ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোতে হামলা পূর্বপরিকল্পিত: স্টার-ডিসমিসল্যাব বিশ্লেষণ

Date:

দ্য ডেইলি স্টার ও ডিসমিসল্যাব ৩ হাজার ৬৪টি ফেসবুক পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখেছে, গত ডিসেম্বর দুই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা মোটেই আকস্মিক ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন, এমনকি মাসজুড়ে হুমকি আসছিল, পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল। এটি কেবল ঢাকায় দুটি সংবাদপত্র ও দুটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার গল্প নয়। ঘটনাপ্রবাহে এটি আগেই অনুমেয় ছিল এবং ভার্চুয়ালি উসকানি বাস্তবে সহিংসতায় রূপ নেয়। এর সুযোগ করে দিয়েছিল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ ও সহিংসতা প্রতিরোধে সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়া।

 

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি সংবাদপত্র—দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো এবং ঢাকার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানটের কার্যালয়ে হামলা চালায় ও আগুন ধরিয়ে দেয় সংঘবদ্ধ মব। পরদিন সন্ধ্যায়—১৯ ডিসেম্বর, আরেকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

ওই বছরের ১৩ থেকে ১৯ ডিসেম্বরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ৩ হাজার ৬৪টি ফেসবুক পোস্ট বিশ্লেষণ করে দ্য ডেইলি স্টার ও ডিসমিসল্যাব অনলাইন উসকানি ও বাস্তবে সহিংসতার স্পষ্ট যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে। কয়েকদিন ধরে জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার ও ডানপন্থী অ্যাকটিভিস্টরা দুটি সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ বয়ান তৈরি করতে থাকেন। যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবনে হামলা ও এবং আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।

হামলার সময় ফেসবুকে একের পর এক পোস্টে আসা নির্দেশনা অনুযায়ী মব জড়ো হয়, হামলা চালায় এবং ফেসবুকে নির্দেশনা দেখে তারা এক জায়গায় অন্য জায়গায় গিয়ে সহিংসতা চালায়।

এসব তথ্য-প্রমাণ ইঙ্গিত করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে এসব হুমকি দৃশ্যমান ছিল, এমনকি ফেসবুকে এসব সহিংসতার দৃশ্য সরাসরি প্রচার করা হলেও এর বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মেটা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ‘আজ রাতেই ’, ‘এখনই’ এবং ‘জয় বাংলা করে দিতে হবে’—ফেসবুকে এ ধরনের বাক্যাংশ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এসব পোস্টে সংবাদপত্র দুটিকে ‘ভারতের দালাল’ ও ‘রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

রাতভর সহিংসতার আহ্বান আসতে থাকে। চিহ্নিত ও প্রতিরোধ করার কেউ ছিল না। এতে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতার গুরুতর দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। একইসঙ্গে তাৎক্ষণিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমন কনটেন্ট শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে মেটার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে।

উসকানি

শেয়ার হওয়া পোস্ট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৫ ডিসেম্বর প্রথম সহিংসতার আহ্বান জানানো হয়। ‘ভারতবিরোধী চূড়ান্ত আন্দোলন’ নামে ৬৮ হাজার সদস্যের একটি ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট হয়েছিল। পোস্টটি করেছিলেন কক্সবাজারের একজন ব্যবহারকারী।

পোস্টটিতে দেখা যায়, প্রথম আলো ভবনের একটি ছবির ওপর লাল ক্রস চিহ্ন। ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘এরা হলো বাংলাদেশে ভারতের পাওয়ার হাউজ। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার সহ সকল ভা/রতীয় দালালদের জয় বাংলা না করা পর্যন্ত এই দেশ নিরাপদ হবে না।’

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি ব্যবহৃত হয়ে এলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস বা নির্মূল কিংবা ধ্বংস করে দেওয়া অর্থে ‘জয় বাংলা করা’ ব্যবহার করছেন অনেকে।

একই দিন ‘ভারতবিরোধী সৈনিক’ নামে আরেকটি ফেসবুক গ্রুপে আরেকটি পোস্ট করা হয়। গ্রুপটির সদস্য সংখ্যা লক্ষাধিক। একজন মডারেটর মো. ফখরুল ইসলাম পোস্টটি করেছিলেন। সেখানে লেখা ছিল, ‘প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অফিস পুড়িয়ে দাও।’

