বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় কিন্তু নীরব সংকট হলো অসংক্রামক রোগ বা এনসিডি। হৃদ্রোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট—এই চারটি রোগই আজ দেশে মৃত্যুর প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই ঘটে এসব অসংক্রামক রোগের কারণে। আরও উদ্বেগজনক হলো, এই মৃত্যুর বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য।
এই রোগগুলোর সবচেয়ে বড়, অভিন্ন এবং প্রমাণিত ঝুঁকির কারণ হলো তামাকের ব্যবহার। অর্থাৎ তামাক নিয়ন্ত্রণ মানে কেবল ধূমপান কমানো নয়; তামাক নিয়ন্ত্রণ মানে হৃদ্রোগ, ক্যানসার ও স্ট্রোক প্রতিরোধের একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় কৌশল।
এই বাস্তবতায় ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর অনুমোদিত ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক আইনি সংশোধন নয়; বরং এনসিডির লাগাম টানার জন্য একটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নীতিগত পদক্ষেপ।
তামাক ব্যবহারের ভয়াবহতা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। টোব্যাকো এটলাস (২০২৫) অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে প্রায় ২ লাখ মানুষ অকালমৃত্যুবরণ করেন। অর্থনৈতিক দিক থেকেও ক্ষতিটি ভয়াবহ। ধূমপান ও অন্যান্য তামাক ব্যবহারের ফলে চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস ও অকালমৃত্যুর কারণে দেশে বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৯ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা। এই ক্ষতি তামাক খাত থেকে সরকারের অর্জিত রাজস্বের তুলনায় অনেক বেশি। অর্থাৎ তামাক কোনোভাবেই অর্থনীতির জন্য লাভজনক নয়; এটি একটি স্থায়ী আর্থিক ও মানবিক ক্ষতির উৎস।
গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস্, ২০১৭) অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। অন্যদিকে টোব্যাকো এটলাস (২০২৫) জানাচ্ছে, দেশে ২ কোটি ১৩ লাখেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ (১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব) তামাকের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে শক্তিশালী ও আধুনিক আইন ছাড়া বিকল্প নেই—যার প্রতিফলন এই অধ্যাদেশে দেখতে পাই।
অধ্যাদেশটির অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো ই-সিগারেট, ভ্যাপিং ও হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টসহ (এইচটিপি) উদীয়মান তামাকপণ্যের (ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্টস) ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা। ‘কম ক্ষতিকর’ নামে বাজারজাত হলেও বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা যায়, আকর্ষণীয় ফ্লেভার ও আগ্রাসী ডিজিটাল প্রচারের মাধ্যমে এসব পণ্য তরুণদের নিকোটিন আসক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং জামা পেডিয়াট্রিকস ও বিএমজে ওপেনে প্রকাশিত গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ই-সিগারেট ও ভেপিং তরুণদের মধ্যে ধূমপানের একটি কার্যকর প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে। কৈশোরে নিকোটিনে আসক্তি ভবিষ্যতে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক ও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়—এই বাস্তবতায় নিষেধাজ্ঞাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় নীতিগতভাবে সময়োপযোগী ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।
একইভাবে, বিক্রয়কেন্দ্রে তামাকপণ্যের প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা একটি প্রমাণভিত্তিক ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। গবেষণায় দেখা গেছে, দোকানে দৃশ্যমান তামাকপণ্য তরুণদের মধ্যে কৌতূহল ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়, বিশেষ করে যারা এখনো ধূমপান শুরু করেনি। প্রদর্শন বন্ধ করলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে তামাক ব্যবহারে প্রবেশের পথ সংকুচিত হবে এবং আসক্তি শুরু হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া তামাক ব্যবহারের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কমবে, যা দীর্ঘমেয়াদে তামাকজনিত রোগ—যেমন হৃদ্রোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি—কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান (ডিএসএ) বাতিল জনস্বাস্থ্যের জন্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ স্পষ্ট—পরোক্ষ ধূমপান স্ট্রোক, হৃদ্রোগ ও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় এবং এর কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই (সিডিসি, ২০২৫)। জনসমাগমস্থলে ধূমপানের সুযোগ বন্ধ করলে শুধু ধূমপায়ী নয়, শিশু, গর্ভবতী নারী ও বৃদ্ধদের মতো সংবেদনশীল গোষ্ঠীও সুরক্ষিত হবে। এটি কেবল স্বাস্থ্যসচেতন নীতি নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন—একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত, যা লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা করবে।
এ ছাড়া তামাকপণ্যের প্যাকেটে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার আকার ৭৫ শতাংশে উন্নীত করা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং টোব্যাকো এটলাসের তথ্য স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, বড় ও দৃশ্যমান ছবি স্বল্পশিক্ষিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে তামাকের ক্ষতির বার্তা সবচেয়ে কার্যকরভাবে পৌঁছে দেয়।
সচিত্র সতর্কবার্তা কেবল তথ্য দেয় না; এটি ভয়, সতর্কতা ও প্রতিরোধের শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরি করে, যা ধূমপান শুরু হওয়ার আগেই নিরুৎসাহিত করতে সহায়ক। বিভিন্ন দেশে গ্রাফিক্যাল সতর্কবার্তা চালুর পর তরুণদের মধ্যে তামাক গ্রহণের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তাই প্যাকেটে সচিত্র সতর্কবার্তার আকার বৃদ্ধি করা শুধু নিয়ম মানার বিষয় নয়; এটি নতুন প্রজন্মকে সুরক্ষা দেওয়ার একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় জনস্বাস্থ্য কৌশল।
সব মিলিয়ে এই অধ্যাদেশ অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে একটি সমন্বিত ও কার্যকর নীতিগত কাঠামো প্রদান করে। এটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য এসডিজি ৩.৪—২০৩০ সালের মধ্যে এনসিডিজনিত অকালমৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জনেও সহায়ক হবে।
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এখানে নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই—এটি স্পষ্টতই জীবন ও মৃত্যুর প্রশ্ন। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত। জনস্বার্থে প্রণীত এই অধ্যাদেশটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই আইনে রূপান্তর করা জরুরি। বিলম্ব মানেই জনগণের জন্য আরও মৃত্যু, আরও রোগ ও আরও অর্থনৈতিক ক্ষতি। তামাকের মরণছোবল থেকে দেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে—এই আইন পাসের কোনো বিকল্প নেই।
• অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী: বিভাগীয় প্রধান, রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগ; ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট