বাংলা ভাষা চর্চায় উদাসীনতা: কারণ ও প্রতিকার

Date:

ভাষার জন্য লড়াই-ভাষা আন্দোলন। এ আন্দোলনে রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৫২। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান সংবিধানে বাংলা ভাষা প্রথম রাষ্ট্রীয় মর্যাদা লাভ করে। 

ভাষা আন্দোলনের উজ্জীবনী শক্তিই পূর্ববঙ্গের মানুষকে স্বাধীনতায় উৎসাহ যুগিয়েছিল। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনেও প্রেরণা যুগিয়েছে। 

ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও আত্মত্যাগ থাকলেও বর্তমানে এর ঘাটতি লক্ষণীয়। ভাষার প্রতি ঔদাসীন্যই এর প্রধান কারণ। হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী বাংলা আজ ভালো নেই। 

বাংলা ভাষা চর্চার গুরুত্ব

বাংলা ভাষা চর্চা আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, শেকড় এবং আত্মপরিচয়ের সাথে গভীর সংযোগ গড়ে তোলে। এটি আবেগ ও চিন্তা প্রকাশের প্রধান বাহক এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

এছাড়া, বিশ্বব্যাপী বিপুল সংখ্যক মানুষ এই ভাষায় কথা বলে, যা সামাজিক ও পেশাগত যোগাযোগ এবং সাহিত্যিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য অপরিহার্য। 

মনের গভীরের আবেগ, অনুভূতি এবং চিন্তাভাবনা মাতৃভাষার মাধ্যমেই সবচেয়ে ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়। নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ ও জ্ঞান অর্জন করা সহজ ও কার্যকর, যা সৃজনশীলতা ও চিন্তাশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামসহ বিশ্বমানের লেখকদের সাহিত্য, কবিতা ও গান সরাসরি উপভোগ করতে বাংলা চর্চার বিকল্প নেই। 

বিশ্বব্যাপী ব্যবহার: বাংলা বিশ্বের অন্যতম প্রধান এবং শীর্ষ কথ্য ভাষাগুলোর একটি, যা বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ২৩ কোটিরও বেশি মানুষের যোগাযোগ মাধ্যম। 

পেশাগত ও সামাজিক যোগাযোগ: বাংলা ভাষা চর্চা দেশে এবং বিদেশে বাঙালি কমিউনিটির সাথে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে এবং কাজের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করে। 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ভাষা আন্দোলনের রক্তিম ইতিহাস মনে রেখে আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা ও বিকাশে চর্চা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। 

সামগ্রিকভাবে, ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে বাংলা ভাষার সঠিক ও নিয়মিত চর্চা অপরিহার্য। 

বাংলা ভাষা চর্চায় অবহেলা

বাংলা ভাষার প্রতি বাংলাদেশি মানুষের আবেগ, দরদের কমতি নেই। কিন্তু ভাষা-জ্ঞান ও অবহেলার কারণে বাংলা ভাষার সঠিক চর্চার দিকও উপেক্ষণীয় নয়। এ ঔদাসীন্যকে রাষ্ট্রীয় ঔদাসীন্য ও সামাজিক ঔদাসীন্য-এ দুই ভাগে ভাগ করা যায়। 

বাংলা ভাষা চর্চায় রাষ্ট্রীয় ঔদাসীন্য

অধিকাংশ সরকারি নথিপত্র, আইন ও আদালতের কার্যক্রম এখনো ইংরেজির আধিপত্যে চলে, যদিও আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মাধ্যমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বাংলা ভাষার সঠিক চর্চা ও প্রয়োগের অভাব রয়েছে। 

অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যম বা মিশ্র ভাষার সংস্কৃতি বাংলা চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করছে সাইনবোর্ড, নামফলক, বাণিজ্যিক নাম ও বিজ্ঞাপনে ইংরেজি বা বাংলিশের ব্যবহার বাড়ছে, যা রুখতে প্রশাসনের কার্যকারিতা কম। আধুনিক প্রযুক্তি, বিজ্ঞান এবং উচ্চতর গবেষণায় বাংলা ভাষার ব্যবহার ও উপযুক্ত পরিভাষা তৈরির রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ অপর্যাপ্ত। 

ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছরের বেশি সময় পার হলেও উচ্চ আদালত, উচ্চশিক্ষা, কারিগরি ও দাপ্তরিক ক্ষেত্রে ইংরেজিপ্রীতি, আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব এবং মানসিকতার পরিবর্তন না হওয়ায় সর্বস্তরে বাংলার পরিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত হয়নি। 

এছাড়া মিশ্র ভাষা ব্যবহার, প্রযুক্তিতে ইংরেজি নির্ভরতা এবং ভিনদেশি ভাষার প্রতি আগ্রহও এর প্রধান কারণ। অনেকের ধারণা, ইংরেজি বা ভিনদেশি ভাষায় কথা বলা বা কাজ করা বেশি সম্মানজনক এবং আধুনিক। 