 

১৭ ডিসেম্বর রাত থেকে সরাসরি সহিংসতার আহ্বান তীব্র হতে শুরু করে। হামলার প্রায় ৩২ ঘণ্টা আগে থেকে শুরু হয়ে সারা দিন চলতে থাকে।

প্রায় সব পোস্টই এই একই রকম প্রোফাইল থেকে করা হয়—ব্যক্তিগত তথ্য বা নিয়মিত কার্যক্রম প্রায় নেই বললেই চলে। অনলাইনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য পোস্টই তাদের প্রধান কাজ।

সহিংসতা শুরু, আরও তীব্র উসকানি

২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর থেকেই ঢাকা ও আশেপাশের পরিস্থিতি থমথমে ছিল। রাত সাড়ে ৯টা ৪০ মিনিটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই আগেবঘন পোস্ট দেন।

অল্প সময়ের মধ্যেই বিক্ষোভকারীরা ঢাকার শাহবাগের দিকে মিছিল নিয়ে যেতে শুরু করে। সেখান থেকেই সহিংসতার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৮ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১৯ ডিসেম্বর রাত ১টার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতার আহ্বান ছিল সবচেয়ে বেশি। ঠিক সেই সময়ে মব জড়ো হতে শুরু করে, হামলার প্রস্তুতি নেয় এবং প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার ভবনে সরাসরি হামলা চালায়।

১৮ ডিসেম্বর রাত সোয়া ১১টার দিকে কিছু মানুষ কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। পরবর্তী ৩০ মিনিটে মব ক্রমেই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং রাত পৌনে ১২টার নাগাদ হামলা শুরু হয়।

প্রথম আলোর কার্যালয়ের সামনে মব জড়ো হওয়ার আগে রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে ফেসবুকে অন্তত নয়টি পোস্ট করা হয়, যেখানে সরাসরি সহিংসতার আহ্বান জানানো হয়েছে।

একটি পোস্টে লেখা ছিল, ‘প্রথম আলো জ্বালিয়ে দাও, দিল্লি স্টার গুড়িয়ে দাও, উড়িয়ে দাও ভারতীয় এম্বাসী, ভারতের আধিপত্য’। পোস্টটি ‘Pinaki Bhattacharya – পিনাকী ভট্টাচার্য’ নামে ১ লাখ ৫৭ হাজার সদস্যের একটি ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট করা হয়েছিল। এমন একটি প্রোফাইল থেকে সেটি করা হয়েছে, সেখানে নিয়মিত কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি।

পিনাকী ভট্টাচার্য একজন বাংলাদেশি নাগরিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার। বর্তমানে তিনি ফ্রান্সে অবস্থান করছেন এবং ফেসবুকে তার অনুসারী সংখ্যা ৩১ লাখ। তিনি ওই গ্রুপের অ্যাডমিন নন। সহিংসতার সময় কোনো উসকানিমূলক পোস্টও তিনি করেননি। যদিও দীর্ঘদিন ধরে তিনি দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কড়া সমালোচক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে দুটি পত্রিকাকেই ভারতপন্থী আখ্যা দিয়ে আসছেন।

রাত ১১টা থেকে পৌনে ১২টার মধ্যে উসকানির মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়। এই সময়ে দুই সংবাদপত্রের ওপর সরাসরি হামলার আহ্বান জানিয়ে আরও ৩৪টি পোস্ট করা হয়। দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য অনেক পোস্টকারী তাদের সব অনুসারীকে ট্যাগ করেন বা ‘#highlight’ এর মতো হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করেন।

সাকিব আহমেদও পোস্টদাতাদের একজন। মব জড়ো হতে শুরু করলে তিনি ‘ভারতবিরোধী চূড়ান্ত আন্দোলন’ গ্রুপে এবং ‘ভারতবিরোধী সৈনিক’ গ্রুপে পোস্ট করেন।

তার পোস্টে লেখা ছিল, ‘প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, কালবেলা! কালকেই এদের শেষ দিন!!’

