পাকিস্তানের পাঞ্জাবে পুলিশের হাতে ৮ মাসে নিহত ৯০০

Date:

পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের ভাওয়ালপুরের ঘটনা। গত নভেম্বরে সেখানে জুবাইদা বিবির বাড়ি ঘিরে ফেলে দেশটির অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের (সিসিডি) সশস্ত্র সদস্যরা। অভিযোগ—ওরা নিয়ে গেছে সবকিছু। মোবাইল, নগদ টাকা, স্বর্ণের অলঙ্কার।

ধরে নিয়ে যায় জুবাইদা বিবির ছেলে ইমরান (২৫), ইরফান (২৩) ও আদনানকে (১৮)। এছাড়াও, ধরে নিয়ে যায় তার দুই মেয়ের জামাইকে।

এর ২৪ ঘণ্টা পর জুবাইদা বিবির পরিবারের এই পাঁচ সদস্যকে মৃত পাওয়া যায়। পাঞ্জাবের বিভিন্ন জেলায় ভিন্ন ভিন্ন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তাদের মৃত্যু হয়।

পাঞ্জাবে ঘটা এমন আরও অনেক ঘটনার একটি হলো জুবাইদা বিবির ঘটনা।

গতকাল ১৮ ফেব্রুয়ারি আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী—পাকিস্তান মানবাধিকার কমিশনকে (এইচআরসিপি) জুবাইদা বিবি বলেন, ‘ওরা ঘরে ঢুকে সবকিছু তছনছ করে। মূল্যবান জিনিসপত্র, টাকা-পয়সা নিয়ে যায়। ছেলেদের মুক্তির জন্য লাহোর পর্যন্ত গিয়েছিলাম। পরদিন শুনি ওরা সবাই মৃত।’

আইনি ব্যবস্থা চাওয়ায় জুবাইদা বিবিকেও পুলিশ মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তার স্বামী আবদুল জাব্বারের বক্তব্য—ছেলেরা অপরাধী ছিল না। ‘তারা কাজ করতো। বিবাহিত ছিল। তাদের সন্তান আছে,’ যোগ করেন তিনি।

এইচআরসিপির তথ্যে জানা যায়—২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে ৬৭০টি ‘গোলাগুলির’ ঘটনায় ৯২৪ সন্দেহভাজন ব্যক্তির মৃত্যু হয়। সেই বছরের এপ্রিলে সিসিডি গঠন করা হয় সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলার জন্য।

কমিশনের মতে—সিসিডি পুলিশের সমান্তরাল একটি বাহিনীর মতো কাজ করছে। তাদের হাতে ‘বন্দুকযুদ্ধের কারণে’ মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

‘নিরাপদ পাঞ্জাব’ গড়ার আশায় মুখ্যমন্ত্রী মারিয়াম নওয়াজ শরিফের নির্দেশে সিসিডি গঠন করা হয়।

সিসিডি গঠনের পরপরই পুলিশের সঙ্গে ‘অপরাধীদের’ ‘বন্দুকযুদ্ধের’ সংবাদ আসতে শুরু করে। গত ৮ মাসে নয়শোর বেশি সন্দেহভাজন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে দুই পুলিশ নিহত ও ৩৬ জন আহত হওয়ার তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি লাহোরে। সেখানে নিহত হয়েছেন ১৩৯ জন। এরপর, প্রদেশটির ফয়সলাবাদে ৫৫ ও শেখুপুরায় নিহত হয়েছেন ৪৭ জন। বাকিরা অন্যান্য এলাকার।

নিহতদের বিরুদ্ধে চুরি-ডাকাতি, মাদক, হত্যা ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ আছে, বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়।

সব ঘটনার ‘কাহিনি’ প্রায় একই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে একই ধরনের বক্তব্য দেওয়া হয়। পুলিশের ভাষ্য—অন্ধকারে অপরাধীরা প্রথম গুলি ছোড়ে। পুলিশ আত্মরক্ষায় গুলি ছুড়লে অপরাধীদের মৃত্যু হয়।

এইচআরসিপির মতে, প্রায় একই ধরনের বিবরণ পাওয়া যায় সব ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায়। ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন হলেও বিবরণ দেখে মনে হয়, যেন আগের ঘটনার বিবরণের ‘কপি-পেস্ট’ করা হয়েছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে যেসব সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়, সেখানেও সব ঘটনার প্রায় একই রকমের বর্ণনা পাওয়া যায়।

লাহোরের মানবাধিকার আইনজীবী আসাদ জামাল গণমাধ্যমটিকে জানান, পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীর দাবি প্রদেশটিতে অপরাধ কমেছে। তবে জবাবদিহিতার বিষয়ে তিনি হতাশা প্রকাশ করেছেন।

তিনি মনে করেন, অপরাধ কমেছে বললে ‘বিচারবহির্ভূত’ হত্যাকাণ্ডগুলোকে বৈধতা দিতে হয়।

সিসিডির ভাষ্য—তারা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধী চক্রগুলো ‘ভেঙে’ দিচ্ছে। তারা একে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ বলতে নারাজ। তাদের দাবি, ২০২৫ সালের সাত মাসে আগের বছরের তুলনায় অপরাধ ৬০ শতাংশের বেশি কমেছে।

এইচআরসিপির বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত এক দশকে পাকিস্তানজুড়ে প্রায় পাঁচ হাজার ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত দুই হাজার ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হয়েছে পাঞ্জাবে।

দেশটির মোট ২৫ কোটি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বাস এই পাঞ্জাব প্রদেশে। সেই হিসেবে জনবহুল পাঞ্জাবে অপরাধের সংখ্যা বেশি হতে পারে বলে ধরে নেওয়া যায়।

Popular

More like this
Related

ফরিদপুরে বিএনপির ২ পক্ষের সংঘর্ষে আহত ৯

ফরিদপুরের নগরকান্দায় আধিপত্য বিস্তারের জেরে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে...

ইরানের আশেপাশে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে।মার্কিন সংবাদ মাধ্যম দ্য...

ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে ২ বাসের সংঘর্ষে নিহত ২

শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মা সেতুর দক্ষিণ টোল প্লাজা-সংলগ্ন ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের...

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন ১১-১২ মার্চ

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (এসসিবিএ) কার্যনির্বাহী কমিটির ২০২৬–২০২৭ সেশনের...