আইন-আদালতের নথিপত্র, রিট ও রায়ের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এখনো ইংরেজিই প্রাধান্য পায়। প্রযুক্তিগত, বৈজ্ঞানিক ও উচ্চশিক্ষার অধিকাংশ বই ইংরেজি হওয়ায় বাংলা ভাষার প্রসার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও ইন্টারনেটে এখনো অনেক ক্ষেত্রে রোমান হরফে বা ইংরেজিতে বাংলা লেখার প্রবণতা বেশি। 

প্রমিত বাংলার পরিবর্তে আঞ্চলিকতা ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বাড়ছে, যা শুদ্ধ বাংলার চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করছে। মূলত, নিজস্ব ভাষার প্রতি আন্তরিকতা ও প্রমিত চর্চার অভাবই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

বাংলা ভাষা চর্চায় সামাজিক ঔদাসীন্য: 

বাংলা ভাষা চর্চায় সামাজিক ঔদাসীন্য বর্তমান সময়ে একটি গভীর সংকট, যেখানে বিশ্বায়ন ও ভিনদেশি সংস্কৃতির আধিপত্যে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের প্রতি অবহেলা বাড়ছে। মাতৃভাষার চেয়ে ইংরেজি বা অন্য ভাষার প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা, শুদ্ধ উচ্চারণে অনীহা এবং সামাজিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার কমে যাওয়া এই উদাসীনতার মূল কারণ।

ইংরেজি মাধ্যম ও ইংরেজি ভার্সনের স্কুলের বিস্তার এবং সন্তানদের শুধু ইংরেজি শিক্ষায় উৎসাহিত করা বাংলা চর্চাকে সংকুচিত করছে। প্রশাসনিক ও উচ্চ আদালতের দাপ্তরিক কাজে এখনো ইংরেজি ভাষার দাপট বিদ্যমান। 

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাংলা বানান ও উচ্চারণে অনিয়ম এবং হিন্দি বা ইংরেজি আদলে বাংলা শব্দবন্ধ ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। ভিনদেশি সংস্কৃতি ও ভাষা (হিন্দি, ইংরেজি) চর্চায় আগ্রহ বাড়ায় নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতা তৈরি হচ্ছে । 

ইংরেজি জানা বা অন্য ভাষা জানা উন্নত জীবনের লক্ষণ—এমন একটি ধারণা সমাজে বদ্ধমূল হচ্ছে, যা বাংলাকে ব্রাত্য করে তুলছে। এই ঔদাসীন্য ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করছে। ভাষা সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রমিত বাংলা ব্যবহারে আন্তরিকতা না থাকলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।

প্রমিত বাংলা ব্যবহারে করণীয়

ভাষার অপব্যবহারের ক্ষতিকর দিক রয়েছে। এটি ব্যক্তির বিকাশের অন্তরায়। এ অন্তরায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে তুলতে পারে। সক্রেটিস বলেছেন, ভাষার অপব্যবহার মানুষের আত্মাকে কলুষিত করে থাকে। তাই বাংলা ভাষা ব্যবহারে আরও সচেতন হতে হবে। সর্বস্তরে প্রমিত বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য নিম্নলিখিত বিষয় অনুধাবন জরুরি। 

বাংলা ভাষার আদর্শিক ব্যবহার: 

বাংলা ভাষার মানরূপ রয়েছে। সে অনুযায়ী ভাষা ব্যবহার করতে হবে। বাংলা ভাষার আদর্শিক ব্যবহারের মূল দিকসমূহ:

১। বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম: বানান বিভ্রাট দূর করতে বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত বানানের নিয়ম অনুসরণ করা উচিত।

২। সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা: দাপ্তরিক কাজে অভিন্ন রীতি প্রয়োগের জন্য ‘সরকারি কাজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের নিয়ম’ পুস্তিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

৩। গণমাধ্যমে শুদ্ধতা: টেলিভিশন, রেডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাষার বিকৃতি রোধে প্রমিত রূপ চর্চা করা।

৪। শিক্ষাক্রমে গুরুত্ব: বিদ্যালয় পর্যায়ে, বিশেষ করে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত, প্রমিত বাংলা ভাষা ও বানানরীতি চর্চাকে বাধ্যতামূলক করা।

৫। ব্যাকরণ ও শব্দচয়ন: সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রণ রোধ করে, প্রমিত চলিত বাংলার ব্যবহারকে উৎসাহিত করা। 

ভাষার বিবর্তন স্বাভাবিক হলেও, একটি স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ড বজায় রাখা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে ভাষার ঐক্য ও শুদ্ধতা ধরে রাখার জন্য অপরিহার্য। 

সঠিক কৌশল নির্ধারণ

বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার, চর্চা ও পরিচর্চার জন্য প্রতিদিনের অনুশীলন প্রয়োজন। 