দুটি গ্রুপ মিলিয়ে সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার।

২১ বছর বয়সী সাকিব বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক শিক্ষার্থী। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমি দেখেছিলাম মানুষ রাস্তায় নেমেছে। এরপর কী করবে সেটাও বুঝতে পেরেছিলাম। তাই খবর ছড়িয়ে দিতে পোস্টটি করেছিলাম।’ তিনি আরও জানান, পোস্টটি দিতে তাকে কেউ নির্দেশ দেয়নি।

উসকানিদাতারা

প্রথম আলোর ওপর হামলা শুরুর ১৫ মিনিট পর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাংলাদেশি ইনফ্লুয়েন্সার ইলিয়াস হোসাইন সেই রাতে প্রথম সরাসরি সহিংসতার আহ্বান জানান। মধ্যরাতে তিনি ফেসবুকে লেখেন, ‘সবাই প্রথম আলোয় আসেন। অর্ধেক কাজ শেষ বাকিটা আপনারা করেন’। মাত্র এক ঘণ্টায় পোস্টটিতে প্রায় ৭৭ হাজার প্রতিক্রিয়া আসে।

এক সময়ের সাংবাদিক ইলিয়াস পাঁচ মিনিট পর আরেকটি পোস্ট দেন। সেখানি তিনি লেখেন, ‘প্রথম আলোর একটা ইটও যেন না থাকে।’ পরবর্তী এক ঘণ্টায় পোস্টটিতে ৯৫ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

একই সময়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত মব প্রথম আলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

এর পাঁচ মিনিট পর আরেকটি পোস্টে তিনি লেখেন, ‘প্রথম আলোকে বাঁচাতে ওদের অফিসের সামনে সেনাবাহিনী আসলে ওদেরকে উচিত জবাব দেয়ার অনুরোধ থাকলো।’ এই পোস্টটি আগের প্রতিটি পোস্টের চেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া পায়।

১৯ ডিসেম্বর রাত ১২টা ২০ মিনিটে তিনি পোস্ট করেন, ‘প্রথম আলো ডান, ডেইলি স্টারে চলে আসেন।’

ওই পোস্টের চার মিনিটের মধ্যে দ্য ডেইলি স্টারের কর্মীরা ভবন থেকে বেরিয়ে যেতে নিচে নামেন। কিন্তু ততক্ষণে মব জড়ো হয়ে ভবনে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করছিল। ডেইলি স্টারের কর্মীরা দ্রুত আবার উপরে উঠে ছাদে আশ্রয় নেন। প্রচণ্ড ধোঁয়ার মধ্যে তারা ভোররাত ৪টা পর্যন্ত আটকে ছিলেন। ওই পোস্টটি এক ঘণ্টায় ৭৭ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

পরবর্তী তিন ঘণ্টায় ইলিয়াস আরও চারটি পোস্ট দেন (, , , ) যার প্রতিটিতেই আরও সহিংসতার আহ্বান জানানো হয়। এর মধ্যে একটিতে মিথ্যাভাবে দাবি করা হয়, ভবনের ভেতরে কোনো কর্মী আটকে নেই, সবাই ইতোমধ্যে বেরিয়ে গেছেন। চারটি পোস্ট মিলিয়ে ২৬ লাখ ৭০ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া পড়ে।

মধ্যরাত থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারে হামলার সময়কালে সহিংসতার সরাসরি আহ্বান আরও তীব্র হয়। এই সময়ে ইলিয়াসের পোস্ট বাদে হামলার আহ্বান বা তা উদযাপন করে ৮৭টি পোস্ট দেওয়া হয়, যেখানে ৩০ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া আসে।

অন্য প্রভাবশালী ব্যবহারকারীরাও একই ধরনের ভাষায় সহিংসতা উসকে দেন।

জিয়া সাইবার ফোর্সের সাবেক সহসভাপতি মীর জাহান ১৯ ডিসেম্বর রাত ১টায় পোস্ট করেন, ‘তালিকা খুব বড় নয়, আরও থাকলে যোগ করো। ১. ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টার—ধানমন্ডি। ২. ছায়ানট, ধানমন্ডি। ৩. উদীচী। ৪. প্রথম আলো। ৫. ডেইলি স্টার। এগুলো “জয় বাংলা” না করা পর্যন্ত তাদের লাফালাফি বন্ধ হবে না।’

