সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে গতকাল রাত থেকেই একটি ভিডিও ঘুরেফিরে সামনে আসছে—সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলমের সঙ্গে বাদানুবাদের এক পর্যায়ে এক তরুণকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে পেটাতে শুরু করে পুলিশ।
কিন্তু ওই তরুণের অপরাধ ঠিক কী ছিল? তার অপরাধ ছিল তিনি পুলিশকে প্রশ্ন করেছিলেন!
পুলিশ মূলত সেখানে গিয়েছিলে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে। কিন্তু মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে কি চাইলেই পুলিশ ইচ্ছেমতো যে কাউকে পেটাতে পারে? সংবিধান কিংবা দেশের আইন কি পুলিশকে সেই ক্ষমতা দেয়?
যে তরুণকে এভাবে পেটানো হলো, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। মারধরের পর ওই তরুণকে বলতে শোনা যায় যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে ফোন করবেন। তখন একজন তাকে শান্ত হতে হয়ে ‘স্যারের’ (ডিসি মাসুদ) সঙ্গে কথা বলতে বলেন। পরে ডিসি মাসুদ ওই তরুণের ফোনও নিয়ে নিতে বলেন। এরপর ওই তরুণকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ছেড়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু কেন তাকে এভাবে মারা হলো? তার সঙ্গে ঘটা এই ঘটনার দায় কার? তাকে যে এই তীব্র অপমানের মধ্য দিয়ে যেতে হলো, হেনস্তার শিকার হতে হলো এবং মার খেতে হলো, এর দায় কে নেবে?
এই অভিযানের আরেকটি ভিডিওতে অপর তরুণকে দেখা গেছে খুবই নম্রভাবে পুলিশকে বলছিলেন—‘স্যার, আমি আসলে ওই শুটিংটা দেখছিলাম। সত্যি স্যার।’ কিন্তু ওই টিমে থাকা এক পুলিশ সদস্য তাকে ‘যা’ বলে ধাক্কা দেয় এবং চড় মারে।
একটু আগের তরুণ না হয় পুলিশকে প্রশ্ন করে ‘বেয়াদবি’ করে ফেলেছিলেন। কিন্তু পরের তরুণের অপরাধটা আসলে কী?
একই অভিযানে সাংবাদিকদের পেটানোর অভিযোগও উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী সাংবাদিকের ভাষ্য, পরিচয় দেওয়ার পরেও পুলিশ তাকে বেধড়ক পেটায়। যদিও পুলিশ বলছে, ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হয়েছে।
কিন্তু ঠিক কী ধরনের ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হলো? ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হয়ে থাকলেও পুলিশ এভাবে পেটাবে কেন?
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দেশ, এটা পুলিশি রাষ্ট্র না। পুলিশের কাজ অপরাধ দমন, নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করা। অথচ ওই পুলিশই অভিযানের নামে যদি এলোপাতাড়ি পেটানো শুরু করে, এটা আসলে কি বার্তা দেয়?
গত অন্তত দুদিন ধরে পুলিশকে সক্রিয়ভাবে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে দেখা গেছে। এটা খুব ভালো ব্যাপার। কিন্তু পুলিশ কি আসলেই মাদক প্রতিরোধ করতে চায়? তাহলে শুরুটা করতে হবে কোত্থেকে? ধানমন্ডি লেক কিংবা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে? মাদকের মূলহোতা কাউকে কি পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে এখনো? মাদকের চালান কোন কোন রুট দিয়ে দেশে আসে, সেটা কি পুলিশের অজানা? কারা কারা এর সঙ্গে জড়িত, সেটা তারা কেন খুঁজে বের করছে না? মাদক বিক্রি করছে কারা? তাদের ধরতে পারছে পুলিশ?
মূল জায়গায় হাত না দিয়ে এসব অভিযান কি আদৌ কোনো সুফল বয়ে আনবে? মাদকের মূল জায়গায় পুলিশ কেন কাজ করছে না?
আমরা অবশ্যই চাই দেশ মাদকমুক্ত হোক। আমরা চাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ পাবলিক প্লেসগুলোতে এমন পরিবেশ থাকুক যাতে যেকেউ পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব কিংবা নিজের সন্তানকে নিয়ে সেখানে নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারে। সেখানে পুলিশ থাকতেই পারে। তাদের দেখে মানুষ নিশ্চিন্ত বোধ করবে। কিন্তু পুলিশ কোনোভাবেই কাউকে হয়রানি বা হেনস্তা করতে পারে না, পেটানো তো দূরের কথা।
নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে কেবল একটি নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে নতুন সরকার গঠিত হলো। কিন্তু শুরুতেই যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটে, সেটা কোনো শুভ বার্তা বয়ে আনে না। মনে রাখতে হবে, এই রাষ্ট্রের মালিক কিন্তু জনগণ। তাদের হাতেই সকল ক্ষমতার উৎস। তাই অপরাধ দমনের নামে অযাচিতভাবে জনগণকে এভাবে পেটানো কিংবা হয়রানি বা হেনস্তা করা যাবে না। কেবল পোশাক নয়, বদলাতে হবে পুলিশের প্রচলিত চর্চা, মানসিকতা।
একটা রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর দেশ যখন কেবল সত্যিকারের গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে, তখন অতীতের কোনো দৃষ্টান্ত যেন ফিরে না আসে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে যারা রাষ্ট্রের দায়িত্বে এসেছেন, তাদেরকে যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে।
আর পুলিশকে হতে হবে সত্যিকার অর্থে জনগণের বন্ধু, সেবক। অবশ্যই তারা অভিযানে যাবে। কিন্তু অভিযানে গিয়ে বেপরোয়াভাবে মারধর, হয়রানি বা হেনস্তা নয়, নিয়মমাফিক যা যা করার তাই করতে হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার না করে তাদেরকে জনগণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
এর আগে গত বছরের মার্চে ‘ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’–এর গণপদযাত্রায় বাধা দেওয়া ও লাঠিপেটা করার অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। সেদিনও পুলিশকে শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হতে দেখা গিয়েছিল। গত বছরের ২৭ আগস্ট তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত প্রকৌশলের শিক্ষার্থীরা বুধবার দুপুরে শাহবাগ থেকে মিছিল নিয়ে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার দিকে যাওয়ার সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। সেদিনও পুলিশ এক শিক্ষার্থীর মুখ চেপে ধরেন, পরে যে ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ডিএমপি ছবিটি ‘এআই জেনারেটেড’ বলে দাবি করলেও ঘটনাস্থলে উপস্থিত দ্য ডেইলি স্টারের আলোকচিত্রীসহ অন্যান্য সাংবাদিকরা নিশ্চিত করেছিলেন ছবিটি সত্য ঘটনার। এ ছাড়া আরও কিছু সময় পুলিশের মধ্যে এমন ‘মারমুখী’ আচরণ দেখা গেছে।
নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ অবশ্যই তার দায়িত্ব পালন করবে এবং সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নেবে। কিন্তু সেটা কোনোভাবে এমন আচরণ হবে না, যেখানে সাধারণ মানুষ হেনস্তা বা মারধরের শিকার হয়। পুলিশকে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে। ‘অতি উৎসাহী’ হয়ে কোনো ধরনের কাজ করা যাবে না। অবশ্যই মনে রাখতে হবে, তাদের কাজ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের হয়রানি করা নয়। এভাবে অভিযানের নামে গিয়ে সাধারণ মানুষকে পেটানো বা হেনস্তা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।