পোশাক শিল্পে কর্মরত নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা নয়

Date:

নব্বই দশকের শুরু থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ অর্জিত হয় এই শিল্প থেকেই। বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে তাই পোশাক শিল্প অন্যতম বৃহৎ কর্মসংস্থানের জোগান দিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, এ শিল্পে কাজ করছেন প্রায় ৪৩ লাখ শ্রমিক, যাদের অর্ধেকেরও বেশি নারী। ভোরের আলো ফোঁটার সঙ্গে সঙ্গেই চোখে পড়ে শহরের ফুটপাত ধরে দলবেঁধে হেঁটে যাওয়া এই নারী কর্মীদের। তাদের অধিকাংশেরই বাস শহুরে বস্তিগুলোতে। বাইরে থেকে দেখলে অনেকেই ধারণা করতে পারেন, অর্থনৈতিক দিক থেকে কিছুটা স্বাবলম্বী হওয়ার কারণে তারা হয়তো সমাজের আর দশজন নারীর চেয়ে অপেক্ষাকৃত ক্ষমতায়িত। তবে বাস্তবতা এখনও বেশ ভিন্ন। এই নারী শ্রমিকরা ঘর ও কর্মস্থল উভয় জায়গাতেই সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।

সম্প্রতি আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত অ্যাডসার্চ প্রকল্পের গবেষণায় উঠে এসেছে, পোশাক শিল্পে কর্মরত নারীরা অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে থাকলেও তাদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, এমনকি পারিবারিক নিরাপত্তাও উদ্বেগজনকভাবে দুর্বল। অথচ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার কেবল চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয় নয়, বরং তাদের মানবাধিকার ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এ দেশের নারী পোশাক শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্র ও গৃহস্থালির ‘দ্বৈত বোঝা’ বহন করে চলেছেন, যা তাদের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ইতোপূর্বে পোশাক শ্রমিকদের নিয়ে বিচ্ছিন্ন কিছু গবেষণা হলেও তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও সহিংসতা বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদী বা কোহর্ট গবেষণা ছিল না।

আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত গবেষণাটিতে ঢাকার কড়াইল ও মিরপুর এবং টঙ্গীর বস্তিতে বাস করা ১৫–২৭ বছর বয়সী মোট ৭৭৮ জন বিবাহিত নারী শ্রমিক অংশ নিয়েছিলেন। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গবেষণাটির তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

গবেষণাটিতে অংশ নেওয়া নারী শ্রমিকদের প্রতি তিনজনের মধ্যে দুইজনেরই বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে এবং তাদের প্রায় ৬৫ শতাংশ ১৮ বছর হওয়ার আগেই প্রথম গর্ভধারণ করেছেন। তাদের একটি অংশের বিয়ে কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার আগেই হয়ে যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও গর্ভপাতের হারও তুলনামূলকভাবে বেশি। তাদের মধ্যে প্রায় প্রতি তিনজনে একজন নারীশ্রমিক জীবনে অন্তত একবার অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের মুখোমুখি হয়েছেন এবং এক-চতুর্থাংশের মেনস্ট্রুয়াল রেগুলেশনের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

আর্থিকভাবে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পরও এই নারীরা সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে বাল্যবিবাহের কুফল থেকে মুক্তি পাননি। বাল্যবিবাহ তাদের শিক্ষার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করছে। কিশোরী বয়সে গর্ভধারণ কেবল মায়ের স্বাস্থ্যের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ নয়, একইসঙ্গে নবজাতকের মৃত্যু-ঝুঁকি ও অপুষ্টির হারও বাড়িয়ে দেয়।

কিশোরী গর্ভধারণের মূল নিয়ামকগুলো নিয়ে গবেষণা করে দেখা গেছে, নারী গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে যারা তুলনামূলকভাবে বেশি শিক্ষিত ও বাল্যবিবাহ হয়নি, তাদের কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। আবার যারা প্রথম গর্ভধারণের আগে গার্মেন্টসখাতে কাজ শুরু করেছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি কম ছিল। অন্যদিকে, স্বামীর মাধ্যমে সহিংসতার অভিজ্ঞতা থাকলে কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি ২৬ শতাংশ বেড়ে যায়।

তবে কিছুটা আশার বার্তা হলো, এসব পোশাক শিল্পে কাজ করছে বলেই সংসারের আয় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। মেয়েদের বিয়ে কিছুটা হলেও বিলম্ব করার সুযোগ হচ্ছে এবং অল্প বয়সে সন্তান ধারণের সংখ্যা কিছুটা হলেও কমছে।

এই কোহর্টের উপাত্ত ব্যবহার করে নারী ক্ষমতায়নের বিভিন্ন দিক স্বামীর সহিংসতাকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা দেখানো হয়।

