রাঘাটি শিরনি: ১২ বছর ধরে চলা সাম্য ও সম্প্রীতির ভোজ

Date:

কোনও অতিথি তালিকা নেই, নেই ভিআইপি আসন কিংবা কোনও বাধা। আছে শুধু মানুষের দীর্ঘ লাইন— একসঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দ। 

গতকাল রোববার মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের রাস্তার পাশের খোলা মাঠে আয়োজিত দিনব্যাপী রাঘাটি শিরনির এই আয়োজন গত ১২ বছরে পরিণত হয়েছে সাম্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলায়।

ভোজের আয়োজন ছিল খুবই সাধারণ—সাদা ভাত, লাউ আর মুরগির ঝোল। কিন্তু এই সহজ খাবারই একত্র করেছে নানা শ্রেণি, পেশা, ধর্ম ও বয়সের মানুষকে। ধনী-গরিব ভেদাভেদ ভুলে সবাই খেয়েছেন পাশাপাশি বসে। এখানে কেউ অতিথি নন, কেউ আয়োজক নন—যে এসেছে, সে-ই সমান অংশীদার।
প্রায় হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ ঐতিহ্য ‘রাঘাটি শিরনি’ যেন এই মাঠে ফিরে পেয়েছে তার আসল রূপ—সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি আর মানবিক সমতার এক জীবন্ত উদাহরণ।

সদর উপজেলার ভুজবল কাপালীবাড়ির উদ্যোগে আয়োজিত এই শিরনিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মানুষ অংশ নেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠজুড়ে চলেছে খাওয়া-দাওয়া। 

আমন ধান কাটা শেষ হওয়া মাঠে ধূসর ধানের ডাঁটার ওপর পাতা হয়েছে প্লাস্টিকের চেয়ার। কেউ চেয়ারে বসে খাচ্ছেন, কেউ আবার খোলা মাঠেই বসে পড়ছেন।

মাঠের পাশের পাকা রাস্তায় সারি সারি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও রিকশা—যেন জানান দিচ্ছে, এই আয়োজন কেবল আশপাশের গ্রামের নয়, অনেক দূর থেকেও মানুষ টেনে আনে।

মোস্তফাপুরের বাবুল আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ফেসবুকে বহুবার এই শিরনির ছবি দেখেছি। কিন্তু এবারই প্রথম খেতে এলাম। খুব সুন্দর পরিবেশে সবাই একসঙ্গে খাচ্ছি। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই আছে। খেয়ে সত্যিই তৃপ্ত।’

বহমরদন গ্রামের তোফায়েল আহমেদের ভাষায়, ‘কয়েক বছর ধরে খোলা মাঠে এই শিরনি হচ্ছে। শুধু স্থানীয় না, অনেক দূর থেকেও মানুষ আসেন। এমন আয়োজন এখন খুব কম দেখা যায়।’

গয়ঘরের ফেসবুক ব্লগার মো. আমির দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমি প্রতি বছর ভুজবল-গয়ঘরের তিন রাস্তার মোড়ে এই রাঘাটি শিরনিতে আসি। এখানে কেউ ছোট-বড় নয়—সবাই সমান। এটা শুধু খাওয়া নয়, একটা অনুভূতি।’

রাঘাটি শিরনি মূলত শীতকালে অগ্রহায়ণ মাসে, ধান কাটার পর অনুষ্ঠিত হয়। এটি কেবল ভোজ নয়—ভালো ফসলের জন্য কৃতজ্ঞতা এবং আগামী বছরের জন্য আশাবাদের প্রকাশ। 

‘ধান কাটার পর মানুষ অবসর পায়। তখন সবাই একসঙ্গে খায়, গল্প করে। এই মিলন থেকেই সম্প্রীতির জন্ম,’ বলেন মো. আমির।

স্থানীয় সূত্র জানায়, রোববার ভোরেই মাঠে ধান, শাকসবজি ও মশলা আনা হয়। ভোর থেকে রাঁধুনিরা বড় বড় হাঁড়িতে রান্না শুরু করেন। সকাল ৯টার মধ্যেই রান্না শেষ হয়। বেলা ১১টা থেকে শুরু হয় খাওয়া, যা সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে—যতক্ষণ খাবার থাকে, ততক্ষণই মানুষ এই আয়োজনে খেতে পারেন। 

যদিও এই আয়োজন একটি পরিবারের উদ্যোগে শুরু, তবে প্রতিবেশীসহ অনেকেই স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করেছেন।

২০১৩ সাল থেকে জুনাইদ আবেদীনের পরিবার এই রাঘাটি শিরনি আয়োজন করে আসছে।

দ্য ডেইলি স্টারকে জুনাইদ আবেদীন বলেন, ‘এক ভিডিওতে সিলেট অঞ্চলের রাঘাটি শিরনির ঐতিহ্য দেখি। তখন মনে পড়ে, শৈশবে আমাদের এলাকাতেও অগ্রহায়ণে ধান কাটার পর দুধের শিরনি হতো। পরিবারে আলোচনা করে আমরা আবার সেই সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনি।’

তিনি জানান, এখনও পুরো আয়োজনের খরচ পরিবারই বহন করে। কাউকে ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াত দেওয়া হয় না। শুধু স্থানীয় মসজিদের মাধ্যমে তারিখ ঘোষণা করা হয়। চাল দেওয়া হয় নিজেদের ঘর থেকে। নগদ ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় হয় এই আয়োজনে।

Popular

More like this
Related

জনসমক্ষে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট দেখিয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা জানালেন টুঙ্গিপাড়ার বিএনপি প্রার্থী

জনসমক্ষে নিজের নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলে পাঞ্জাবির বোতাম খুলে...

মুসাব্বীর হত্যাকাণ্ড দুষ্কৃতিকারীদের নির্মম-পৈশাচিক অপতৎপরতার বহিঃপ্রকাশ: মির্জা ফখরুল

স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বীর হত্যাকাণ্ড দুষ্কৃতিকারীদের...

দিপু হত্যা: নেতৃত্ব দেওয়া আসামির আদালতে স্বীকারোক্তি

ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাক কারখানার শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে...

‘নিজেদের মধ্যে ঐক্য থাকলে সীমান্ত ইস্যুতে বৃহত্তর দর কষাকষি সম্ভব’

সীমান্ত পরিস্থিতিকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে না...