১৯ ডিসেম্বর দুপুর দেড়টা নাগাদ উদীচীর কার্যালয়ে হামলা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে পোস্টটিতে ৮ হাজার ৫০০টির বেশি প্রতিক্রিয়া পড়ে এবং ৩০০ বারের বেশি শেয়ার হয়।

 

এছাড়া ব্যঙ্গ ও মিম প্রকাশের দাবি করা বিভিন্ন পেজও দুই সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সহিংসতার আহ্বান জানায়। ‘আনোয়ার টিভি’ নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক ফেসবুক পেজ প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের ছবি সংবলিত একটি ফটোকার্ড পোস্ট করে লেখে, ‘দেশে ভারতের সবচেয়ে বড় দুই আধিপত্য প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার।’

এই অনলাইন বিদ্বেষ প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি করে। টেলিভিশন ফুটেজে দেখা যায়, দ্য ডেইলি স্টারের দিকে যাওয়ার চেষ্টাকালে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো আটকে দেয় মব। ফলে সেগুলোকে ফিরে যেতে হয় এবং জ্বলতে থাকা ভবনের ভেতরে ২৯ জন সাংবাদিক ও কর্মী ভবনের ভেতরে আটকে থাকে।

১৯ ডিসেম্বর রাত প্রায় ১২টা ৩৫ মিনিটে হামলাকারীরা দ্য ডেইলি স্টার ভবনের স্টিলের গেট ও কাচের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরে তারা কম্পিউটার ও সরঞ্জাম ভাঙচুর করে, মূল্যবান সামগ্রী লুট করে এবং তিনটি তলায় আগুন ধরিয়ে দেয়।

প্রথম আলোতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে।

রাত পৌনে ২টার দিকে কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনের কাছে ফায়ার সার্ভিস একটি ইউনিট পৌঁছায়। কিন্তু মবের বাধায় তাদের ফিরে যেতে বাধ্য হতে হয়। মবের একটি অংশ দ্য ডেইলি স্টারের দিকে এগোলে বাধা কিছুটা কমে। তখনই যৌথ বাহিনী এলাকাটি ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয় এবং প্রায় তিন ঘণ্টা পর রাত আড়াইটার দিকে ফায়ার সার্ভিস আগুন নেভানোর কাজ শুরু করতে পারে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টারকে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের (এফএসসিডি) পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘সেদিন ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে আমরা নানা বাধার মুখে পড়েছিলাম। তবে সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও উপস্থিত অন্যান্যদের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভাতে ও উদ্ধার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সক্ষম হই।’

হামলার সময় আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে কয়েকজন কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে জানান, ‘হস্তক্ষেপ’ করার কোনো নির্দেশনা তারা পাননি।

লক্ষ্য পরিবর্তন, বয়ানেও পরিবর্তন

দ্য ডেইলি স্টারের ওপর হামলার দুই ঘণ্টা পর এবং প্রথম আলোতে আগুন দেওয়ার তিন ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধানমন্ডির ছায়ানট ভবনকে পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা শুরু হয়। ছায়ানটে হামলায় আরও অন্তত ১৫ বার (, , ) আহ্বান করা হয় এবং ১৯ ডিসেম্বর রাত প্রায় দেড়টার দিকে প্রতিষ্ঠানটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে ভবনটি গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১৮ ডিসেম্বর রাত ১১টা ৩৮ মিনিটের মধ্যেই অনলাইনে ছায়ানটের নাম লক্ষ্যবস্তু হিসেবে প্রকাশিত হয়। ফারুক খান নামে এক ব্যবহারকারীর পোস্টে চারটি স্থানের নাম—প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টার—ঠিকানাসহ উল্লেখ করে লেখেন, ‘আজ রাতেই উপযুক্ত সময়! টার্গেট মিস করলে আবারও পস্তাতে হবে, অন্য কোনো এক হাদিকে হারানো পর্যন্ত।’

