বেকার তরুণরা আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছেন মাটিতেই। জীবিকা নির্বাহের জন্য আবারও তারা কৃষির দিকেই ঝুঁকছেন।
যেখানে উচ্চশিক্ষাকে সাধারণত কৃষিকাজ থেকে বেরিয়ে আসার পথ হিসেবে দেখা হয়, সেখানে বাংলাদেশ ভিন্ন এক গল্প তুলে ধরছে। শিক্ষার হার বাড়লেও কৃষিকাজ থেকে সরে যাওয়ার প্রত্যাশিত প্রবণতা উল্টো হয়ে গেছে।
মন্থর শিল্পখাতে জায়গা করে নিতে না পেরে অনেক তরুণ আবারও গ্রামীণ শিকড়ে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
এমন বৈপরীত্যটি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নির্বাহী বোর্ডের প্রস্তুত করা একটি প্রতিবেদনে। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ বিষয়ক পরামর্শ শেষে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি সম্পন্ন করা হয় এটি।
কাগজে-কলমে বাংলাদেশ শিল্পায়নের দিকে যাচ্ছে বলেই মনে হয়। গত এক দশকে অর্থনীতিতে উৎপাদন খাত প্রায় ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি মূলত ‘চাকরিহীন’।
উৎপাদন ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান বাস্তবে যথাক্রমে ২ দশমিক ২ ও ২ দশমিক ৬ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। এতে করে কাঠামোগত বৈপরীত্য তৈরি করেছে। অর্থনীতি শিল্পায়িত হচ্ছে, কিন্তু শ্রমশক্তি উল্টোভাবে শিল্পবিমুখ হচ্ছে।
একই সময়ে অর্থনীতিতে কৃষির অংশ ৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ পয়েন্ট কমলেও এই খাতে কর্মসংস্থান ৪ দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।
গত এক দশকে সব খাতেই শিক্ষার হার বেড়েছে। কিন্তু শ্রমবাজার সেই গতির সঙ্গে তাল মিলাতে পারেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান শিল্প কাঠামোর মধ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টির তুলনায় শিক্ষার হার দ্রুত বেড়েছে। ফলে বাড়তে থাকা উচ্চশিক্ষিত কর্মীর সংখ্যা, বিশেষ করে তরুণদের জন্য উচ্চমানের চাকরির সুযোগ খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষার হার বৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থানের কাঠামোগত পরিবর্তনের উল্টো প্রবণতার এই বৈপরীত্যই দেখায় যে মানবসম্পদ উন্নয়ন উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে স্থানান্তরে রূপান্তরিত হয়নি।
আইএমএফ কৃষিকে বর্ণনা করেছে এভাবে, এটি বেকারত্বের চাপ কমানোর একটি বাফার হিসেবে কাজ করছে, অতিরিক্ত শ্রমশক্তি শোষণ করছে। তবে এর ফলে উৎপাদনশীলতা স্থায়ীভাবে কম থাকছে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈষম্য স্পষ্ট। মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেটের নিচে শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা ব্যক্তিদের বেকারত্বের হার ৩ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ, আর উচ্চ ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে তা ৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের মধ্যে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার ভয়াবহভাবে ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে—যা কম শিক্ষিতদের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি।
সামগ্রিক বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে কম—৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। তবে তরুণদের মধ্যে গভীর সংকট দেখা যাচ্ছে। তরুণদের বেকারত্বের হার ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ—যা জাতীয় গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। শহরে ১৩ দশমিক ২৭ শতাংশ তরুণ বেকার, যেখানে গ্রামে এই হার ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
নারীরা আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। উচ্চশিক্ষিত নারীদের বেকারত্বের হার ১৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা তাদের সমপর্যায়ের পুরুষের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
আইএমএফ উল্লেখ করেছে, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব ‘প্রায় এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ’ এবং এটিকে ‘তরুণ ও উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের জন্য উদ্বেগজনকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া শ্রমবাজার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, এর প্রভাব কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যানের বাইরেও অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত।
তিনি বলেন, ‘উচ্চশিক্ষিত তরুণরা প্রাতিষ্ঠানিক খাতে চাকরি খোঁজেন, আর বাকিরা অনানুষ্ঠানিক খাতে চলে যান। আর বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শিল্পখাত থেকে বিচ্ছিন্ন। যে ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষার্থীরা বের হচ্ছেন তা দিয়ে শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। তৈরি পোশাক খাতে এখনও দক্ষ শ্রমিকের অভাব। অথচ আমাদের এত তরুণ বেকার।’
তিনি উল্লেখ করেন, সময়ের সঙ্গে শিক্ষার মানও কমেছে।
সতর্ক করে তিনি বলেন, উৎপাদন খাতে স্বল্প দক্ষতার কাজগুলো অটোমেশনের কারণে কমে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষাকে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না করলে এই খাতে কর্মসংস্থান আরও কমবে।
কৃষির পরিবর্তিত ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে কৃষিখাতে নারীকেন্দ্রিকতা বেড়েছে। অশিক্ষিত নারীরা সেই জায়গা পূরণ করছেন, শিক্ষিত পুরুষরা সরে গেছেন।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ডিস্টিংগুইসড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান আরেকটি সীমাবদ্ধতার দিকে ইঙ্গিত করেন—বৈচিত্র্যের অভাব।
তিনি বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রবৃদ্ধি হলেও সেখানে কম কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। যদি দ্রুত সম্প্রসারণ না হয় তাহলে কৃষিখাতও যথেষ্ট সহযোগিতা করতে পারবে না।’
তিনি আরও বলেন, শিল্পখাতে দ্রুত বৈচিত্র্য না আসায় সীমিত সংখ্যক চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা করছে ক্রমবর্ধমান শ্রমশক্তি।
‘এই অসন্তোষই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি কারণ ছিল’, যোগ করেন তিনি।
মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, প্রবাসী কর্মসংস্থান এতটা বাড়বে না যে ক্রমবর্ধমান বেকার তরুণরা সেখানে জায়গা করে নেবে। তাই দেশীয় খাতের দিকেই দৃষ্টি ফেরাতে হবে।
তিনি বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ বাজারে জোর দিতে হবে। আর এর জন্য বেসরকারি খাতে প্রণোদনা দিতে হবে।’
আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত শিক্ষাগ্রহণ এবং শিক্ষা ও পেশার অমিলের বিষয়টি বিশেষ করে কৃষি ও উৎপাদন খাতে বেশি স্পষ্ট। বেকারত্বে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যও উল্লেখযোগ্য।
এতে বলা হয়েছে, মূল অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে শিল্প কাঠামোর উন্নয়ন, উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং উচ্চমানের কর্মসংস্থান বাড়াতে বৈচিত্র্য বাড়ানো।
একইসঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ গড়ে তোলা জরুরি। উন্নত দক্ষতার প্রশিক্ষণ, যৌথভাবে নকশা করা শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং স্টেম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) শিক্ষা শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে কর্মশক্তির সক্ষমতাকে আরও ভালোভাবে সামঞ্জস্য করতে পারে।
আইএমএফ প্রতিবেদনে সর্বশেষে বলা হয়েছে, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অন্যান্য সমমানের উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহ খুবই কম, যা প্রযুক্তি স্থানান্তর, শিল্প বৈচিত্র্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সীমিত করছে।
‘এফডিআই বাড়ালে অর্থনীতিতে নতুন উচ্চমূল্যের বাজার যুক্ত হবে এবং বিশেষ করে দক্ষতানির্ভর খাতে তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের উৎস তৈরি হবে।’