বিক্রিতে মন্দা, তার ওপর চাঁদাবাজি—দ্বিমুখী চাপে কারওয়ান বাজারের ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা

Date:

ঈদ প্রায় চলে এলেও বিটিএমসি ভবনের পাশের ব্যস্ত ফুটপাথের অস্থায়ী দোকানগুলোতে সাজিয়ে রাখা রঙিন পোশাকের যেন কোনো ক্রেতাই নেই। সারি সারি পণ্য নিয়ে অসহায় বসে থাকা এই ব্যবসায়ীরা আরও বেশি চাপে পড়ছেন চাঁদা দিতে গিয়ে।

তাদের অভিযোগ, রমজানের শেষের দিকে অন্য বছরের মতো এবার বেচাকেনা জমে ওঠেনি। তার ওপর আবার দিতে হচ্ছে চাঁদা। কোনো সমঝোতার ভিত্তিতে নয়, জোরপূর্বকই এসব চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।

শিশুদের পোশাক বিক্রি করতে আসা ৫৫ বছর বয়সী রিয়াজ (ছদ্মনাম) গত শুক্রবার রাতে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সাধারণত ১৫ রমজান থেকে বিক্রি বাড়ে। কিন্তু এ বছর সেটা হলো না।’

‘তার ওপর প্রতি রাতেই ১০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। কীভাবে কী করব বুঝতে পারছি না’, যোগ করেন তিনি।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটপাথে কাঠের মাচা বসিয়ে ছোট দোকান চালান রিয়াজ। বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে চাঁদা দেওয়া তো আমাদের ব্যবসার একটা অংশ হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘বিক্রি ভালো থাকলে চাঁদা দিতে তেমন সমস্যা হতো না। কিন্তু এ বছর বিক্রিই কম।’

তার মতো আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, প্রতিটি দোকান থেকে প্রতি রাতে ১০০ টাকা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নামে প্রতি সপ্তাহে আরও ১৫০ টাকা করে নেওয়া হয়।

হতাশা প্রকাশ করে রিয়াজ বলেন, ‘নির্বাচনের আগে এমপি প্রার্থীরা বলেছিলেন, তারা চাঁদাবাজি বন্ধ করবেন। কিন্তু আসলে তো সেটা হলো না।’

জাহাঙ্গীর টাওয়ার থেকে বিটিএমসি ভবন হয়ে আম্বর শাহ মসজিদ পর্যন্ত এলাকায় একই অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই জায়গাটুকুতে প্রায় ১০০টি অস্থায়ী দোকানে পোশাক, জুতা ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি হয়।

প্রায় পাঁচ বছর ধরে ফুটপাথে কাপড় বিক্রি করেন মেহেরাজ (ছদ্মনাম)। ৫ আগস্টের আগে চাঁদা আরও বেশি ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের পর কয়েকদিন চাঁদা আদায় বন্ধ ছিল। তার কিছুদিন পর থেকেই আবার শুরু হয়েছে। এখন অবশ্য টাকা কম দিতে হয়।’

সরকারি নির্দেশনার পর সম্প্রতি পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট রাজধানীসহ সারা দেশে অভিযুক্ত চাঁদাবাজদের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে। এই তালিকায় ছয়টি শ্রেণি করা হয়েছে।

কারওয়ান বাজার এলাকার একটি তালিকা দ্য ডেইলি স্টারের হাতে এসেছে। সেখানে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ে জড়িত ৩৭ জনের নাম রয়েছে। নথি অনুযায়ী, তাদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট।

তবে দ্য ডেইলি স্টারের নিজস্ব অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই এলাকায় অন্তত ৫০ থেকে ৬০ জন চাঁদাবাজিতে জড়িত।

অভিযোগ রয়েছে, তেজগাঁও থানার কিছু সদস্যও এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত।

২ নম্বর কারওয়ান বাজার সুপার মার্কেটের কাছে সবজি বিক্রি করেন রাবেয়া বেগম (ছদ্মনাম)। তিনি জানান, নিজে চাঁদা না দিলেও তার আশপাশের অনেকেই প্রতিদিন ২০০ থেকে ৫০০ টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘মানুষ চাঁদাবাজি নিয়ে কথা বলতে ভয় পায়। কেউ মুখ খুললে চাঁদাবাজরা মারধর করে, হয়রানি করে। অনেক সময় তো তুলেই দেয়।’

রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজারে প্রতিরাতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত ট্রাক নিয়ে আসে সবজি, মাছসহ নানা পণ্য।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব ট্রাক ও ভ্যান থেকেও বড় অংকের টাকা আদায় করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, ‘প্রথম আলোর অফিসের সামনে অস্থায়ী পাইকারি মোকাম থেকে প্রতিদিন প্রতি দোকান থেকে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা তোলে। পাশাপাশি তেজগাঁও থানার নামে প্রতিটি দোকান থেকে ১০০ টাকা করে নেওয়া হয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ক্যশৈন্যু মারমা অভিযোগ অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, ‘পুলিশের নামে কেউ চাঁদা আদায় করলে আমাদের জানান। তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

চাঁদাবাজিবিরোধী বিক্ষোভে হামলা: মামলা দায়ের

গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন করেন। পরে লাঠিসোটা নিয়ে একটি দল সেখানে হামলা চালায়।

ওই বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, হামলার সময় যুবদলের কিছু স্থানীয় নেতাকর্মী সেখানে ছিলেন।

পরদিন তেজগাঁও থানায় স্থানীয় যুবদলের বহিষ্কৃত সদস্য সচিবসহ প্রায় ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

সম্প্রতি যোগাযোগ করা হলে চাঁদাবাজিবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া কয়েকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কথা বলতেই রাজি হননি। বাকি কয়েকজন কথা বলেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে। তাদের ভাষ্য, এখনও চাঁদাবাজি চলছে।

এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার নামে চাঁদা তোলে।’

তার অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি জানলেও নীরব রয়েছে।

ঢাকা উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার বলেন, কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত অভিযোগে অভিযুক্ত বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে ইতোমধ্যে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘তারপরও কেউ যদি দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করে, তাহলে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদেরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হবে।’
 

Popular

More like this
Related

দলের সবার মধ্যে এখন দারুণ বোঝাপড়া: জামাল ভূঁইয়া

হামজা চৌধুরী ও শমিত সোমের মতো ফুটবলাররা দলে আসায়...

ঈদের ২ সিনেমায় কিংবদন্তি সাবিনা ইয়াসমিন ও রুনা লায়লার গান

দেশের কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন ও রুনা লায়লাকে এবারের...

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে প্রবৃদ্ধি কমার আশঙ্কা, হুমকিতে খাদ্য নিরাপত্তা: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি...

ইরান নিয়ে রিয়াদে কী আলোচনা করলেন আরব মন্ত্রীরা

মধ্যপ্রাচ্যে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করা ইরান যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে...