মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর আগামীকাল শনিবার। ঈদের আগে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ঢাকার বাজারে মুরগি, গরুর মাংস, পোলাওয়ের চাল, মসলা এবং শসা ও লেবুর দাম বেড়েছে।
এর ফলে সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি খরচের চাপ আরও বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন যে, ঈদুল ফিতরের আগে কিছু পণ্যের চাহিদা দ্বিগুণ বা এমনকি তিনগুণ বেড়েছে, কিন্তু বাজারে সরবরাহ সেই তুলনায় বাড়েনি, যার ফলে দাম বেড়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুসারে, ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ১০ মাসের রেকর্ড ভেঙে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ঠিক এই চরম মূল্যস্ফীতির সময়েই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব পণ্যের দাম আরেক দফা বাড়ল।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মুরগির দাম, বিশেষ করে সোনালি মুরগির দাম গত এক সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
সোনালি মুরগি এখন প্রতি কেজি ৩৬০–৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ৩০০–৩৩০ টাকা। অন্যদিকে, ব্রয়লার মুরগির দামও বেড়ে প্রতি কেজি ২১০–২৩০ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে এক সপ্তাহ আগে এর দাম ছিল ১৮০–২০০ টাকা।
চাহিদার চাপে গরুর মাংসের দাম এখনো অস্থিতিশীল। বর্তমানে প্রতি কেজি মাংস ৬৮০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, মাত্র কয়েক দিন আগেও দাম ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছিল। এই পরিস্থিতি বাজারের তীব্র অস্থিরতারই প্রতিফলন।
ফার্মগেটের মুরগি বিক্রেতা হানিফ মিয়া জানান, তার প্রতিদিনের বিক্রি ১০০-১৫০ থেকে বেড়ে এখন ৬০০-৭০০ মুরগিতে ঠেকেছে। তিনি মনে করেন, গরুর মাংসের দাম বেশি হওয়ার কারণেই ক্রেতারা এখন বিকল্প হিসেবে মুরগি বেশি কিনছেন, যার ফলে বাজারে এমন চাহিদা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, কেনাকাটার অভ্যাসের এই পরিবর্তন নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর তৈরি হওয়া চাপের বিষয়টিকেই স্পষ্ট করে তোলে; কারণ বাজারে সবকিছুর দাম বাড়তে থাকলেও তারা টিকে থাকার তাগিদে তুলনামূলক সাশ্রয়ী আমিষের উৎস খুঁজছেন।
শেওড়াপাড়া এলাকার মাংস বিক্রেতা মোহাম্মদ স্বপন বলেন, চাহিদা অনেক বেশি। স্বাভাবিক সময়ে বিক্রি নগণ্য থাকলেও এখন তিনি প্রতিদিন সাতটি পর্যন্ত গরু জবাই করছেন।
তিনি আরও জানান, গত ১৫ দিনের ব্যবধানে প্রতিটি গরুর দাম ৫হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে
এই সময়ে ক্রেতাদের চাহিদা কম থাকায় মাছের দাম কিছুটা কমেছে। তবে লেবুর দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এক হালি (চারটি) লেবু এখন ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ৩০ টাকা। শসার দামও বেড়ে প্রতি কেজি ৬০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে, যেখানে এক সপ্তাহ আগে এর দাম ছিল ৪০–৬০ টাকা।
গত দুই সপ্তাহে সুগন্ধি চালের দাম কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়েছে। মাঝারি মানের চাল এখন প্রতি কেজি ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর নিম্নমানের চাল বিক্রি হচ্ছে ১৪০-১৫০ টাকায়, যা আগে ছিল ১২০-১৩০ টাকা।
কারওয়ান বাজারের মতো বাজারগুলোতে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ বাড়লেও চিনি, ডাল ও তেলের দাম এখনও চড়া। তবে মশলার দাম, যা আগে বেড়েছিল, তা এখন স্থিতিশীল হয়েছে।
ঢাকার অন্যতম বড় কাঁচাবাজার কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতা মোহাম্মদ বাবলু দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বোতলজাত সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া প্রতি লিটারে কমিশন আগে ৫ টাকা থাকলেও এখন তা কমে মাত্র ১ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
তিনি জানান, চিনি ও সেমাইয়ের দাম বাড়েনি। তবে ধরনভেদে মশলার দাম প্রতি কেজিতে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, ইব্রাহিমপুর, শেওড়াপাড়া ও মিরপুর-১১ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে যে, নারিকেল ও দুধের চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে, তবে সেই অনুপাতে দাম বাড়েনি।
রাজধানীর ইব্রাহিমপুর এলাকার নিরাপত্তা প্রহরী ওয়ালিউল্লাহ জানান, তিনি তার পাঁচ সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ১২ হাজার টাকা বেতন এবং সাড়ে ৮ হাজার টাকা ঈদ বোনাস পাওয়ার পর পরিবারের সবার জন্য ঈদের পোশাক কিনে আজ সকালে ৩ হাজার টাকা হাতে নিয়ে বাজারে এসেছেন তিনি।
তবে গরুর মাংস, মুরগি, সেমাই, সয়াবিন তেল, চিনি এবং নারিকেল কেনার পর তিনি দেখলেন যে তার টাকা প্রায় শেষ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আমি জানতাম দাম বাড়বে, কিন্তু আমার ধারণার চেয়েও বেশি বেড়ে গেছে। ঈদ এমন একটা সময়, যখন মানুষ একটু ভালো মাংস খেতে চায়, কিন্তু সেই ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে আরও অনেক শখ অপূর্ণ থেকে যায়।
ওই এলাকারই অটোরিকশাচালক রিফাত হোসেন জানান, আর্থিক অনটনের কারণে তিনি ঈদে বাড়ি যেতে পারছেন না। দিনে ৪০০-৫০০ টাকা আয় করা এই চালক তার জমানো টাকার বেশির ভাগই পোশাক ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কিনতে খরচ করে ফেলেছেন, ফলে বাড়তি খরচের আর কোনো উপায় অবশিষ্ট নেই।