প্রায় এক বছর ধরে চলা ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ২০২৪ সালে একটি যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। এরপর লেবানন যখন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা দেশটির জন্য নতুন মানবিক সংকট ডেকে আনে।
গত ২ মার্চ থেকে লেবাননে ব্যাপক ইসরায়েলি বিমান হামলা শুরু হয়। এরমধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে প্রায় ৭ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে সরকারি মানবিক সহায়তা পোর্টালে নাম নিবন্ধন করেছেন বলে জানিয়েছে লেবানন সরকার।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে ৫৬০টিরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে।
এদিকে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, সংঘাত তীব্র হওয়ার পর থেকে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ প্রতিবেশী দেশ সিরিয়ায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৮৬ জন নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
চলমান মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে ‘সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি’ চায় লেবানন।
তবে এই সংঘাত ও মানবিক সংকট কবে শেষ হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। এর মধ্যেই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—কীভাবে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ল লেবানন, ইসরায়েল কেন লেবাননে হামলা করছে, আর কয়েক দশক ধরে চলা ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাতের ইতিহাসই বা কী।
লেবাননে হামলা কেন
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ আয়াতুল্লাহ নেতা আলি খামেনি নিহত হন ২৮ ফেব্রুয়ারি।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিয়া মুসলিম সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে ২ মার্চ ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
ইরানে হামলার পর এক বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এর জবাবে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন ও হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত বৈরুত এলাকায় বোমা হামলা শুরু করে এবং সেখানকার বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়। একই সময়ে ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি সীমান্তবর্তী শহর ও গ্রাম ছেড়ে যেতে ইসরায়েলিদের হুঁশিয়ারি দেয়।
তবে হিজবুল্লাহর এক শীর্ষ কর্মকর্তার বরাতে এএফপি জানায়, সমর্থক দেশ ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ‘সীমিত’ হামলা চালালে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে না তারা। তবে ওই নেতা জানান, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিরুদ্ধে কোনো হামলাকে তারা ‘লাল রেখা’ হিসেবে বিবেচনা করবেন।
সেই অনুযায়ী ইসরায়েলে প্রতিশোধমূলক হামলা চালানোর পরই পাল্টা হামলায় আক্রান্ত হয় লেবানন।
দীর্ঘদিনের সংঘাত
যুক্তরাজ্যের হাউজ অব কমনস লাইব্রেরির তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশক ধরে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ একাধিকবার সংঘাতে জড়িয়েছে।
২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর গাজায় হামাসকে সমর্থন জানিয়ে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। এর জবাবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বিমান হামলা চালায়।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এক হামলায় হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ নিহত হন। এরপর ওই বছর ১ অক্টোবর ইসরায়েলি স্থলবাহিনী লেবাননেও প্রবেশ করে।
শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। তবে বিশ্লেষকেরা এই চুক্তিকে একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
যুদ্ধবিরতির পরও হামলা–পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। সিএনএন জানায়, ২০২৫ সালেও হিজবুল্লাহর এক শীর্ষ নেতাকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বিমান হামলায় একজন নিহত ও অন্তত ২১ জন আহত হন।
দ্য ইকোনোমিস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সংঘাতে হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার নতুন সুযোগ পেয়েছে ইসরায়েল।
হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক
১৯৮২ সালের লেবানন যুদ্ধের পর ইরানের বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) সদস্যরা হিজবুল্লাহ প্রতিষ্ঠা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কূটনীতি বিষয়ক সংস্থা কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস জানায়, ১৯৭৫ সালে লেবাননে বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র ফিলিস্তিনিদের উপস্থিতি ছিল। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ চরম পর্যায়ে পৌঁছালে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ফিলিস্তিনি সংকট নিয়ে লেবাননের বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর অবস্থানও ছিল ভিন্ন।
১৯৪৩ সালের একটি রাজনৈতিক চুক্তি অনুযায়ী, লেবাননের প্রধান ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাগ করা হয়। একজন সুন্নি মুসলিম প্রধানমন্ত্রী, একজন মারোনাইট খ্রিস্টান রাষ্ট্রপতি এবং একজন শিয়া মুসলিম পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উত্তেজনা ধীরে ধীরে গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। এর আগেই নানা কারণে ক্ষমতার এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য ভেঙে পড়তে থাকে। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের আগমনে সুন্নি জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বেড়ে যায়। শিয়ারা মনে করতে থাকে খ্রিস্টান সংখ্যালঘু শাসকদের দ্বারা তারা ক্রমেই সুবিধাবঞ্চিত হয়ে পড়ছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস জানায়, অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের মধ্যে ১৯৭৮ সালে এবং ১৯৮২ সালে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে আক্রমণ চালায়। এর লক্ষ্য ছিল ওই অঞ্চলকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে ফিলিস্তিনি গেরিলা যোদ্ধাদের উৎখাত করা।
প্রায় একই সময়ে ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে শিয়া সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তারা ইসরায়েলি দখলদারত্বের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়।
এই সরকারই আরব অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেখে বিপ্লবী গার্ডের মাধ্যমে নবগঠিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অর্থ ও প্রশিক্ষণ দেয়। পরে সেই সংগঠন নিজেদের নাম নেয় হিজবুল্লাহ, যার অর্থ ‘আল্লাহর দল’।
প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনঘন সংঘর্ষ এবং বিদেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কারণে সংগঠনটি আন্তর্জাতিকভাবে চরমপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি পায়। এরমধ্যে ১৯৮৩ সালে বৈরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের সেনা ব্যারাকে আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্য, যেখানে তিন শতাধিক মানুষ নিহত হয়।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, সংগঠনটি বহুবার ঘোষণা করেছে—তাদের লক্ষ্য ইসরায়েল রাষ্ট্রকে নির্মূল করা। ইসরায়েলসহ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশ এটিকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে।
সরাসরি জড়িত নয় লেবানন সরকার
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন হিজবুল্লাহর হামলা ও ইসরায়েলের পাল্টা হামলা—উভয়েরই নিন্দা করেছেন।
ইসরায়েলে এই দফা হামলার পরপরই লেবানন সরকার হিজবুল্লাহর সামরিক ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের ওপর তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বলে জানায় এএফপি।
হাউজ অব কমনস লাইব্রেরির তথ্য অনুযায়ী, লেবানন সরকার এতদিন হিজবুল্লাহকে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিয়েছে কয়েকটি কারণে—ইসরায়েলি দখলদারত্বের বিরুদ্ধে সংগঠনটির ভূমিকা, লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর দুর্বলতা এবং দেশটির সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংগঠনটির একীভূত অবস্থান।
হিজবুল্লাহ তাদের সমর্থকদের জন্য বিভিন্ন সামাজিক সেবা প্রদান করে এবং লেবাননে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির অধিকারী।
দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, সংগঠনটির প্রয়াত মহাসচিব হাসান নাসরুল্লাহ বহু বক্তৃতায় লেবাননের দুর্বল রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও অপ্রতুল সামাজিক শাসন কাঠামোর মধ্যে গড়ে ওঠা সংগঠনটির ‘ছায়া শাসনব্যবস্থার’ কথা তুলে ধরেছেন।
তার মতে, এই সমান্তরাল কাঠামো সংগঠনটিকে জনসমর্থন এনে দেয় এবং সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মসূচি পরিচালনার জন্য অর্থের উৎস তৈরি করে, যা হিজবুল্লাহকে লেবাননের সমাজ কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করেছে।
লেবানন ও হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ
লেবানন ও হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ মূলত চলমান সংঘাত এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক রাজনীতির ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে।
বিশ্লেষকদের বরাতে আল জাজিরা জানায়, ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্ন বাস্তবে সামনে আসবে না। যুদ্ধ চলাকালে তাদের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন।
দক্ষিণ লেবাননে যদি ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘদিন থাকে, তবে সেখানে নতুন করে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে। অনেকের ধারণা, তখন সাধারণ মানুষও প্রতিরোধে যোগ দিতে পারে, যা হিজবুল্লাহ বা অন্য কোনো নতুন সংগঠনের নেতৃত্বে হতে পারে।
অন্যদিকে, লেবাননের সেনাবাহিনী যদি সরাসরি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে দেশটিতে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। কারণ সেনাবাহিনীর ভেতরেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সদস্য রয়েছে, যা সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ সম্মুখ যুদ্ধ এবং বিদ্রোহী রণকৌশলে অত্যন্ত দক্ষ। অন্যদিকে, লেবাননের সেনাবাহিনী মূলত বিশেষ অভিযানের জন্য বেশি উপযুক্ত। ফলে সরাসরি রাস্তায় হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্মুখ লড়াই করাও সেনাবাহিনীর জন্য কঠিন।
এই কারণে বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনী বড় ধরনের সংঘাতে না গিয়ে সীমিত অভিযান, তল্লাশি বা চেকপয়েন্টে নজরদারির মতো সতর্ক পদক্ষেপই নিতে পারে।
সব মিলিয়ে, লেবানন ও হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয় তার ওপর।