সম্পূরক শুল্কই সুরক্ষামূলক নয়; কিছু শুল্ক স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও রাজস্বের কারণে আরোপ করা হয়।

তিনি বলেন, মুক্তবাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে লাভের হিসাবটি বেশ আকর্ষণীয়, তবে বাস্তবতার নিরিখে এটি একটি অতি-উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য। তিনি শুল্ক সংস্কারের কারণে রাজস্ব আদায়ের ওপর কী প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্টতা দাবি করেন।

ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক লাভের হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না যে এই পরিবর্তনের মূল্য আসলে কে চোকাচ্ছে। কে লাভবান হচ্ছে আর কে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা এই গড় হিসাবে প্রকাশ পায় না।

Popular

More like this
Related

এইসব দিনরাত্রির নীলু ভাবি এখন কেমন আছেন?

বাংলাদেশের অভিনয়জগতের অন্যতম গুণী শিল্পী ডলি জহুর। শঙ্খনীল কারাগার...

হরমুজ প্রণালিতে ৩ জাহাজে হামলা

হরমুজ প্রণালিতে আজ বুধবার অন্তত তিনটি কনটেইনার জাহাজে গুলিবর্ষণের...

নওগাঁয় একই পরিবারের ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে নিজ বাড়ি...