১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ। পাকিস্তান দিবস প্রত্যাখ্যান করে এদেশের মানুষ সেদিন মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন পতাকা উড়িয়েছিল। সেই দলে ছিলেন ২৯ বছর বয়সী তরুণ কবি মেহেরুননেসা।
মিরপুরের অবাঙালি অধ্যুষিত প্রতিকূল পরিবেশেও তিনি দুই ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে উড়িয়েছিলেন সেই পতাকা। সেদিন সকালেই ‘বেগম’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল মেহেরুননেসার কবিতা ‘জনতা জেগেছে’। এটাই ছিল তার জীবনের শেষ কবিতা। সেখানে তিনি লিখেছিলেন—
‘মুক্তি শপথে দীপ্ত আমরা দুরন্ত দুর্বার,
সাত কোটি বীর জনতা জেগেছি, এই জয় বাঙলার।’
মেহেরুননেসার আকাঙ্ক্ষিত সেই জনতা পাকিস্তানের অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে জেগেছিল সূর্যের মতো দীপ্তি নিয়ে। নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা। কিন্তু ‘বেয়নেট আর বুলেটের ঝড় ঠেলে’ যে ‘চিরবিজয়ের পতাকাকে’ সপ্ত আকাশে মেলতে চেয়েছিলেন, সেই বিজয় মেহেরুননেসা দেখে যেতে পারেননি।
চিরবিজয়ের পতাকা ওড়ানোর চারদিনের মাথায় ২৭ মার্চ সপরিবারে তাকে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে প্রথম নারী শহীদ কবি হিসেবে আমরা স্মরণ করি মেহেরুননেসাকে।
উদ্বাস্তু জীবনের সংগ্রাম ও স্বশিক্ষা
১৯৪২ সালের ২০ আগস্ট। কলকাতার খিদিরপুরে আব্দুর রাজ্জাক ও নূরুননেসার ঘরে জন্ম নেয় এক কন্যাসন্তান। নাম রাখা হয় মেহেরুননেসা, আদরের ডাকনাম ‘রানু’। কে জানত, এই রানুর জীবনকাহিনী বাংলার ইতিহাসের পাতায় একাধারে অসীম সাহস ও চরম নৃশংসতার এক বেদনাবিধুর উপাখ্যান হয়ে থাকবে!
মেহেরুননেসার শৈশব খুব সহজ ছিল না। তৎকালীন সমাজের রক্ষণশীলতার কারণে স্কুলে পড়তে পারেননি তিনি। কিন্তু তাতে দমে যাননি তিনি। বাবা ও বড় বোন মোমেনা খাতুনের অনুপ্রেরণায় ঘরে বসেই শুরু হয় তার বিদ্যাভ্যাস। নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে হয়ে ওঠেন স্বশিক্ষিত।
মেহেরুননেসার পরিবার একসময় সচ্ছল ছিল। কলকাতায় তাদের কাপড় ও জুতার দোকান ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় দোকানগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়, লুট হয়ে বাড়ি।
বাবার সঙ্গে শিশু মেহেরুননেসা কয়লার দোকানে কাজ শুরু করেন। সেখানকার অভিজ্ঞতাই পরে তার কয়লাখনির মানুষদের নিয়ে কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন—
‘কয়লা খনির গভীরে দেখেছি জ্বলতে
জ্বালানীবিহীন মহাজীবনের সলতে’
১৯৫০ সালে মেহেরুননেসার পরিবার নামমাত্র মূল্যে কলকাতার বাড়ি বিক্রি করে দেয়। এরপর তারা পাড়ি জমান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে।
ঢাকায় নতুন জীবন ও কলমের লড়াই
ঢাকায় এসে প্রথমে পুরান ঢাকার তাঁতিবাজারে ও পরে মিরপুরে স্থায়ী ঠিকানা হয় তাদের। বাবার অসুস্থতা (ক্যানসার) এবং সংসারের অভাব মেহেরুননেসাকে অল্প বয়সেই পরিণত করে তোলে। ১৯৬৯ সালে তার বাবা মারা যান।
মা ও ছোট দুই ভাই—রফিকুল ইসলাম বাবলু ও শহিদুল ইসলাম টুটুলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন মেহেরুননেসা। বাংলা একাডেমিতে অনুলিখন, পত্রিকার প্রুফ দেখা ও পরে ফিলিপস কোম্পানিতে চাকরি—এভাবেই চলতে থাকে তার জীবনসংগ্রাম।
এত কঠোর পরিশ্রমের মধ্যেও তার ভেতরকার কবিসত্তা ডালপালা মেলতে থাকে। মাত্র ১০ বছর বয়সে ১৯৫২ সালে ‘দৈনিক সংবাদ’-এর খেলাঘর পাতায় তার প্রথম কবিতা ‘চাষী’ প্রকাশিত হয়। ১৯৫৪ সালে ‘রাজবন্দী’ কবিতায় তিনি দাবি তোলেন—‘আমাদের দাবি মানতে হবে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। ’
