ধ্বংসস্তূপে ‘আলো’র প্রদর্শনী

Date:

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে পুড়িয়ে দেওয়া প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘আলো’ শিরোনামে একটি বিশেষ শিল্পপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।

আজ বুধবার সকাল ১১টার দিকে এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের প্রামাণ্যচিত্র তুলে ধরতেই এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।

প্রখ্যাত শিল্পী মাহবুবুর রহমানের কিউরেশনে আয়োজিত এই প্রদর্শনী ১৮ ডিসেম্বরের উগ্রবাদী হামলার ক্ষতচিহ্নকে রূপ দিয়েছে দৃঢ়তা ও প্রতিরোধের বার্তায়। পুড়ে যাওয়া বই, গলে যাওয়া কম্পিউটার মনিটর এবং ভস্মীভূত নিউজরুমের নানা ধ্বংসাবশেষকে প্রদর্শনীর উপকরণে পরিণত করা হয়েছে, যা হামলার ব্যাপকতা এবং প্রকাশনা অব্যাহত রাখার সংকল্পকে প্রতিফলিত করে।

প্রদর্শনীতে ভিডিও ইনস্টলেশন, ভাস্কর্য এবং অগ্নিকাণ্ড প্রত্যক্ষ করা কর্মীদের সাক্ষাৎকার স্থান পেয়েছে। এটি ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা এবং বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রতিশোধপরায়ণ একদল উগ্রবাদী প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা চালায়। সেদিন রাতে হামলাকারীরা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানটকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।

আজকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্পাদক পরিষদ, নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব), বিভিন্ন গণমাধ্যম সংগঠনের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী নেতা, শিল্পী, সাহিত্যিক ও কবিসহ বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান সাংবাদিক সমাজের দীর্ঘদিনের বিভাজনের অবসান ঘটানোর আহ্বান জানান এবং ভবিষ্যতে সংবাদমাধ্যমের ওপর যেকোনো হামলার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

পত্রিকার স্লোগান ‘সত্যই সাহস’-এর উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সত্যভিত্তিক সাংবাদিকতাই সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা।’

‘তথ্য সঠিক ও সত্য হলে আমরা অনেক বিপদ থেকেই মুক্ত থাকতে পারি,’ বলেন তিনি।

মতিউর রহমান বলেন, গত ২০–৩০ বছর ধরে সাংবাদিকরা একটি ‘কথিত বিভাজন’-এর শিকার এবং এখন সময় এসেছে তা অতিক্রম করার।

‘আমরা চাই এই বিভাজনের অবসান হোক। ভবিষ্যতে যেকোনো সাংবাদিক বা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান হামলা বা ঝুঁকির মুখে পড়লে, তাদের মতাদর্শ বা চিন্তা যাই হোক, আমরা পাশে দাঁড়াব,’ বলেন তিনি।

তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার চাপের মুখে পড়লেও নয়াদিগন্ত, সংগ্রাম, যায়যায়দিন ও আমার দেশ-এর মতো পত্রিকার সম্পাদকরাও গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন।

‘আমরা তখনও এসব ঘটনার নিন্দা জানিয়েছি, সম্পাদক পরিষদ ও নোয়াব যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। সামনে একে অপরকে রক্ষায় আমরা আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল থাকব,’ যোগ করেন তিনি।

দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম হামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে উসকানিদাতা ও হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনতে নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘আমি নতুন সরকারের কাছে অনুরোধ করব, তারা যেন গভীরভাবে তদন্ত করে, যাতে যারা উসকানি দিয়েছে এবং যারা হামলা বাস্তবায়ন করেছে, তাদের জনগণের সামনে আনা যায়।’

ঘটনাটির প্রকৃতি দেখে এটি আকস্মিক ছিল না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অগ্নিসংযোগের সময় ডেইলি স্টার ভবনের ছাদে ২৭ জন কর্মীর আটকে পড়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ঘন ধোঁয়ার মধ্যে শ্বাস নিতে তাদের সংগ্রাম করতে হয়েছিল। তবু প্রকাশনা বন্ধ করেননি তারা।

‘পরদিন সকাল ১১টায় আমি অফিসে এলে সবাই বলল, মাহফুজ ভাই, আমরা পত্রিকা বের করব। আমি বললাম সব তো পুড়ে গেছে। তারা বলল, বাসা থেকে কাজ করব। এটা সাংবাদিকতার প্রতি নিষ্ঠা ও সাহসের প্রতীক,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘দুটি পত্রিকায় অগ্নিসংযোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি ছিল মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে আগুন, স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আগুন এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে আগুন।’

নোয়াব সভাপতি এ কে আজাদ ভবিষ্যতে সংবাদমাধ্যম দমনের চেষ্টা মোকাবিলায় প্রকাশক ও সম্পাদকদের মধ্যে ‘ইস্পাত কঠিন ঐক্য’র আহ্বান জানান।

সমকালের প্রকাশক এ কে আজাদ বলেন, ‘এটাই শেষ হামলা নয়, আরও আসবে। কিন্তু প্রকাশক, সম্পাদক ও সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে আমরা প্রতিরোধ করতে পারব।’

সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ সংবাদপত্র কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়াকে যে কোনো সমাজের জন্য ‘নিকৃষ্টেরও নিকৃষ্টতম’ ঘটনা বলে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বে খুব খারাপ বার্তা গেছে যে, এ দেশে সংবাদপত্রের অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়।’

বিশ্বে এমন ধ্বংসযজ্ঞ বিরল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জাতীয় প্রেসক্লাব সভাপতি হাসান হাফিজ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান রক্ষায় ব্যর্থতার জন্য পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, ‘রূপান্তরকালে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের এই ব্যর্থতার দায় নিতে হবে।’

সাম্প্রতিক সহিংসতার ছাই থেকে দেশকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠারও আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।’

তিনি বলেন, ‘দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আমরা দেখেছি, কঙ্কালেরও আত্মা থাকতে পারে।’

একইসঙ্গে সাংবাদিকদের যেকোনো ধরনের ‘ফ্যাসিবাদকে আলিঙ্গন’ করা থেকেও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

Popular

More like this
Related

সড়কে সমঝোতার ভিত্তিতে টাকা নেওয়া চাঁদা নয়, বাধ্য করা হলে চাঁদা: সড়ক পরিবহন মন্ত্রী

সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন,...

ছবিতে পুরান ঢাকার চকবাজারে ইফতারের রঙিন ভুবন

রমজানের প্রথম দিনেই পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজার যেন ফিরে...

এপস্টিন কেলেঙ্কারি: ভারতের এআই সম্মেলন থেকে সরে দাঁড়ালেন বিল গেটস

কুখ্যাত এপস্টিন বিতর্কের জেরে দিল্লিতে আয়োজিত এআই সম্মেলন থেকে...

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উন্নয়নে পরিকল্পনা ও সুপারিশ তৈরির নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যুগোপযোগী উন্নয়নে পরিকল্পনা ও...