‘ছেলেকে বলেছিলাম আমার জন্য পাঞ্জাবি, আর ওর মায়ের থ্রিপিস আনতে’

Date:

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সদস্য রাকিব হাসান সোমবার সকালে তার বাবা জাকির হোসেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন। ফোন রাখার আগে বাবা তার ছেলের কাছে আবদার করেছিলেন ঈদে নিজের জন্য পাঞ্জাবি আর রাকিবের মায়ের জন্য থ্রিপিস নিয়ে আসার জন্য।

কিন্তু ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই সেই বাবাকে ছেলের মরদেহ নিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আসতে হয়েছে। 

সোমবার বিকেলে মিরপুর-২ নম্বরের বাণিজ্যিক ভবন এলএ প্লাজায় লাগা আগুনের ধোঁয়ায় আক্রান্ত হয়ে রাকিবের মৃত্যু হয়। এই একই ঘটনায় আয়েশা সিদ্দিকা অনন্যা (২০) নামে বিমান বাহিনীর আরেক সদস্য প্রাণ হারান।

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের মোটর মেকানিক বাবা জাকিরের কাছে এই খবরটি ছিল বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো। গতকাল মঙ্গলবার অশ্রুসজল চোখে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘সকালে ও ফোন করে বলেছিল ঈদের কেনাকাটা করতে মার্কেটে যাচ্ছে। আমি ওকে বললাম, আমার জন্য একটা পাঞ্জাবি আর ওর মায়ের জন্য থ্রিপিস আনতে। আমি অপেক্ষায় ছিলাম ও ঈদে বাড়ি আসবে।’

তার বদলে রাতে একটি ফোনকলে তিনি জানতে পারেন যে, মিরপুরে কেনাকাটা করতে গিয়ে অগ্নিকাণ্ডে তার ছেলে মারা গেছে। তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি। কেউ ঈদের কাপড় কিনতে গিয়ে আর কোনোদিন ফিরবে না, এটা কীভাবে হয়?’

জাকিরের দুই ছেলের মধ্যে বড় রাকিব ২০২০ সালে বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। তার আয় ছিল এই সাধারণ পরিবারটির সংসার চালানো ও ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার প্রধান অবলম্বন। জাকির বলেন, ‘ওর আয়েই আমাদের সংসার চলত। এখন আমরা কীভাবে চলব জানি না।’

দশতলা ওই ভবনের তৃতীয়তলায় দুপুর ১টা ৫২ মিনিটের দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিস বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

ভবনটির বিভিন্ন তলা থেকে মোট ২৩ জনকে উদ্ধার করা হয়। রাকিব ও অনন্যাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল, পরে সোমবার রাতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাদের মৃত্যু হয়।

অনন্যার পরিবারেও একই রকম শোকের ছায়া নেমেছে। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা নীলফামারীর সৈয়দপুরে। অটোরিকশাচালক আব্দুল হান্নানের দুই মেয়ের মধ্যে বড় অনন্যা, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে তিনি বড় হয়েছেন।

মাধ্যমিক শেষ করে ২০২৩ সালের মার্চে অনন্যা বিমান বাহিনীতে যোগ দেন, যাতে পরিবারের হাল ধরতে পারেন, সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে পারেন।

তার মামা মতিউর রহমান বলেন, ‘ও পুরো পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল। ছোট বোনের পড়াশোনার খরচও অনন্যাই চালাত।’

সোমবার কেনাকাটা করতে অনন্যা মিরপুরের ওই মার্কেটে গিয়েছিলেন। মতিউর বলেন, ‘লোকেরা বলছিল, ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ার সময় ও বেশ কজন মানুষকে ছাদে উঠতে সাহায্য করেছিল।’

একেবারে শেষ মুহূর্তে অনন্যা ও তার এক সহকর্মী ধোঁয়ায় আটকা পড়েন। মর্গ সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের শরীরে কোনো পোড়া দাগ ছিল না। তবে অতিরিক্ত ধোঁয়া শরীরের ভেতরে যাওয়ার ফলে তাদের শ্বাসনালী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যা তাদের মৃত্যুর কারণ। এই অকাল মৃত্যুতে পরিবারগুলোর কাছে ঈদের আনন্দ এখন মাতমে পরিণত হয়েছে। 

জাকির হোসেন এই কষ্ট মেনে নিতে পারছেন না। যে বাবা ছেলের কাছে ঈদের উপহার চেয়েছিলেন, আজ তাকে সেই সন্তানের নিথর দেহ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। সেই ছেলে, যে একাই আগলে রেখেছিল অভাবের সংসারটি।

Popular

More like this
Related

আবার টস জিতে বোলিংই নিল বাংলাদেশ, একাদশ অপরিবর্তিত

তিন ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতেও টস জিতলেন বাংলাদেশের অধিনায়ক...

রেশম কারখানায় ঈদের ব্যস্ততা, মৌসুমি কেনাকাটায় গতি

বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে রাজশাহী ও রেশম—এই দুই শব্দ যেন একে...

ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত যা কিছু হারাল যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত যত দীর্ঘায়িত...

ঈদযাত্রায় গণপরিবহনে তেল নিয়ে সংকট হবে না, ভাড়া বাড়বে না: রবিউল আলম

আসন্ন ঈদযাত্রায় গণপরিবহনে তেল নিয়ে সংকট হবে না এবং...