এই কিশোরীর এমন প্রতিবাদী উচ্চারণ পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের নজর এড়ায়নি। পুলিশ তার বাড়িতে হানা দেয়, কিন্তু তার বয়স দেখে অবাক হয়ে শুধু তাকে সতর্ক করে ফিরে যায়। তারপরও ‘বেগম’, ‘ইত্তেফাক’, ‘মাসিক মোহাম্মদী’, ‘কৃষিকথা’সহ বিভিন্ন পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশ হতে থাকে।
রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলো
উনসত্তর, সত্তর থেকে একাত্তরের উত্তাল সময়ে মেহেরুননেসা ছিলেন রাজপথের লড়াকু সৈনিক। ভাষাশহীদদের স্মরণে লিখেছিলেন—
‘শহীদ ভাইরা! স্বর্গ শিখর হোতে
চোখ মেলে দ্যাখো আজ বাংলার
পীচমোড় কালো পথে
তোমাদের যতো উত্তরসূরী
বুলেটের মুখে হাসে।’
মিরপুর অবাঙালি-অধ্যুষিত হওয়ায় নিজেদের অস্তিত্ব ও স্বাধীন সত্তা বজায় রাখার তাগিদে মেহেরুননেসা বন্ধু কাজী রোজীর সঙ্গে মিলে গঠন করেছিলেন ‘অ্যাকশন কমিটি’।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে তার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেখানে অ্যাকশন কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে মেহেরুননেসাও গিয়েছিলেন, দাঁড়িয়েছিলেন জনতার সারিতে।
ওই বছরেরই ২৩ মার্চ পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবসে নিজ বাড়ির ছাদে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ান তিনি। এই দুঃসাহসই বিহারী ও রাজাকারদের নজরে তাকে শত্রু করে তোলে।
২৭ মার্চের নারকীয় হত্যাকাণ্ড
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, ঘুমন্ত বাঙালির ওপর মানব ইতিহাসের অন্যতম নারকীয় গণহত্যা চালায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা। সেই কালরাত্রির পর মিরপুর এলাকা অবাঙালি ও বিহারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
কবি কাজী রোজী তার লেখা ‘শহীদ কবি মেহেরুননেসা’ বইয়ে ২৭ মার্চের সেই দিনটির বর্ণনা দেন। মেহেরুননেসার বাড়িতে তল্লাশি হতে পারে জেনে বন্ধু কাজী রোজী তাকে অন্য কোথাও সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু দুই ভাই ও মাকে নিয়ে কোথায় যাবেন, সেই চিন্তায় তিনি বাড়ি ছাড়তে পারেননি।
২৭ মার্চ মেহেরুননেসার মিরপুর ৬ নম্বর ডি ব্লকের ১২ নম্বর রোডের ৮ নম্বরে বাড়িতে অবাঙালিরা হামলা চালায়। প্রথমে তার দুই ভাইয়ের মাথা কুপিয়ে শরীর থেকে আলাদা করে ফেলে। সন্তানদের এভাবে চোখের সামনে মরতে দেখে বিপণ্ন মা নূরুননেসা জ্ঞান হারান। এরপর তাকেও কেটে ফেলে ঘাতকেরা।
এরপর অমানুষিক নির্যাতনের পর মেহেরুননেসাকে হত্যা করা হয়। তার মাথা শরীর থেকে আলাদা করে চুলের বেণী দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে টাঙিয়ে রাখে। চলতে থাকে ঘাতকদের উল্লাস।
এই পুরো হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন মেহেরুননেসার এক অবাঙালি প্রতিবেশী। তিনি বলেছিলেন, এমন নারকীয় হত্যাযজ্ঞ তিনি জীবনে কখনো দেখেননি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে প্রমাণিত হয় যে, আবদুল কাদের মোল্লার নেতৃত্বে বিহারী ও রাজাকারদের একটি দল এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় কাদের মোল্লা স্বাধীনতাবিরোধী আল বদর বাহিনীর সদস্য ছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মূল রায়ে মেহেরুন্নেসা হত্যাকাণ্ডের (চার্জ-২) জন্য কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
কবি মেহেরুননেসা কেবল একটি নাম নয়, তিনি একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে সাহসের এক অবিনাশী প্রতীক। যে মিরপুর ছিল শত্রুবেষ্টিত এক মৃত্যুপুরী, সেখানে দাঁড়িয়েও তিনি স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে প্রমাণ করেছিলেন—মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠরোধ করা অসম্ভব।