প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার আলোচনাকে কেন্দ্র করে বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে অসন্তোষ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত সোমবার ১৩ জন সচিবকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এখন আরও এক ডজন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে নতুন সচিব নিয়োগের কাজ করছে। একই সঙ্গে, বেশ কয়েকজন বর্তমান সচিবকে সমমর্যাদার অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদে সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যাতে ওই পদগুলোতে চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের পদায়ন করা যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি (পেছনের তারিখ থেকে কার্যকর পদোন্নতি) পেয়ে সচিব হওয়া অন্তত ৮-১০ জন কর্মকর্তার নাম এখন প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে আলোচিত হচ্ছে। তারা সবাই বেশ কয়েক বছর আগে অবসরে গিয়েছেন।
এই তালিকায় ১৯৮৪ ব্যাচের আব্দুল খালেক, ১৯৮৫ ব্যাচের কামরুজ্জামান, বাকী বিল্লাহ ও তৌহিদুল ইসলাম, ১৯৮৬ ব্যাচের জাকির হোসেন কামাল এবং ১১তম ব্যাচের ফরিদুল ইসলামের নাম গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।
গতকাল রাতে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি পাওয়া মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীকে এক বছরের চুক্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে নতুন সরকার ১৯৮২ ব্যাচের এ বি এম আব্দুস সাত্তারকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিতে নিয়োগ দেয়।
পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, যাদের নাম চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য আলোচিত হচ্ছে, তারা অতীতে নিঃসন্দেহে কঠিন সময় পার করেছেন। তবে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির মাধ্যমে তারা ইতোমধ্যে পদমর্যাদা এবং আর্থিক সুবিধাদি পেয়ে গেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘এখন যদি তারা আমাদের প্রাপ্য পদগুলো দখল করেন, তবে বঞ্চনার সেই ধারাবাহিকতা থেকেই যাবে। এতে করে নতুন বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, আমরা তো নতুন কোনো সংস্কৃতি দেখছি না।’
আরেকজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘মেধাতন্ত্র’ বা মেধাভিত্তিক মূল্যায়নের অঙ্গীকার থাকলেও সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েই তাদের যাত্রা শুরু করছে।
তিনি আরও বলেন, শীর্ষ পর্যায়ে একজনকে চুক্তিতে নিয়োগ দিলে তার অধীনস্থ অন্তত দুই-তিনজন মেধাবী কর্মকর্তার পদোন্নতি ও কর্মজীবনের স্বাভাবিক গতি থমকে যায়। ফলে তারা অনেকটা দায়সারাভাবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাবেক সচিব বদিউর রহমান বলেন, ‘আমলাতন্ত্রের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। যে জনসমর্থন ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি নিয়ে এই সরকার কাজ শুরু করেছে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ তার সঙ্গে মোটেও সংগতিপূর্ণ নয়।’
খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা, দুজনেই শীর্ষ প্রশাসনিক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ওপর নির্ভর করে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। বদিউর রহমান বলেন, ‘গত অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার মূল কারিগর ছিলেন এই চুক্তিভিত্তিক সচিবরা। এই সরকারও যদি কয়েক বছর আগে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য বেছে নেয়, তবে আর বলার কিছু থাকে না।’
যদিও গত সোমবার নয়জন সচিবের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে, তবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ আরও কিছু স্থানে চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তারা এখনো বহাল আছেন।
এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গতকাল দুই সচিবের বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) সচিবালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদারকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং মো. আনোয়ার জাহান ভূঁইয়াকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে।