নীলফামারী ও দিনাজপুর জেলার তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতাধীন প্রায় ১০ হাজার হেক্টর বোরো জমিতে চলতি মৌসুমে সেচ প্রদান অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
দিনাজপুর শাখা সেচ খালের একটি অংশ ধসে পড়ার পর মেরামত কাজ বন্ধ থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
দেশের সর্ববৃহৎ তিস্তা সেচ প্রকল্পের এই খাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নীলফামারী ও দিনাজপুর জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় বোরো ধান চাষ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। স্থানীয় কৃষকদের বাধার কারণে খাল মেরামত কাজ বন্ধ থাকায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
গত ২০ জানুয়ারি নীলফামারী জেলার সিংদই গ্রামে দিনাজপুর শাখা সেচ খালের প্রায় ৬০ মিটার অংশ হঠাৎ ধসে যায়। এতে আশপাশের গ্রামের প্রায় ৫০০ একর জমির রবি শস্য পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়।
এর আগে চলতি মাসের ১০ তারিখে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) তিস্তা সেচ প্রকল্পে সেচ কার্যক্রম শুরু করে খালে পানি ছেড়েছিল। তবে পানির চাপ সহ্য করতে না পেরে ১০ দিনের মধ্যেই খালটি ভেঙে পড়ে।
খালের ভাঙা অংশ দিয়ে দ্রুত পানি বেরিয়ে যাওয়ায় অবশিষ্ট ফসল রক্ষায় পাউবো উজানের চাঁদেরহাট গ্রামের রেগুলেটরের সব গেট বন্ধ করে দেয়। এতে ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ দিনাজপুর শাখা সেচ খালটি সম্পূর্ণ পানিশূন্য হয়ে পড়ে।
বুধবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, ভাঙা অংশের সামনে ৩–৪ ফুট উঁচু করে বালুভর্তি জিও ব্যাগ বসানো হয়েছে এবং কিছু বালু ফেলা রয়েছে। তবে মেরামতের বড় অংশ এখনো বাকি।
স্থানীয়রা জানায়, ঘটনার পরদিনই পাউবো মেরামত কাজ শুরু করেছিল। কিন্তু কিছু কাজের পর একদল ব্যক্তি নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক দাবি করে ফসলহানির ক্ষতিপূরণ চেয়ে কাজ বন্ধ করে দেন।
পাউবো জানায়, কৃষকদের ফসলহানির ক্ষতিপূরণ দেওয়ার এখতিয়ার তাদের নেই। এটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দায়িত্ব। এ নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানের কারণে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
উত্তরাশশী গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান (৩৫) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সেচ খালের পানিতে আমার চার বিঘা জমির আলু পচে গেছে। আবাদ করতে এনজিও থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঋণ নিয়েছি। এখন ফসল না থাকায় কীভাবে ঋণ শোধ করব বুঝতে পারছি না। পাউবোর কাছে ফসলের ক্ষতিপূরণের জোর দাবি জানাই।’
সিংদই গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম (৫০) জানান, তার ১০ বিঘা জমির ভুট্টা, সরিষা, গমসহ অন্যান্য রবি শস্য নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষতিপূরণ না পেলে সংসারের খরচ চালাতে জমি বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকবে না বলেও জানান তিনি।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা জানান, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পাউবো তাদের সমস্যা সমাধানে কোনো আশ্বাস না দেওয়ায় বাধ্য হয়েই তারা মেরামত কাজ বন্ধ করেছেন।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, সেচ খালের দুই পাশে কৃষকেরা বোরো চারা রোপণের জন্য জমি প্রস্তুত করে সার ছিটিয়ে রেখেছেন। কিন্তু পানি না থাকায় তারা উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছেন।
কামারপাড়া গ্রামের কৃষক জোবেদ আলী (৬০) বলেন, ‘আমার বীজতলায় বারো বিঘা জমিতে রোপণের জন্য বোরো চারা তৈরি করেছি। সেচের পানি না পাওয়ায় এখনো রোপণ করতে পারিনি। বয়স বাড়লে চারার উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাবে, কারণ অঙ্কুরোদগমের ২৮–৩০ দিনের মধ্যে রোপণ করা দরকার।’
এ বিষয়ে পাউবোর নীলফামারী ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা আন্তরিকভাবে খালের বিধ্বস্ত অংশ মেরামতের চেষ্টা করছি। ২–১ দিনের মধ্যে সেচ সুবিধা চালু করতে পারব।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের এ মৌসুমে সার্ভিস চার্জ ছাড়াই সেচের পানি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, তিস্তা সেচ প্রকল্প উন্নয়নে সরকারের ১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এর আওতায় দিনাজপুর শাখা সেচ খালের সংস্কার ও পরিমার্জনের কাজ ৮৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।