ফারুকের প্রোফাইলে ‘দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিন’ ব্যাজ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যক্তিগত তথ্য ছিল না। তার পোস্টটি অন্য ব্যবহারকারীরা হুবহু কপি করে শেয়ার করেন (, )। সেই সময় অন্তত একটি সংবাদপত্রে হামলা চলছিল।

সহিংসতা শুরুর পর থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত ৯৫৮টি স্বতন্ত্র ফেসবুক পোস্টে সরাসরি হামলার আহ্বান জানানো হয় বা হামলা উদযাপন করা হয় (, , , , )। সেগুলোতে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৪৫৫টি লাইক, শেয়ার ও মন্তব্য পড়ে। প্রায় ১০ লাখ সদস্যের আটটি (, , , , , , , ) ফেসবুক গ্রুপে ৮৮টি পোস্টে (, , , ) সহিংসতা উসকে দেওয়া বা তার পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়, যার কোনোটি রিয়েল টাইমে সরানো হয়নি।

চতুর্থ প্রধান লক্ষ্য জাতীয় প্রেসক্লাবের কাছে তোপখানা রোডে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ১৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টার আগে হামলা হয়নি। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আগুন লাগে এবং ৩০-৪০ মিনিট পর তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ভবনটির ব্যাপক ক্ষতি হয়।

১৮ ডিসেম্বর রাত থেকেই উদীচীর বিরুদ্ধে হুমকি ছড়িয়ে পড়ে। অন্তত ১০টি ফেসবুক পোস্টে (, , , , ) সংগঠনটি ধ্বংস এবং এর সদস্যদের হত্যা করার আহ্বান জানানো হয়।

১৯ ডিসেম্বর রাত ১২টা ১১ মিনিটে শেয়ার করা একটি পোস্টে লেখা ছিল, ‘ছায়ানট, উদীচীর, মেগ মল্লার বসু, একেকটারে ধইরা জ’”*বা’*ই করতে হইবো!’ পোস্টদাতা অ্যাকাউন্টটি প্রায় বেনামি ছিল এবং সেখানে ব্যক্তিগত প্রায় কোনো তথ্যই ছিল না।

১৮ ডিসেম্বর গভীর রাত থেকে ১৯ ডিসেম্বর ভোরের দিকে অনলাইন কনটেন্টের সুর বদলাতে থাকে—সরাসরি উসকানির পরিবর্তে উদযাপন, ব্যঙ্গ ও উপহাস দেখা যায়। অনেক ব্যবহারকারী ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লিখে হামলার প্রশংসা করেন। অনেকে এই হামলাকে ‘এবার ঠিক আছে’ বা ‘দরকার ছিল’ হিসেবে তুলে ধরেন।

অন্তত ৩৮ জন ব্যবহারকারী সহিংসতাকে বৈধ হিসেবে তুলে ধরতে নানা যুক্তি দেন। যার মধ্যে ছিল, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী হাদি হত্যায় অর্থায়ন করেছে অথবা দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো ও ‘ভারতীয় দূতাবাস’ বন্ধ করলে দেশ ৯৫ শতাংশ সুস্থ হয়ে যাবে

একটি পোস্টে লেখা ছিল, ‘প্রথম আলো, ডেইলি স্টার যতদিন এদেশে থাকবে, ততদিন ভাড়তীয় আধিপত্যবাদ থাকবে। এখনই সময় প্রথম আলো আর মুজিববাদের কবর রচনা করার।’ অগ্নিসংযোগের পরপরই বিভিন্ন ব্যবহারকারী ভুল তথ্য ছড়ান যে, এই দুই গণমাধ্যমে আগুন লেগেছে সাংবাদিকদের সিগারেট খাওয়ার কারণে বা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে।

দীর্ঘ দিনের প্রচারণা

বয়ান তৈরি করা পোস্টের চেয়ে হামলার আহ্বান বা উদযাপনমূলক পোস্ট ২০ গুণ বেশি করা হয়েছে এবং তাতে ৩০ গুণ বেশি ‘এনগেজমেন্ট’ বা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