বাংলা ভাষা চর্চা কৌশল:

১। নিয়মিত বই পড়া: বাংলা সাহিত্য ও প্রবন্ধ পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

২। ১০ মিনিটের লিখন অনুশীলন: প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট বাংলায় নিজের চিন্তা লিখে চর্চা করুন।

৩। শুদ্ধ বাংলা বলা: কথোপকথনে শুদ্ধ উচ্চারণের যত্ন নিন ও বাংলিশ পরিহার করুন।

৪। নিউজপেপার পড়া: প্রতিদিন বাংলা সংবাদপত্র পড়লে শব্দভাণ্ডার বৃদ্ধি পায়।

৫। ভিডিও/অডিও শোনা: বাংলা নাটক বা আবৃত্তি শুনলে ভাষার সাবলীলতা বাড়ে। 

ভাষা উন্নয়নের উপায় 

ক) নতুন শব্দ শেখা: প্রতিদিন অন্তত ৫-১০টি নতুন বাংলা শব্দ শিখে বাক্যে প্রয়োগ করুন।

খ) বানান অনুশীলন: প্রচলিত বানান বিধি মেনে চলার চেষ্টা করুন।

গ) ডায়েরি বা ব্লগ লেখা: নিজের মতামত বাংলায় লিখে সোশ্যাল মিডিয়ায় বা ডায়েরিতে শেয়ার করুন।

ঘ) রেকর্ড করা: নিজের বলা বাংলা রেকর্ড করে শুনে উচ্চারণ ঠিক করুন।

ঙ) সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান: বাংলা আবৃত্তি, বিতর্ক বা নাটকে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভাষার গভীরে যান। 

চর্চার মাধ্যম ও উপকরণ

ক) পাঠ্যবই: বাংলা ব্যাকরণ ও সাহিত্য চর্চার বইগুলো (যেমন: বোর্ড বই) নিয়মিত পড়ুন।

খ) অনলাইন প্ল্যাটফর্ম: বাংলা ব্লগ, গ্রুপ বা ভাষা শেখার অ্যাপ ব্যবহার করুন।

গ) অভিধান ব্যবহার: কোনো শব্দের মানে না বুঝলে বাংলা অভিধান (যেমন: বাংলা একাডেমি) দেখুন।

ঘ) সাংস্কৃতিক আড্ডা: বাংলাভাষী বন্ধুদের সাথে আড্ডা ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করুন।

ঙ) বাংলা টাইপিং: কিবোর্ডে (অভ্র/বিজয়) নিয়মিত বাংলা টাইপ করার অভ্যাস করুন।

প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ:

আইন প্রয়োগ: ১৯৮৭ সালের ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’ কঠোরভাবে কার্যকর করা।

প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ: সব দপ্তরে ‘বাংলা ভাষা সেল’ গঠন ও ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা তৈরি।

শিক্ষা ও গবেষণা: উচ্চশিক্ষার সব স্তরে পাঠ্যপুস্তক বাংলায় সহজলভ্য করা। 

সর্বোপরি, ভাষা আন্দোলনের সঠিক চেতনা ধারণ করে বাংলা ভাষা চর্চায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা বৃদ্ধি করা জরুরি।

বাংলা, আমাদের মাতৃভাষা। এ ভাষার মাধ্যমেই আমরা বস্তুজগত সম্পর্কে চিন্তা করতে সক্ষম হই। এ ভাষায় যত দক্ষতা অর্জন সম্ভব, দ্বিতীয় ভাষায় তা সম্ভব নয়। এ ভাষার মাধ্যমেই মানুষের বৌদ্ধিক বিকাশ সম্ভব হয়। 

বাংলা ভাষা যাতে সর্বস্তরে ব্যবহৃত হতে পারে সেজন্য অনুবাদ ও যন্ত্রানুবাদের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। সঠিক ভাষা পরিকল্পনা ও ভাষানীতি প্রণয়নও জরুরি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ভাষার অপপ্রয়োগ সর্বাধিক। সরকারের এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে। বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসারে ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই।

 

লেখক: ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট

Popular

More like this
Related

লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ১২

লেবাননের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের পৃথক হামলায় অন্তত ১২...

প্রকৃতি ও মানুষের মঙ্গল কামনায় বট-পাকুড়ের বিয়ে

উৎসবমুখর পরিবেশে বিশ্বাস ও লোকাচারের এক অনন্য মেলবন্ধনে ঠাকুরগাঁওয়ে...

একটি মহল প্রশাসনে থেকে গোপনে মবকে পৃষ্ঠপোষকতা করে: তথ্যমন্ত্রী

প্রশাসনের একটি মহল গোপনে মবকে পৃষ্ঠপোষকতা করে বলে মন্তব্য...

আদিবাসী ভাষা শিক্ষা শুধু কাগজে-কলমেই

সিলেট বিভাগে আদিবাসী শিশুদের জন্য মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক চালু হলেও...