নারী ক্ষমতায়নের বিভিন্ন দিক স্বামীর সহিংসতাকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। যেমন: সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বেশি থাকলে মানসিক ও যৌন সহিংসতা থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়; মতামত প্রকাশের ক্ষমতা থাকলে যৌন সহিংসতা কমে; নারী শ্রমিকের চলাচলে স্বাধীনতা বেশি থাকলে তার শারীরিক সহিংসতার ঝুঁকি কম।

ফলাফল বলছে, এ ধরণের ক্ষমতায়নের মাত্রা যত বাড়বে, নারী গার্মেন্ট শ্রমিকরা সহিংসতা থেকে তত বেশি সুরক্ষা পাবেন। সেইসঙ্গে ক্ষমতায়ন কোনো একমাত্রিক বিষয় নয়। শুধু আয়ের সুযোগ তৈরি হলেই নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার, সামাজিক সম্মান, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ—সব মিলেই তৈরি হবে প্রকৃত ক্ষমতায়ন।

কিন্তু সহিংসতা থেকে মুক্তি কোথায়? দুই বছরব্যাপী এই গবেষণার শুরুতে প্রায় ৪৮ শতাংশ নারী কর্মক্ষেত্রে মানসিক সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, যা দুই বছর পর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ শতাংশে। অর্থাৎ সহিংসতা ক্রমশ বাড়ছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সহিংসতার শিকার নারীরা প্রায় কেউই আনুষ্ঠানিক সাহায্য চাননি। মাত্র ২১ শতাংশ নারী অনানুষ্ঠানিকভাবে পরিবার বা বন্ধুদের কাছে সহায়তা চেয়েছেন।

অর্থাৎ এখনো এক গভীর সামাজিক বলয় তাদেরকে ঘিরে আছে, যা থেকে বের হওয়া কঠিন। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে প্রশ্ন তোলে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের অন্যতম চালিকাশক্তি যে নারী শ্রমিকেরা, তাদের সামাজিক নিরাপত্তা কি আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছি?

এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়। ক্ষমতায়নের মাত্রা বাড়লে সহিংসতার ঝুঁকি কমে। এই শিল্পে কর্মরত নারীদের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে কর্মক্ষেত্রভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করে দেখা যেতে পারে। বড় বড় পোশাক কারখানাগুলোতে পরিবার পরিকল্পনা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিং সেবা সহজলভ্য করা যেতে পারে। যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে কর্মীদের সচেতনতা বৃদ্ধিও জরুরি।

এ ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলকভাবে সব কারখানায় স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও পারিবারিক সহিংসতা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও আলোচনা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। নারীদের জানাতে হবে, কোথায় গেলে কোন সেবাটি পাওয়া যায়। গার্মেন্টস মালিক ও তাদের সংগঠনগুলো এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে পারে। নারীর স্বাস্থ্য ভালো থাকলে এবং তাদের ওপর সহিংসতার মাত্রা কমানো গেলে তারা আরও মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারবেন। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, দেশের অর্থনীতির চাকা এগিয়ে যাবে।

কর্মক্ষেত্রে প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিশ্চিত করতে তাই সরকার, শিল্পমালিকগোষ্ঠী ও উন্নয়ন সংস্থার যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে সামাজিক সচেতনতা কর্মসূচি ও পুরুষদের অন্তর্ভুক্ত করে আচরণগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে হবে। নারী শ্রমিকরা যেন সহজেই তাদের পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী পেতে পারেন, সেজন্য তারা যেসব এলাকায় বাস করেন, সেগুলোতে নারীবান্ধব দোকান খোলা ও অনলাইনে কেনাকাটার সুযোগও সৃষ্টি করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এ দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর সংগ্রামের অংশ। এ দেশের নারী শ্রমিকরা নিজের ঘামে ও শ্রমে দেশের রপ্তানি আয় বাড়াচ্ছেন, পরিবারকে টিকিয়ে রাখছেন, অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না হলে এই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে তাদের সামাজিক ক্ষমতায়ন যুক্ত করতে পারলেই পরিবর্তন সম্ভব। কারণ, একটি দেশের উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু রপ্তানি আয়ের পরিমাণ নয়, বরং সেই উন্নয়ন অবকাঠামোতে নারীরা কতটা নিরাপদ সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।

এ এস এম রিয়াদ আরিফ, সিনিয়র কনটেন্ট ডেভেলপার, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগ এবং ড. রুচিরা তাবাসসুম নভেদ্‌, ইমেরিটাস সায়েন্টিস্ট, আইসিডিডিআর,বি

Popular

More like this
Related

ল্যারিনের গোলে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশ্বকাপে কানাডার প্রথম পয়েন্ট

প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়ার পর দ্বিতীয়ার্ধে তেতে উঠল কানাডা। তবে...

‘আমাদের পথিকৃৎ ছিলেন আতাউর রহমান’

অভিনেতা ও নির্দেশক আতাউর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ...

জ্বালানি সংকটে ‘এসি-আসক্ত’ সিঙ্গাপুরবাসী বিপাকে

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সিঙ্গাপুর এখন...