তবে দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর বিরুদ্ধে এই প্রচারণা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয়নি।

এক বছরেরও বেশি সময় আগে থেকে দুই প্রবাসী বাংলাদেশি ইনফ্লুয়েন্সার পিনাকী ভট্টাচার্য ও ইলিয়াস হোসাইন ফেসবুক ও ইউটিউবে গণমাধ্যম দুটির বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে বয়ান তৈরি করে আসছেন। তারা দাবি করেন, এসব গণমাধ্যম ভারতের স্বার্থে কাজ করে। আর শেখ হাসিনা সরকারের সময় তাদের কিছু প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ছোট করে দেখান।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘দিল্লি স্টার’, ‘দিল্লির আলো’ ও ‘প্রথম আলুর’ মতো ব্যঙ্গাত্মক নামে নানা পেজ গড়ে ওঠে। এসব পেজে প্রায়ই সম্পাদক ও সম্পাদকীয় অবস্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়।

২০২৪ সালের নভেম্বরে ধারাবাহিকভাবে দুই দিন উভয় সংবাদপত্রের কার্যালয়ের সামনে জনতা জড়ো হয়ে ‘ভারতের দালাল’ ও শেখ হাসিনার ‘দোসর’ বলে স্লোগান দেয়। একই সময়ে পিনাকী প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ের সামনে ‘জেয়াফত’ ঘোষণা করেন, যা ছিল প্রতিবাদের অংশ।

১২ ডিসেম্বর ঢাকায় শরিফ ওসমান বিন হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উসকানির ঢেউ ওঠে, যার ধারাবাহিকতায় ডিসেম্বরের হামলাগুলো ঘটে। গুলির ঘটনার পর ছড়ানো পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়, প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার ওই ঘটনার ‘ভিত তৈরি’ করেছিল।

১৮ ডিসেম্বর হাদির মৃত্যুর পর এই বয়ান তীব্রভাবে (, , ) জোরদার হয়। সংবাদপত্র দুটিকে ‘ভারতের দালাল’, ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিস্ট’, ‘বিদেশি এজেন্ট’, ‘জঙ্গি নাটকের সহযোগী’, ‘পিলখানা ও শাপলা হত্যার সহযোগী’, ‘বিপ্লবের শত্রু’ ও ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দেওয়া হয়। এগুলো মব সংগঠিত করার অনুঘটক হয়ে ওঠে।

২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ভারতীয় ফ্যাক্ট-চেকিং পোর্টাল বুমলাইভ ডট ইন লিখেছে, এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পিনাকী ও ইলিয়াস ফেসবুক ও ইউটিউবে একইসঙ্গে এবং প্রায়ই একই ধরনের প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। আংশিকভাবে ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থানের সুবিধা নিয়ে এগুলো তারা করেছেন ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ওপর ধারাবাহিক মব হামলা উসকে দেওয়া ও সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে।’

চোখ বুজে ছিল মেটা ও সরকার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকদিন ধরে হুমকি ছড়ানো এবং চারটি স্থানে ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে সমন্বিত সহিংসতা চলার পরও বাংলাদেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মেটার প্রতিক্রিয়া আসে মূলত ঘটনার পর।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এএইচএম শাহাদাত হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করতে পারে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে পারে, এমন উসকানিমূলক পোস্ট শনাক্ত করতে প্রায় সকল পুলিশ ইউনিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করে থাকে।’

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জ্যেষ্ঠ এক সূত্র জানায়, পুলিশের সাইবার ইউনিটের বৃহৎ পরিসরে পর্যবেক্ষণের মতো প্রযুক্তি নেই এবং বাস্তবে তারা সাধারণ ব্যবহারকারীর মতোই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করে। তাদের সক্ষমতা মূলত ম্যানুয়াল ব্রাউজিংয়ে সীমাবদ্ধ। ফলে সমন্বিতভাবে ক্ষতিকর কনটেন্ট বৃদ্ধির প্রবণতা শনাক্ত করা কঠিন।

