`আজ প্রতিরোধ দিবস। খুব সকালে বাড়িসুদ্ধ সবাই মিলে ছাদে গিয়ে কালো পতাকার পাশে আরেকটা বাঁশে ওড়ালাম স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন পতাকা। বুকের মধ্যে শিরশির করে উঠল। আনন্দ, উত্তেজনা, প্রত্যাশা, ভয়, অজানা আতঙ্ক—সবকিছু মিলে একাকার অনুভূতি।’
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তার দিনলিপি `একাত্তরের দিনগুলি’তে ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ সম্পর্কে এই কথাগুলো লিখে রেখেছিলেন।
একইরকম কথা পাওয়া যায় কবি সুফিয়া কামালের দিনলিপিতেও। তিনি ‘একাত্তরের ডায়েরী’তে রাত ১১টায় লিখেছিলেন—
‘২৩শে মার্চ-এ পাকিস্তান দিবস উৎসব এবার স্বাধীন বাঙলা উৎসব বলে পালিত হল। বাংলার ম্যাপ আঁকা পতাকা উড়ল ঘরে ঘরে, অফিস, হাইকোর্ট, হোটেল, গাড়ী, বাড়ীতে। অভূতপূর্ব উত্তেজনায় কাটল। এত আন্দোলন, জয়ী হতেই হবে, এই কথাটা মনে পড়ছে।’
১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ, আসলে কী ঘটেছিল সেদিন—ইতিহাসের খেরোখাতা উল্টে দেখে আসা যাক।
ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ছিল ‘পাকিস্তান দিবস’। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের স্মরণে প্রতিবছর এই দিনে দেশজুড়ে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা উড়ত, চলত সামরিক কুচকাওয়াজ।
কিন্তু একাত্তরের মার্চ ছিল ভিন্ন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল বাংলা সেদিন পাকিস্তান দিবসকে প্রত্যাখ্যান করে পালন করল এক অনন্য ‘প্রতিরোধ দিবস’। তার নির্দেশে এদিন সাধারণ ছুটি পালিত হয়।
ভোর হতেই এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হয় ঢাকা। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ছাত্র-জনতা আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দিবসটির সূচনা করেন। পরিষদের নেতারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন।
এরপরই একে একে সুপ্রিম কোর্ট, সচিবালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ সমস্ত সরকারি-বেসরকারি ভবনে পাকিস্তানের চাঁদ-তারা পতাকার বদলে সগৌরবে উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা।
সকাল ৯টায় আউটার স্টেডিয়ামে ‘জয় বাংলা বাহিনী’র সদস্যরা সামরিক কায়দায় কুচকাওয়াজ ও যুদ্ধের মহড়া প্রদর্শন করেন। পল্টন ময়দানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন পতাকা ওড়ায়। একমাত্র ক্যান্টনমেন্ট, প্রেসিডেন্ট ভবন, গভর্নর হাউস, তেজগাঁও বিমানবন্দর ছাড়া কোথাও পাকিস্তানের পতাকার চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
সকালবেলা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ হাতে বাংলাদেশের পতাকা ও কালো পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় সমবেত কণ্ঠে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি গাওয়া হয়। উপস্থিত আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী সামরিক কায়দায় পতাকাকে অভিবাদন জানায়।
সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ‘বাংলার দাবির প্রশ্নে কোনো আপস নাই। বহু রক্ত দিয়েছি, প্রয়োজনবোধে আরও রক্ত দেবো, কিন্তু মুক্তির লক্ষ্যে আমরা পৌঁছাবই।’
তিনি তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে দেন যে, বাঙালি আর পরাধীন থাকবে না। শান্তির পথে সমাধান না হলে সাড়ে সাত কোটি মানুষ যুদ্ধের মাধ্যমেই তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
প্রতিরোধ দিবসের এই চেতনা শুধু রাজপথেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ছড়িয়ে পড়েছিল ঘরে ঘরে। মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনের ডি-ব্লক, ১২ নম্বর রোডের বাড়িতে তরুণ কবি মেহেরুন্নেসা তার দুই ভাইকে নিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করেন।
সেদিন সকালেই ‘বেগম’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তার শেষ কবিতা ‘জনতা জেগেছে’। সেখানে তিনি লিখেছিলেন,
‘কায়েমি স্বার্থবাদী হে মহল! কান পেতে শুধু শোনো-
সাত কোটি জয় বাঙলার বীর! ভয় করিনাকো কোনো।
বেয়নেট আর বুলেটের ঝড় ঠেলে-
চিরবিজয়ের পতাকাকে দেব, সপ্ত আকাশে মেলে।’
নির্ভীক কলমযোদ্ধা হিসেবে মেহেরুন্নেসা নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন। এই অদম্য দেশপ্রেমই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। পাকিস্তান দিবসকে অস্বীকার করে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো ও প্রতিবাদী কবিতা লেখার কারণে তিনি পাকিস্তানি দোসরদের চোখে চিহ্নিত হয়ে যান। যার করুণ পরিণতি আমরা দেখি চার দিন পর ২৭ মার্চে, ঘাতকরা তাকে ও তার পরিবারকে হত্যা করে।
সেদিনের পত্রপত্রিকাগুলোও ছিল প্রতিরোধের হাতিয়ার। ২৩ মার্চ দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় ‘আজ প্রতিরোধ দিবস’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ‘আজ ২৩শে মার্চ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘স্বাধীন বাংলা দেশ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, জাতীয় শ্রমিক লীগ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান এই দিবসটি ”প্রতিরোধ দিবস” হিসাবে পালন করার আহ্বান জানাইয়াছেন।’
ঢাকা টেলিভিশনের (বর্তমান বিটিভি) বাঙালি কর্মীরাও সেদিন গড়ে তোলেন অভূতপূর্ব প্রতিরোধ। কর্তৃপক্ষের কড়া নির্দেশ ও হুমকি সত্ত্বেও তারা পাকিস্তান দিবসের কোনো অনুষ্ঠান প্রচার করেননি।
এমনকি টেলিভিশনের পর্দায় পাকিস্তানের জাতীয় পতাকার বদলে ভেসে উঠেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। বাজানো হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ‘আমার সোনার বাংলা’। সম্প্রচারিত হয়েছিল ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে রচিত আব্দুল্লাহ আল মামুনের নাটক ‘আবার আসিব ফিরে’।
পরদিন ২৪ মার্চ প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান থেকে উদ্ধৃত করে— ‘আমরা শুনেছি ঐ, মাভৈঃ মাভৈঃ মাভৈঃ’। অর্থাৎ ‘ভয় করো না’।
দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় আগের দিন বঙ্গবন্ধুর দেওয়া বক্তব্য থেকে ‘কর্মপন্থা নির্ধারণের ভার আমার উপর ছাড়িয়া দিন’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার শিরোনাম ছিল ‘পাকিস্থান দিবস নয়— প্রতিরোধ দিবস’।
১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ হয়ে উঠেছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের এক চূড়ান্ত মহড়া। কোনো একটি রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে থেকেই সেই রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার অনন্য নজির তৈরি হয়েছিল সেদিন।