জেন্ডার ইস্যুতে জেন-জির স্ববিরোধিতা

Date:

জেন-জিদেরকে সবচেয়ে প্রগতিশীল প্রজন্ম হিসেবে ধরা হয়। তারা ডিজিটাল দুনিয়ায় সাবলীল, সামাজিকভাবে সচেতন এবং অন্যায়ের প্রতিবাদে সোচ্চার। এই তরুণেরা বিশ্বজুড়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, সংগঠন গড়ে তুলেছে এবং পুরোনো ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু যখন জেন্ডার সমতার প্রশ্ন আসে, তখন চিত্রটা আশাব্যঞ্জক নয়।

চলতি বছরের ৫ মার্চ কিংস কলেজ লন্ডনের গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ফর উইমেনস লিডারশিপ ও ইপসোসসের এক বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, অনেক তরুণ এখনো সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। ২৯টি দেশের ২৩ হাজার মানুষের ওপর চালানো এই জরিপে দেখা গেছে, জেন-জির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (৩১ শতাংশ) পুরুষ মনে করেন, স্ত্রীকে সব সময় স্বামীর কথা মেনে চলা উচিত। আরও এক-তৃতীয়াংশ মনে করেন, পারিবারিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে স্বামীই শেষ কথা হওয়া উচিত। বেবি বুমার্স (যাদের জন্ম ১৯৪৬-১৯৬৪ সালের মধ্যে) প্রজন্মের পুরুষদের তুলনায় প্রতিক্রিয়াশীলতার এই হার অনেক বেশি।

জেন-জির প্রতি চারজনের একজন মনে করেন, নারীদের খুব বেশি স্বাধীনচেতা হওয়া উচিত নয়। প্রতি পাঁচজনের একজন মনে করেন, যেসব পুরুষ সন্তান লালন-পালনে অংশ নেন, তাদের পৌরুষ কম। একই সঙ্গে অনেক তরুণ নিজেরাই সমাজের প্রত্যাশার চাপে পিষ্ট। প্রতি পাঁচজনের দুজন মনে করেন, পুরুষদের সব সময় শারীরিকভাবে শক্তপোক্ত দেখাতে হবে, এমনকি তারা যদি সেটা না-ও হন। আর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মনে করেন, জেন্ডার সমতার জন্য পুরুষদের ওপর বেশি চাপ দেওয়া হচ্ছে।

বৈশ্বিক এই জরিপে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবে স্থানীয় জরিপেও যেসব চিত্র উঠে এসেছে তা আশাপ্রদ নয়। ২০২৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইয়েদ শাইখ ইমতিয়াজ কক্সবাজার, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও রংপুরের ৫০টি স্কুলের ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৯০০ ছেলের ওপর একটি জরিপ চালান। এতে কিশোরদের মনোভাবে উদ্বেগজনক প্রবণতা প্রকাশ পেয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজনের তিনজন (৬১ দশমিক ৬৫ শতাংশ) শিশু-পর্নোগ্রাফির ব্যাপারে পরিচিত। প্রতি ১০ জনের সাতজন (৭০ দশমিক ৫৫ শতাংশ) পর্নো ভিডিও দেখার পর মেয়েদের উত্ত্যক্ত করতে চেয়েছে। অর্ধেকের বেশি (৫৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ) মনে করে, পারিবারিক সিদ্ধান্তে পুরুষের কথাই চূড়ান্ত হওয়া উচিত। ৫৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ যৌন আকাঙ্ক্ষা মেটাতে বলপ্রয়োগের কথা ভেবেছে এবং দুই-তৃতীয়াংশ (৬৬ দশমিক ২ শতাংশ) মনে করে, নারীদের ঘন ঘন ঘরের বাইরে যাওয়া উচিত নয়।

অথচ এই প্রজন্মকেই গত কয়েক বছরে অভাবনীয়ভাবে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। বাংলাদেশের জেন-জিরা ২০২৪ সালের আগস্টে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

কিন্তু এই শিক্ষার্থীরাই যখন সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার ছিল, তখন নারীর অধিকার নিয়ে সামান্যই কথাবার্তা হয়েছে। নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো উপেক্ষিত রয়ে গেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর নারী নেত্রীদের কোণঠাসা করা হয়েছে এবং তরুণদের নেতৃত্বাধীন দল এনসিপি রাজনৈতিক পরিসরে নারীদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