২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর এক বিবৃতিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোটিয়ার আইরিন খান বলেন, ‘ঘৃণামূলক বক্তব্য ও অপপ্রচার যখন গণমাধ্যম, সাংবাদিক, শিল্পী ও নাগরিক সমাজের নেতাদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে এবং সরকার বা প্ল্যাটফর্ম কোনো সংশোধনমূলক ব্যবস্থা না নেয়, তখন কথাবার্তা সহিংসতায় রূপ নেওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।’

তিনি আরও বলেন, ‘হুট করে (প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচীর ওপর) মব হামলাগুলো সৃষ্টি হয়নি। এগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের দায়মুক্তির সংস্কৃতি এবং গণমাধ্যম ও শিল্পকলার স্বাধীনতা রক্ষায় ব্যর্থতার ফল।’

সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার সময় ১৮ ডিসেম্বর মধ্যরাত থেকে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোতে ১৬৫টি কনটেন্টের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন পাঠায় বলে দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছে সংস্থাটি।

তারা জানায়, ১৯ ডিসেম্বর ভোরে বহু পোস্ট অপসারণের জন্য রিপোর্ট করা হয় এবং একই দিনে ফেসবুকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি অনলাইন বৈঠক করে জননিরাপত্তার স্বার্থে ক্ষতিকর কনটেন্ট সরানো বা ব্লক করার আহ্বান জানানো হয়।

১৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টা ১৩ মিনিটে প্রথম হামলা শুরুর প্রায় ২০ ঘণ্টা পর বিটিআরসি মেটাকে একটি জরুরি চিঠি পাঠিয়ে সতর্ক করে যে অনলাইনে হাদীর মৃত্যুকে সমর্থন ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সহিংসতার আহ্বান দ্রুত বাড়ছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানায়, ‘সরকারি ও নাগরিক সূত্র থেকে বারবার অনুরোধ’ সত্ত্বেও সহিংসতায় প্ররোচনা ও সংগঠনে জড়িত অ্যাকাউন্টগুলো নিষ্ক্রিয় করতে মেটা সহযোগিতা করেনি এবং ‘একাধিক জরুরি অনুরোধের’ সময়মতো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলেও মেটা দ্য ডেইলি স্টারকে কোনো জবাব দেয়নি।

একই সময়ে বিটিআরসি যখন মেটাকে চিঠি দেয়, তখন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেন।

তিনি লেখেন, ‘গত রাতে দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর সাংবাদিক বন্ধুদের কাছ থেকে আতঙ্কিত ও কান্নাভেজা সাহায্যের ফোন পেয়েছি। আমি সংশ্লিষ্টদের অসংখ্য ফোন করেছি, সহায়তা পাঠানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু তা সময়মতো পৌঁছায়নি।’

তিনি স্পষ্টতই হতাশা প্রকাশ করেন যে যেসব সরকারি সংস্থার সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেছিলেন, তারা যথেষ্ট দ্রুত সাড়া দেয়নি।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি গভীরভাবে দুঃখিত যে আপনাদের সহযোগিতা করতে পারিনি।’

হামলার চারদিন পর ২২ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এসএন নজরুল ইসলাম প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমের সামনে কথা বলেন।

তিনি বলেন, আমরা যদি সরাসরি অভিযান চালাতাম, সেখানে গুলি বিনিময় হতে পারত। তারা পাল্টা আক্রমণ করে পুলিশ বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে পারত। সেদিন রাতে তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল আমি জানি না। যদি আমার দু-চারজন সদস্য নিহত হতেন…।’

তিনি আরও বলেন, আপনারা জানেন, মাত্র এক বছর আগে পুলিশ বাহিনী একটি বড় ধাক্কার মধ্যে দিয়ে গেছে এবং তাদের বর্তমান অবস্থায় আনতে আমাদের কাজ করতে হয়েছে। সামনে নির্বাচন। যদি কোনো পুলিশ হতাহত হতো, তাহলে তাদের নিয়ে আমি (নির্বাচনের দিকে) এগোতে পারতাম না।’

এত বড় একটি ঘটনায় কোনো প্রাণহানি না হওয়াকেই আমরা আমাদের সাফল্য হিসেবে দেখি, তিনি যোগ করেন।

