বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় দিয়েছিলেন বিয়ের কাবিনের জমি, আবেগঘন পরিবেশে বিদায়

Date:

নিজের বিয়ের কাবিনে পাওয়া জমি দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন একটি স্কুল। ৩৮ বছর ধরে সেখানেই আলো ছড়িয়েছেন প্রধান শিক্ষক হিসেবে। তিনি পারভীন সুলতানা, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শ্রীনাথপুর আলমাছ উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও সদ্য বিদায়ী প্রধান শিক্ষক।

১৯৮৭ সালে শ্রীনাথপুর গ্রামের জামাল উদ্দিনের সঙ্গে বিয়ের পর পারভীন সুলতানা শ্বশুরবাড়িতে এসে দেখেন, আশপাশের গ্রামে কোনো বিদ্যালয় নেই। শিশুদের মাইলের পর মাইল হেঁটে দূরের স্কুলে যেতে হয়। এ অবস্থা দেখে বিয়ের কাবিনে পাওয়া ১৪৭ শতক জমির মধ্যে ৩৩ শতক জমিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এই বিদ্যালয়। দীর্ঘদিন পর ২০১৬ সালে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ হয়।

গত মঙ্গলবার ছিল পারভীন সুলতানার শেষ কর্মদিবস। এদিন তাকে বিদায় জানাতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, সহকর্মী, এলাকাবাসী এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি এক আবেগঘন মিলনমেলায় রূপ নেয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সোমা ভট্টাচার্য বলেন, ‘পারভীন সুলতানা একজন আদর্শ শিক্ষকের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিয়ের কাবিনের জমি দিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠার ঘটনা শুধু ত্যাগ নয়, এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত। এমন শিক্ষক সমাজে বিরল।’

বিদায়ী বক্তব্যে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পারভীন সুলতানা। তিনি বলেন, ‘১৯৮৭ সালে বিয়ের কাবিন হিসেবে পাওয়া জমিতে শিশুদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করি। শুরু থেকেই প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছি। আজ মনে হচ্ছে, আমি যেন নিজের সন্তানের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি। এই স্কুল আমার জীবনের একটি বড় অংশ, আমার স্বপ্ন ও আত্মার অংশ হয়ে থাকবে।’

বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও আইনজীবী হাবিব উল্লাহ বলেন, ‘পারভীন সুলতানা ম্যাডাম আমাদের কাছে শুধু শিক্ষক নন, আদর্শ অভিভাবকও। তার আদর্শ ও ভালোবাসা আমাদের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।’

মবশ্বির আলী চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আহমদ সিরাজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ছলিমগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শংকর চন্দ্র দেবনাথ, আলমাছ উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা বেগম প্রমুখ।

সভাপতির বক্তব্যে আহমদ সিরাজ বলেন, ‘পারভীন সুলতানার মতো নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের অবদান শুধু একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নয়, বরং একটি প্রজন্ম তৈরির ইতিহাস। শিক্ষা কখনো অবসর নেয় না, শিক্ষানুরাগ মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।’

আলমাছ উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা বেগম বলেন, ‘ম্যাডামের নেতৃত্বে আমরা সবসময় একটি পরিবার হয়ে কাজ করেছি। তার কাছ থেকে আমরা সহকর্মীরা দায়িত্ববোধ, সততা ও মানবিকতার শিক্ষা পেয়েছিলাম। তিনি আজ বিদায় নিলেও তার আদর্শ আমাদের প্রতিদিনের কাজের প্রেরণা হয়ে থাকবে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ছলিমগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শংকর চন্দ্র দেবনাথ, চিৎলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মিরা বেগম, আলমাছ উদ্দিন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা বেগম, মবশ্বির আলী চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আহমদ সিরাজ, মঙ্গলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোশাহীদ আলী প্রমুখ।  

Popular

More like this
Related

ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে সিলেট হাওরে ঝুঁকিতে বোরো ফসল

সিলেট বিভাগের হাওর অঞ্চলজুড়ে ঘন কুয়াশা ও দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহে...

সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুলসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে ২৫ কোটি টাকা চাঁদাবাজির মামলা

সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ চারজনের বিরুদ্ধে প্রায় ২৫ কোটি...

ঈশ্বরদীর ১০৭ বিঘার রেশম বীজাগার এখন প্রায় পরিত্যক্ত

পাবনার ঈশ্বরদীতে ১০৭ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা ৬৪...

ময়লা ফেলা নিয়ে বিরোধে অন্তঃসত্ত্বা নারীকে কুপিয়ে হত্যা

কুমিল্লার বুড়িচংয়ে ময়লা ফেলা নিয়ে বিরোধের জেরে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে কুপিয়ে...