রংপুরে ৫ বছরে কৃষিজমি কমেছে ৩৪৮৪ হেক্টর

Date:

খাদ্যশস্যের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত রংপুরে দিন দিন কমছে কৃষিজমির পরিমাণ। আবাসন প্রকল্প, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ইটভাটা ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে প্রতিবছরই বিপুল পরিমাণ জমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। এতে দীর্ঘদিন ধরে কৃষিনির্ভর রংপুরের অর্থনীতি ভবিষ্যতে হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে, আবাদি জমি কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে জনসংখ্যা। ফলে বাড়ছে খাদ্যের চাহিদাও।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে রংপুর জেলায় আবাদি জমি কমেছে ৩ হাজার ৪৮৪ হেক্টর। একই সময়ে জেলায় জনসংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ১৮৩ জন। খাদ্যের বার্ষিক চাহিদা বেড়েছে ২৭ হাজার ৫৯৪ টন, কিন্তু খাদ্য উদ্বৃত্ত বেড়েছে মাত্র ২ হাজার ৭০৫ টন।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও, তা চাহিদা বৃদ্ধির তুলনায় খুব বেশি নয়। একসময় রংপুর অঞ্চলে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে জেলার প্রায় ৩২ লাখ মানুষের খাদ্য চাহিদা স্থানীয় উৎপাদন থেকেই মেটানো সম্ভব। তবে আবাদি জমি ক্রমাগত কমতে থাকায় ভবিষ্যতে এই সক্ষমতা বজায় থাকবে কি না—তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, জেলার অধিকাংশ কৃষকই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক। মোট কৃষকের পাঁচ ভাগের একভাগই ভূমিহীন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রংপুরে কৃষক পরিবার রয়েছে ৫ লাখ ৩৩ হাজার ১২৯টি। এর মধ্যে ভূমিহীন কৃষক পরিবার ৯৫ হাজার ১৪০টি। প্রান্তিক কৃষক ২ লাখ ৪ হাজার ৪৯০ জন, ক্ষুদ্র কৃষক ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭৩ জন, মাঝারি কৃষক ৫০ হাজার ৭৫৪ জন ও বড় বা বিত্তবান কৃষকের সংখ্যা মাত্র ৬ হাজার ৭৪ জন।

অন্যদিকে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে আবাসনের চাহিদা, ফলে কৃষিজমি ভরাট করে গড়ে উঠছে বসতবাড়ি। একইভাবে ইটভাটা, কারখানা, স্কুল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও উর্বর জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে। এতে ক্রমেই কমছে কৃষিজমির পরিমাণ।

রংপুরের শঠিবাড়ী এলাকার কলেজশিক্ষক সুনীল কুমার রায় দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘১৫-২০ বছর আগেও আমাদের এলাকায় দিগন্তজোড়া সবুজ কৃষিজমি দেখা যেতো। এখন সেই জমিতে একের পর এক শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। চোখে পড়ার মতো কৃষিজমি আর তেমন নেই।’

মিঠাপুকুর উপজেলা শহরের বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘আগে মহাসড়কের দুই পাশে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ছিল। এখন সেই জমিতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ছোট শিল্পকারখানা ও বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে। কৃষিজমি দ্রুত কমে যাওয়াটা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে।’

রংপুরের বসতভিটা ও আবাদি জমি রক্ষা সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা পলাশ কান্তি নাগ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কথিত শিল্পায়নের নামে অনেক ক্ষেত্রে উর্বর কৃষিজমি ধ্বংস করা হচ্ছে। কৃষকের শ্রম ও ঘামে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। অথচ মুনাফার লোভে একের পর এক কৃষিজমি নষ্ট করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে রংপুর অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ৫ বছর আগে রংপুর জেলায় আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২ লাখ এক হাজার ৪৯১ হেক্টর। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার সাত হেক্টর। একই সময়ে জেলার জনসংখ্যা ৩০ লাখ ৭২ হাজার ১০৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩২ লাখ ২৬ হাজার ২৮৯ জন।

 

পাঁচ বছর আগে জেলায় খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল ১০ লাখ ৭১ হাজার ৫৩৯ মেট্রিক টন। বার্ষিক চাহিদা ছিল ৫ লাখ ৪৫ হাজার ৯০৪ মেট্রিক টন, ফলে উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ৪ লাখ ১ হাজার ৫৫০ টন। বর্তমানে উৎপাদন বেড়ে ১১ লাখ ৪ হাজার ৭৭৮ টন হলেও চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৭৩ হাজার ৪৯৮ টনে। ফলে উদ্বৃত্ত বেড়ে হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ৪ হাজার ৩৩৫ টন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলায় এক ফসলি জমি রয়েছে ৮ হাজার ৭৭৩ হেক্টর, দুই ফসলি ৮৭ হাজার ৪৭২ হেক্টর, তিন ফসলি ৯২ হাজার ৮৩২ হেক্টর এবং চার ফসলি জমি ৮ হাজার ৯৬০ হেক্টর। নীট ফসলি জমির পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৯৩৩ হেক্টর।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদে দক্ষতা বাড়ার ফলে উৎপাদন এখনো উদ্বৃত্ত রয়েছে। তবে তিন ফসলি জমি যেন কোনোভাবেই অকৃষি খাতে ব্যবহার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় সুষম সার ব্যবহারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি অনেকাংশে কৃষিনির্ভর। তাই রংপুরের মতো কৃষি সমৃদ্ধ অঞ্চলের জমি সংরক্ষণে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বর্তমানে একই জমিতে বছরে দুই থেকে তিনবার চাষাবাদ হচ্ছে। অল্প জমিতে বেশি ফসল উৎপাদনের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর চাষই ভবিষ্যতের প্রধান পথ হতে পারে।’

Popular

More like this
Related

সংসদ রাজনীতি চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হলে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হয়: ডেপুটি স্পিকার

জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেছেন, জাতীয়...

বাংলাদেশ আইসিটি স্টেকহোল্ডারস অ্যালায়েন্সের ইফতার ও নেটওয়ার্কিং অনুষ্ঠিত

বাংলাদেশ আইসিটি স্টেকহোল্ডারস অ্যালায়েন্স (বিসা)-এর উদ্যোগে আইসিটি খাতের বিভিন্ন...

যুক্তরাষ্ট্র-দ. কোরিয়ার মহড়া চলাকালে উ. কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ

যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া চলাকালে পূর্ব...

গণপরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি নিশ্চিত করা হয়েছে: সড়কমন্ত্রী

সড়ক পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, গণপরিবহনের জন্য...