নির্বাচনের আগে ঘন ঘন ডিসি রদবদল: মাঠ প্রশাসনে আস্থার সংকট

Date:

জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে জেলায় ডিসিদের ঘন ঘন রদবদল মাঠ প্রশাসনে অস্থিরতা ও অস্বস্তি তৈরি করেছে। নির্বাচনের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।

গত ৮ থেকে ১৫ নভেম্বরের মধ্যে সরকার অন্তত ৫৪ জেলায় ডিসি রদবদল করেছে। এর মধ্যে ১০ জন ডিসিকে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলি করা হয়েছে, আর ৪৪ জেলায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে নতুন ডিসি। তবে এসব নিয়োগ বা বদলির অন্তত ছয়টি আদেশ জারির পরপরই বাতিল করা হয়েছে।

সাধারণত উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হন। কিন্তু, গত তিনটি নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্তের ফলে অভিজ্ঞদের সংকট তৈরি হয়েছে। এতে সরকার তুলনামূলক কম অভিজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে সংশয় বাড়ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, চলতি মাসের শুরুতে ব্যাপক রদবদলের আগে গত কয়েক মাসেও একাধিকবার ডিসিদের রদবদল হয়েছে। ডিসিরা জেলা পর্যায়ে অন্তত তিনটি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কাজ করেন। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সমন্বয় ও প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি ভিআইপি প্রটোকল এবং রাজনৈতিক দলের চাপ সামলানোও তাদের কাজের অংশ।

কর্মকর্তাদের অভিযোগ, মন্ত্রণালয় কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়াই এবং অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন মহলের চাপে ডিসি নিয়োগ দিচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, এর ফলে অনেক দক্ষ কর্মকর্তা এখন ডিসি হতে অনাগ্রহী। অন্যদিকে তদবিরের মাধ্যমে তুলনামূলক কম যোগ্যরা নিয়োগ পাওয়ায় সরকারকে বারবার বদলির আদেশ সংশোধন করতে হচ্ছে।

বেশ কয়েকটি জেলায় এই অস্থিরতা স্পষ্ট। যেমন চট্টগ্রামে গত ২১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ডিসি ফরিদা খানমকে প্রত্যাহার করে নওগাঁর ডিসি মোহাম্মদ আব্দুল আউয়ালকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়। কিন্তু দ্রুতই সেই আদেশ বাতিল হয়। এরপর ১৯ অক্টোবর ফেনীর ডিসি সাইফুল ইসলাম চট্টগ্রামের দায়িত্ব নেন, কিন্তু মাত্র ২৪ দিনের মাথায় তাকে সরিয়ে জাহিদুল ইসলাম মিয়াকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মাদারীপুর, নোয়াখালী, বরগুনা, মেহেরপুর, ভোলা ও গাজীপুরেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একই চিত্র দেখা গেছে। নিয়োগ দিয়ে পুনরায় প্রত্যাহার এবং অন্য জায়গায় পদায়নের ঘটনা ঘটেছে এসব জেলায়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন যুগ্ম সচিব বলেন, ডিসি সরকারি কর্মকর্তা হলেও পদটি অনেকটা ‘আধা-রাজনৈতিক’ প্রকৃতির। মাঠ প্রশাসনে যাদের ভালো অভিজ্ঞতা আছে, তাদেরই এ পদে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘নির্বাচনে সাত-আট লাখ কর্মকর্তা জড়িত থাকেন। সবাইকে কি নির্বাচনের দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা সম্ভব? যদি না হয়, তবে কেবল ডিসি ও পুলিশ সুপারদের ক্ষেত্রে কেন এই বিধিনিষেধ?’

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, বিভিন্ন জেলার গুরুত্ব বুঝে ভিন্ন ভিন্ন সক্ষমতার কর্মকর্তার প্রয়োজন হয়। পদায়নের আগে এই মূল্যায়ন জরুরি। সাম্প্রতিক রদবদল দেখে মনে হচ্ছে মন্ত্রণালয়ের এমন মূল্যায়নের অভাব ছিল। সাবেক এই ডিসি বলেন, ‘শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্তহীনতা প্রশাসনের অদক্ষতার পরিচায়ক। সর্বোচ্চ পর্যায়ে যখন দ্বিধা দেখা যায়, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা তখন আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন।’

সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আবদুল আউয়াল মজুমদার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বদলি ও পদায়নের সিদ্ধান্তে সরকারের অটল থাকতে না পারা ‘অযোগ্যতা, অদূরদর্শিতা ও সক্ষমতার অভাব’ নির্দেশ করে। তিনি বলেন, ‘ডিসি পোস্টিং নিয়ে এবার যা ঘটেছে, তাতে নির্বাচন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করাটা অমূলক নয়।’

Popular

More like this
Related

মহিষের সঙ্গে বাঁধা জীবন, বছরের ৯ মাস কাটে পথে পথে

পদ্মার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল থেকে নাটোরের চলনবিল পর্যন্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে...

আমোরিকে বরখাস্ত করল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড

শঙ্কা ছিল অনেক দিন ধরে। শেষ পর্যন্ত তা সত্যি...

খালেদা জিয়া সুস্থ হয়ে ফিরবেন আশা চিকিৎসকদের: ডা. জাহিদ

কোনো ধরনের গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির...

আলো-অন্ধকারের গোলকধাঁধায় নারী ফুটবল লিগ

দীর্ঘ দেড় বছর পর নারী ফুটবল লিগ শুরু হওয়াটা...