মহাকাশচারীরা প্রায়ই বলেন, মহাকাশে খাবারের স্বাদ নাকি পানসে লাগে! কেন পানসে লাগে বা মহাকাশে খাবারের স্বাদ বদলে যায় কেন—তা জানতে অনেক গবেষণা হয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এর পেছনে অন্যান্য কারণের সঙ্গে মানসিক কারণও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণার বরাতে দ্য স্পেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মহাকাশে একাকীত্ব ও আলাদা থাকার প্রভাব মানুষের ঘ্রাণ ও স্বাদের অভিজ্ঞতা বদলে দিতে পারে।
মহাকাশচারীরা যখন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) থাকেন, তখন তারা প্রায়ই জানান, খাবারের স্বাদ ফিকে বা অস্বাভাবিক লাগে। অথচ তাদের জন্য বিশেষভাবে পরিকল্পিত পুষ্টিকর খাদ্যতালিকা তৈরি করা হয়। কারণ দীর্ঘমেয়াদি মিশনে পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে বিপজ্জনক হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার রয়াল মেলবোর্ন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (আরএমআইটি) গবেষকরা দেখেছেন, পরিবেশ ও মানসিক অবস্থা মানুষের ঘ্রাণের অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। আর ঘ্রাণই মূলত আমাদের খাওয়া খাবারের স্বাদের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
আরএমআইটি স্কুল অব সায়েন্সের সহ-গবেষক ও সাবেক মহাকাশচারী প্রশিক্ষক গেইল আইলস বলেন, ভবিষ্যতে মহাকাশ মিশনগুলো অনেক দীর্ঘ হবে, কয়েক বছর পর্যন্ত চলতে পারে। বিশেষ করে যখন আমরা মঙ্গল গ্রহে যাব। তাই মহাকাশচারীদের খাবার, পুষ্টি এবং তারা কীভাবে খাবার খায় এসব বিষয় ভালোভাবে বোঝা খুবই জরুরি।
গবেষণায় ভার্চুয়াল রিয়ালিটি (ভিআর) গগলস ব্যবহার করে মহাকাশ স্টেশনের সামগ্রিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও অনুকরণ করা হয়। একই ধরনের পরিবেশ তৈরি করে ৫৪ জন মহাকাশচারীর ওপর ভ্যানিলা, বাদাম ও লেবুর গন্ধ পরীক্ষা করা হয়।
দেখা যায়, মহাকাশ স্টেশনের মতো পরিবেশে ভ্যানিলা ও বাদামের গন্ধ বেশি তীব্র মনে হয়েছে। তবে লেবুর গন্ধে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
ভ্যানিলা ও বাদামে বেনজালডিহাইড নামের একটি মিষ্টি রাসায়নিক যৌগ থাকে, যা ঘ্রাণের তীব্রতা পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষকেরা ধারণা করছেন।
মহাকাশে সাধারণত শূন্য মাধ্যাকর্ষণের কারণে শরীরের তরল নিচের অংশ থেকে ওপরের দিকে সরে যায়। ফলে মুখমণ্ডল ফুলে যায় ও নাক বন্ধ হয়ে যায়। এতে সাময়িকভাবে ঘ্রাণ ও স্বাদ কমে যায়। কয়েক সপ্তাহ পর এসব উপসর্গ কমে এলেও খাবারের স্বাদে প্রভাব ফেলে।
গবেষকদের মতে, তাদের লক্ষ্য হলো এমনভাবে খাবার তৈরি করা, যেন বিচ্ছিন্ন পরিবেশেও মানুষ শতভাগ পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে।
এই গবেষণার ফল শুধু মহাকাশচারীদের জন্য নয়। নার্সিং হোম বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন পরিবেশে থাকা মানুষের ক্ষেত্রেও খাবারের স্বাদ ও পুষ্টি গ্রহণ উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।
মহাকাশ স্টেশনে মহাকাশচারীরা কখনো কখনো ‘স্পেস টাকোর’ মতো খাবার খেয়ে থাকে। টাকো এমন একটি খাবার, যা ভেসে যায় না এবং সহজে খাওয়া যায়।
এই গবেষণার গবেষকরা বলছেন, মহাকাশে খাবারের স্বাদ কেবল মহাকাশচারীর অবস্থান পরিবর্তনের কারণে বদলে যায় না। এর পেছনে একাকীত্ব ও পরিবেশগত প্রভাবও বড় ভূমিকা রাখে। তাই ভবিষ্যতের দীর্ঘ মহাকাশযাত্রা সফল করতে কেবল রকেট প্রযুক্তি নয়, খাবারের মনস্তত্ত্বও বুঝতে হবে।