মানতা সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য ঈদ আসে শুধু একবেলার আনন্দ হয়ে। ঈদের দিন কোনোমতে এক টুকরো মুরগির মাংস জুটলেও, পরদিন থেকেই তাদের ফিরতে হয় প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামের কঠিন বাস্তবতায়।
বরিশালের বুখাইনগর নদীর তীরে সারি সারি নৌকায় বসবাস করে এই মানতা সম্প্রদায়। অর্ধশতাব্দী ধরে ১১৫টি নৌকায় বসবাস করছে এই বহরের ৫ শতাধিক মানুষ।
তাদের জন্ম, সংসার এমনকি মৃত্যুও হয় নৌকায়। জীবন ধারণের একমাত্র অবলম্বন জাল আর বড়শি। এবারের ঈদে কোনোমতে ‘মুরগি-ভাত’ জুটলেও ঈদের পরদিন আজ সাতসকালেই পান্তা খেয়ে উত্তাল নদীতে মাছ শিকারে বেরিয়ে পড়েছেন তারা।
কালবৈশাখীর ঝড়ো হাওয়া আর ইলিশের মৌসুম—এই সময়টিই তাদের মাছ ধরার প্রধান ব্যস্ত সময়।
এই বহরের সরদার জসিম উদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ঈদের দিন ভালো খেয়েছি। আজ আবার আগের অবস্থা। সকালে জলভাত খেয়ে মাছ শিকারে গিয়েছিলাম তেঁতুলিয়া আর আড়িয়াল খাঁ নদীর মোহনায়।’
কিছু পোয়া মাছ পেয়েছেন জসিম। বিকেলে বাজারে গিয়ে সেই মাছ বিক্রি করেন।
‘মাছ বিক্রির টাকা দিয়ে বাজার করে নৌকায় ফিরলে তবেই উনুন জ্বলবে,’ বলেন তিনি।
আক্ষেপ করে মানতা সম্প্রদায়ের সরদার বলেন, ‘ঈদের পরের দিন আমাদের কাছে আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই। মাছ ধরলে পেটে ভাত জোটে, না পেলে লবণ-ভাতই ভরসা।’
একই অভাবের কথা জানালেন গৃহবধূ মমতাজ বেগম। তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন ছেলে-মেয়েদের মুখে এক টুকরো মাংস তুলে দিতে পেরেছিলাম। এটাই আনন্দ। আজ ডাল-ভাত খেয়েই দিন কাটাতে হয়েছে।’
মানতা সম্প্রদায়ের সদস্যদের অভিযোগ, স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় এবং অধিকাংশের জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় তারা সরকারি কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পান না। এমনকি দুঃস্থদের জন্য বরাদ্দ সুযোগ-সুবিধাও তাদের কপালে জোটে না। এই যাযাবর জীবনের অবসান চান তারা।
মানতা সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করা ‘চন্দ্রদ্বীপ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি’র প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ আলী জীবন ডেইলি স্টারকে জানান, বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ, চরকাউয়া, চরমোনাই ও টুঙ্গীবাড়িয়াসহ পাঁচটি ইউনিয়নে তিন শতাধিক মানতা পরিবারে এক হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করে।
যোগাযোগ করা হলে জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আখতারুজ্জামান তালুকদার জানান, এবারের ঈদে মানতা সম্প্রদায়ের ৫০ জনকে সরকারি ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এই সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষকে এই সেবার আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।