তরুণদের বড় একটি অংশ যাদেরকে আদর্শ মানেন, স্ববিরোধিতা তাদের মধ্যেও দেখা যায়। জাতীয় দলের ক্রিকেটার তানজিম হাসান সাকিব ২০২৩ সালে তার পুরোনো নারীবিদ্বেষী ফেসবুক পোস্টের জন্য সমালোচিত হন। তখন তীব্র সমালোচনার মধ্যেও অনেক তরুণ তার মন্তব্যকে সমর্থন করেছেন।

একই চিত্র দেখা গেছে গত বছর হেফাজতে ইসলামের এক সমাবেশে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতা ও বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সেখানে উপস্থিত থাকলেও সেখানে নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের প্রতিবাদ করেননি। অথচ অন্য অনেক সামাজিক ইস্যুতে সরব হতে দেখা যায় তাকে।

এই প্যারাডক্স বা স্ববিরোধ এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। সামাজিক মাধ্যমগুলো তরুণদের জেন্ডার-বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে কী ভূমিকা রাখছে তা নিয়েও বিতর্ক চলছে। ব্রিটিশ টিভি সিরিজ ‘অ্যাডোলেসেন্স’ দেখিয়েছে, কীভাবে অ্যালগরিদম, সোশ্যাল মিডিয়া সাবকালচার এবং তথাকথিত ‘ম্যানোস্ফিয়ার’ নারীবিদ্বেষী ধারণাগুলোকে উসকে দিচ্ছে এবং ছেলেদের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি করছে।

বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যমে নারী-পুরুষ সমতার পক্ষে আওয়াজ উঠতে দেখা যায়। তবে নারীবিদ্বেষী বক্তব্যেরও কোনো কমতি নেই। 

এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি জেন্ডার সম্পর্কে আমাদের চিন্তাভাবনা যে কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে। জেন্ডার জাস্টিসের জন্য শুধু হ্যাশট্যাগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন শিক্ষা, যা তরুণদের গতানুগতিক ধারণা বা স্টিরিওটাইপকে প্রশ্ন করতে শেখাবে। গণপরিসরে এমন আওয়াজ তুলতে হবে যা নারীবিদ্বেষকে চ্যালেঞ্জ করবে।

জেন-জিকে বুঝতে হবে যে রাজনীতি মানে শুধু মিছিল, শক্তি প্রদর্শন বা গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে সস্তা জনপ্রিয়তা বা লোকরঞ্জন নয়—জেন্ডার রাজনৈতিক জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। নারীরা জনসংখ্যার অর্ধেক। তাদের প্রাপ্য সমতা না দিলে রাজনীতি অসম্পূর্ণ ও অপ্রতিনিধিত্বশীল থেকে যাবে।

জেন্ডার জাস্টিস গণতন্ত্র ও সংস্কার থেকে আলাদা নয়—এই সত্য স্বীকার না করলে প্রকৃত রাজনৈতিক পরিবর্তন অসম্ভব। জেন-জি তাদের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে যে তেজ দেখিয়েছে, একই তেজ নিয়ে পুরুষতন্ত্রকে মোকাবিলা না করা পর্যন্ত সমতার সংগ্রাম অসমাপ্তই থেকে যাবে।

জান্নাতুল নাঈম পিয়াল: লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক

Popular

More like this
Related

‘বুমরাহ এক প্রজন্মে একজনই আসে’

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে দুর্দান্ত জয়ের পর ভারতের পেস তারকা...

মাইলফলক নয়, উদযাপন হোক ট্রফির: গম্ভীর

ট্রফিই শেষ কথা, ব্যক্তিগত মাইলফলক নয়, এমন দর্শনেই এগোচ্ছে...

মোজতবা খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা

ইরান মোজতবা খামেনিকে তাদের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত...

ইরানের তেল স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র নয়, শুধু ইসরায়েল হামলা করছে: ওয়াশিংটন

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুগপৎ হামলার আজ অষ্টম দিন। এই...