এই প্রতিবেদনের জন্য মন্তব্য জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী কোনো উত্তর দেননি।

৯ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর ওপর হামলা রাত ১১টায় হয়। কিন্তু যানজটের কারণে আমি সময়মতো কর্মকর্তাদের সেখানে পাঠাতে পারিনি। যানজট না থাকলে আমরা আরও দ্রুত পৌঁছাতে পারতাম।

তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে দ্য ডেইলি স্টার তাকে ফোনকল ও ম্যাসেজ পাঠিয়েছিল।
 

মেটার নীতিমালা লঙ্ঘন

এই অনুসন্ধানে বিশ্লেষণ করা সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কনটেন্ট মেটার সহিংসতা ও উসকানি-সংক্রান্ত কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘন করেছে। বিশেষত যেসব পোস্ট নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করে মবকে হামলার নির্দেশ দিয়েছে, সেগুলোর প্ল্যাটফর্মটির নিয়ম অনুযায়ী স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ।

মেটার নিজস্ব নীতিমালায় বলা আছে, ‘ফেসবুকে থাকা কনটেন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য অফলাইন ক্ষতি প্রতিরোধই আমাদের লক্ষ্য…আমরা গুরুতর সহিংসতা উসকে দেয় বা সহায়তা করে—এমন ভাষা অপসারণ করি।’

আরও বলা হয়েছে, ‘শারীরিক ক্ষতির প্রকৃত ঝুঁকি বা জননিরাপত্তার সরাসরি হুমকি’ রয়েছে বলে মনে হলে কোম্পানি কনটেন্ট সরিয়ে দেয় এবং অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করে এবং সাধারণ মন্তব্য ও বিশ্বাসযোগ্য হুমকির মধ্যে পার্থক্য করতে ভাষা ও প্রেক্ষাপট মূল্যায়ন করে।

তা সত্ত্বেও ১৫ থেকে ১৯ ডিসেম্বরের মধ্যে বিশ্লেষণ করা পোস্টগুলোর একটি বড় অংশ হামলার এক মাসেরও বেশি সময় পরও অনলাইনে উন্মুক্ত ছিল।

১৯ ডিসেম্বর বিকেলে বিটিআরসি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর কয়েক ঘণ্টা আগে ইনফ্লুয়েন্সার ইলিয়াস হোসাইনের ফেসবুক পেজ সরিয়ে দেয় মেটা। তবে প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার ও ছায়ানটের কার্যালয় ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় পর এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

পদ্ধতি

২০২৫ সালের ১৫-১৯ ডিসেম্বরে প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, দিল্লি স্টার, প্রথম আলু, ছায়ানট, উদীচী—এ ধরনের কীওয়ার্ড ব্যবহার করে যেসব ফেসবুক পোস্ট করা হয়েছে হামলার সময় ও পরবর্তীতে, সেগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। এরপর এই চার প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, সরাসরি হামলার আহ্বান জানিয়েছে অথবা হামলার পর তা নিয়ে উপহাস বা উদযাপন করেছে, সেই পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

 

রিপোর্টিং: জায়মা ইসলাম; অ্যাডিশনাল রিপোর্টিং ও গবেষণা: ডিসমিসল্যাব টিম, মীর রওনক

জায়মা ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারের সিনিয়র রিপোর্টার এবং মীর রওনক ইন্টার্ন রিপোর্টার।

Popular

More like this
Related

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে দেশবিরোধী তৎপরতা ছিল: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের কাছে পিলখানায়...

ব্রুকের সেঞ্চুরিতে পাকিস্তানকে হারিয়ে সেমিতে ইংল্যান্ড

পাল্লেকেলের উত্তপ্ত সন্ধ্যায় যেন একাই যুদ্ধ করলেন ইংলিশ অধিনায়ক...

কাশ্মীর নিয়ন্ত্রণে যেভাবে ‘ইসরায়েলি মডেল’ প্রয়োগ করছে ভারত

নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারত যখন প্রকাশ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা...

পুলিশের হামলা পুরোনো দমন-পীড়নের সংস্কৃতির প্রতিধ্বনি: শফিকুর রহমান

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি লেক এবং চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন...